শুভ্র চট্টোপাধ্যায়, কলকাতা: প্রতারণার শিকার খোদ রেলমন্ত্রক! বন্দে ভারত সহ দূরপাল্লার ট্রেনগুলিতে যে এসি কন্ট্রোলার থাকে, বড়সড় গলদ ধরা পড়েছে তার পরীক্ষা কাঠামোতেই। এসি কন্ট্রোলার পরীক্ষার জন্য যে কোম্পানিকে কাঠামো, অর্থাৎ সাইকোমেট্রিক ল্যাব তৈরির বরাত দেওয়া হয়েছিল, তারাই এখন কাঠগড়ায়। এই মর্মে অভিযোগের ভিত্তিতে ইতিমধ্যেই দু’জনকে গ্রেপ্তার করেছে লালবাজার। এর মধ্যে উঠছে মারাত্মক একটি প্রশ্ন—বিষয়টি নজরে এলেও ফাঁক গলে বন্দে ভারতের মতো প্রিমিয়াম ট্রেনের এসি এই ‘গলদযুক্ত’ সাইকোমেট্রিক ল্যাবের পরীক্ষায় পাশ করে যায়নি তো?
চলতি বছর দিল্লির একটি সংস্থা রেলের এসি তৈরি, ডিস্ক ব্রেক বসানো সহ কোচের বিভিন্ন কাজের বরাত পেয়েছে। সেইমতো তারা নিজস্ব পরিকাঠামো তৈরির উপরও জোর দিয়েছে। এই পরিকাঠামোরই অন্যতম অংশ সাইকোমেট্রিক ল্যাব তৈরি। কী হয় এর মাধ্যমে? এই ল্যাবে পরীক্ষা হয় ট্রেনের কোচের এসি কন্ট্রোলারের, যার মাধ্যমে গোটা ট্রেনের শীতাতপ ব্যবস্থা নিয়ন্ত্রণ হয়। সাইকোমেট্রিক ল্যাবে গলদ থাকলে বা তার ক্যাপাসিটি কম হলে কন্ট্রোলারও ঠিক মতো কাজ করে না। ট্রেনের মধ্যে ঠান্ডা বা গরম বেড়ে যেতে পারে। সোজা কথায়, ট্রেনের তাপমাত্রা আর নিয়ন্ত্রণে থাকে না। দিল্লির ওই কোম্পানি বন্দে ভারত, দুরন্ত সহ সব দূরপাল্লার ট্রেনে এসি বসানোর দায়িত্ব পাওয়ায় তাদের সাইকোমেট্রিক ল্যাব তৈরি জরুরি হয়ে পড়েছিল। পুরনো পরিকাঠামো তাদের ছিল ঠিকই, কিন্তু সেই ল্যাবের শক্তি বা ক্যাপাসিটি কম। তার মাধ্যমে বন্দে ভারতের মতো প্রিমিয়াম ট্রেন সহ অন্যান্য এলএইচভি কোচের এসি পরীক্ষা সম্ভব নয়। তাই তারা দিল্লিরই একটি কোম্পানিকে এই ল্যাব তৈরি করতে দেয়, যার ক্যাপাসিটি হবে ২৫ টনের। জুলাই মাসে তা তৈরি করে দেয় সংশ্লিষ্ট কোম্পানি। সেটি হাতে আসার পর রেলের বরাতপ্রাপ্ত কোম্পানিটি শুরু করে দেয় এসি পরীক্ষা। এর মাঝে পরিকাঠামো এবং কাজ খতিয়ে দেখতে সংস্থায় পরিদর্শনে আসে রেলের টেকনিক্যাল টিম। তারা সাইকোমেট্রিক ল্যাবে এসি পরীক্ষা করতে গিয়ে দেখে, কোথাও একটা গণ্ডগোল হচ্ছে। বিরাট ফারাক হয়ে যাচ্ছে ঠান্ডা-গরমের। রেলের টেকনিক্যাল টিমের সদস্যরা খতিয়ে দেখে জানতে পারেন, সাইকোমেট্রিক ল্যাবটির ক্যাপাসিটি ২৫ টনের বলে দাবি করা হলেও, আসলে তা ১০ টনের।
বরাতপ্রাপ্ত কোম্পানিকে তারা সঙ্গে সঙ্গে বিষয়টি জানায়। বলে, এখনই ওই সাইকোমেট্রিক ল্যাবে সব এসি পরীক্ষা বন্ধ করতে হবে। সবচেয়ে বড় কথা, ১০ টনের ল্যাবের দাম দেড় কোটি টাকা। অথচ, ২৫ টনের হিসেবে সাড়ে তিন কোটি টাকা তারা পেমেন্ট করে দিয়েছে। অর্থাৎ, পুরোটাই প্রতারণা। একদিকে টাকা গিয়েছে। পাশাপাশি, ক্ষুব্ধ রেলও। এসি পরীক্ষার বরাত যে কোনও সময় বন্ধ হয়ে যেতে পারে। দিল্লির ওই কোম্পানি টেন্ডারে অংশ নিয়েছিল কলকাতা অফিসার ঠিকানা দেখিয়ে। তাই তারা লালবাজারে অভিযোগ জানায়। কেস রুজু হয় টালিগঞ্জ থানায়। তদন্তে উঠে আসে, ল্যাব প্রস্তুতকারক কোম্পানি অনেকদিন ধরে বিভিন্ন প্রতারণায় জড়িয়েছে। এই ল্যাব তৈরির দায়িত্বে থাকা অমিতাভ সইকিয়া ও সুনীল কুমারকে পাকড়াও করে লালবাজার। যদিও ধৃতদের দাবি, ইচ্ছাকৃতভাবে তাঁরা ল্যাবের ক্যাপাসিটি কমাননি। এর পিছনে ষড়যন্ত্র আছে। কম শক্তির কন্ট্রোলার গছিয়ে বেশি টাকা নেওয়া হতো রেলের থেকে। অথচ, কামরা ঠিকমতো ঠান্ডা হতো না। ফলে আবার মিলত নতুন ল্যাব তৈরির বরাত। ধৃতদের দাবি, এভাবে বেশ কিছু ‘ত্রুটিপূর্ণ’ ল্যাবের পরীক্ষায় ফাঁকতালে কন্ট্রোলার পাশ হয়ে গিয়েছে। সেই কন্ট্রোলার বহু ট্রেনে বসেও গিয়েছে। এতেই হুলুস্থুলু পড়েছে রেলে। কোন কোন কোচে এসি কন্ট্রোলার সমস্যা দিচ্ছে, তার খোঁজ চলছে। পুলিশের দাবি, এর পিছনে একটা চক্র থাকতে পারে। তার খোঁজ চলছে।