নয়াদিল্লি: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহের একটি ফরমুলা রয়েছে— ডিটেক্ট, ডিলিট, ডিপোর্ট। অর্থাৎ, প্রথমে চিহ্নিতকরণ। তারপর ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ। আর সবশেষে বিতাড়ন। দেশে অনুপ্রবেশ ঠেকানোর জন্য এই তিন ‘ডি’র দাওয়াই। আর আছেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। ভোট এলেই তিনি ধার দেন অনুপ্রবেশ অস্ত্রে। সদ্য অসমে গিয়েও দাবি করেছেন, আর পাঁচ বছর তাঁকে দিতে হবে। তাহলেই অসম থেকে অনুপ্রবেশ দূর করে দেবেন তিনি। এক দশকের উপর অসমে ডবল ইঞ্জিন রাজত্ব। তারপরও তাঁর বাড়তি পাঁচ বছর সময় প্রয়োজন। অথচ, বাংলায় এসে তিনিই বলেন, এখানে একমাত্র অনুপ্রবেশ আছে। ডবল ইঞ্জিনে নেই! ছবিটা স্পষ্ট—অনুপ্রবেশ এবং ধর্ম ছাড়া অন্য কোনো ইস্যু তিনবারের প্রধানমন্ত্রীরও নেই। আর সবচেয়ে বড় কথা, যে অনুপ্রবেশ ইস্যুতে মোদি-শাহের এত ধারালো আক্রমণ, তার তথ্যও নেই তাঁদের সরকারের কাছে! অন্তত আরটিআই তথ্য সে কথাই বলছে। এসংক্রান্ত এক প্রশ্নের জবাবে অমিত শাহের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকই জানিয়েছে, বর্তমানে ভারতে কোন দেশের কত অনুপ্রবেশকারী রয়েছে, কতজন গ্রেপ্তার হয়েছে, কতজনকেই বা ফেরত পাঠানো হয়েছে, তার কোনও কেন্দ্রীভূত তথ্য সরকারের কাছে নেই। তাহলে জনসভা থেকে সোশ্যাল মিডিয়া—সর্বত্র যে কোটি কোটি বাংলাদেশি-রোহিঙ্গার দাবি তাঁরা করে থাকেন, তাঁরা কোথায়? এই দাবির ভিত্তিই বা কী? বিরোধীদের সাফ কথা, অনুপ্রবেশের মতো স্পর্শকাতর ইস্যু আসলে বিজেপির নির্বাচনি স্বার্থ চরিতার্থ করা ছাড়া কিছুই নয়। সবটাই বিজেপির জুমলা।
তথ্য জানার অধিকার আইনের আওতায় জনৈক আরটিআই কর্মী কানহাইয়া কুমার জানতে চেয়েছিলেন, গত ১০ বছরে দেশজুড়ে কতজন অনুপ্রবেশকারীকে চিহ্নিত ও গ্রেপ্তার করা হয়েছে? প্রত্যর্পণই বা হয়েছে কতজনের? সেই অনুপ্রবেশকারীরা কোন দেশের, তাও জানতে চেয়েছিলেন তিনি। গত ২৩ জানুয়ারি এর উত্তরে মন্ত্রক স্পষ্ট জানিয়েছে, এমন কোনো তথ্য সরকারের কাছে নেই। অনুপ্রবেশকারী চিহ্নিতকরণ ও তাদের প্রত্যর্পণ সংক্রান্ত যাবতীয় ক্ষমতা রাজ্য সরকার ও কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলগুলির হাতে রয়েছে। এবিষয়ে কেন্দ্রের করণীয় কিছু নেই। অর্থাৎ, পুরো বিষয়টাই রাজ্যের ঘাড়ে ঠেলে দিয়েছে কেন্দ্র। যদিও সম্প্রতি অসমে গিয়ে ৬৪ লক্ষ অনুপ্রবেশকারীর বুলি আউড়েছিলেন শাহ। তারও আগে গত বছর দিল্লির একটি অনুষ্ঠানে বলেছিলেন, প্রজনন হার বেশি থাকার জন্য নয়, দেশে মুসলিমদের সংখ্যা বাড়ছে ব্যাপক অনুপ্রবেশে। অসমের জনসভায় দাঁড়িয়ে বক্তৃতা দেওয়ার সময় প্রধানমন্ত্রী মোদিও জানেন না, ওই ডবল ইঞ্জিন রাজ্যে কত অনুপ্রবেশকারী রয়েছে। বিরোধীদের প্রশ্ন, পুরো বিষয়টাই কি হাওয়ায়?
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকের এই জবাবকে ‘অত্যন্ত বিচিত্র’ তকমা দিয়েছেন সমাজকর্মী হর্ষ মন্দার। তাঁর কথায়, ‘মন্ত্রক কোনো পরিসংখ্যান রাখে না, এটা একটু অস্বাভাবিক ঠেকছে। যেমন ধরা যাক, খুনের মতো অপরাধের পরিসংখ্যান রাজ্য সরকার রাখে। তারপর ন্যাশনাল ক্রাইম রেকর্ড ব্যুরো সেগুলি একত্রিত করে রিপোর্ট আকারে প্রকাশ করে। অর্থাৎ, রাজ্যের কাছে যদি পরিসংখ্যান থাকে, তাহলে কেন্দ্র সেগুলি পেতে পারে। তাই এক্ষেত্রে মন্ত্রকের জবাবে আমি মোটেই সন্তুষ্ট নই।’ কিন্তু, অসমের মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্বশর্মা গতবছর একাধিকবার দাবি করেছেন, বহু বাংলাদেশি অনুপ্রবেশকারীকে তিনি ফেরত পাঠিয়েছেন। এনিয়ে হর্ষ মন্দার বলেন, ‘সরকার যখন কোনও সুষ্ঠু পরিসংখ্যান প্রকাশ না করে শুধু একটি নির্দিষ্ট সম্প্রদায়কে অনুপ্রবেশকারী হিসাবে দাগিয়ে দেয়, তখন বুঝতে হবে এর পিছনে প্রশাসনিক নয়, বরং মতাদর্শ ও সাম্প্রদায়িক দৃষ্টিকোণ রয়েছে।’
তবে, এতকিছুতেও অমিত শাহ থামছেন না। সোমবারও দিল্লি পুলিশের প্রতিষ্ঠা দিবসের অনুষ্ঠানে ফের ‘ডেডলাইন’ বেঁধে দিয়েছেন তিনি। এবার সন্ত্রাস নির্মূলের। কারণ, রাজ্যের নাম জম্মু-কাশ্মীর এবং গোটা উত্তর-পূর্ব। অনুপ্রবেশ সেখানে কেন্দ্র মানবে কেন?