গত বছর পুজোয় কলকাতা থেকে গাড়ি নিয়ে পাড়ি জমিয়েছিলাম সুদূর স্পিতি ভ্যালি। দুর্গম গিরিপথে নানা ধরনের অভিজ্ঞতা হয়েছে। গাড়ি চালাচ্ছিলেন আমার স্বামী, আনন্দরূপ। পাশের সিটে বসে আমার ভূমিকা নেভিগেটরের। মুঠোফোনে ম্যাপ খোলা, সেই মতোই পথনির্দেশ মেনে অজানা উদ্দেশ্যে চলেছি আমরা। অর্ধেক পথ চলতে চলতে হয়তো বা কোথাও সিগনালই চলে গেল। উড়ে গেল গুগল ম্যাপ। তখন পথচলতি লোকজনই ভরসা। তবে স্পিতি ভ্যালির এই দুর্গম পথের একটা সুবিধেও রয়েছে। পাহাড়ি রাস্তায় বিশেষ অলিগলি নেই। বাঁক নিয়ে পাক খেয়ে রুক্ষ, দুর্গম, অমসৃণ পথ ক্রমশ খাড়া উপর দিকে উঠে গিয়েছে। তা কখনো সংকীর্ণ, কখনো বা সামান্য চওড়া। কিন্তু একই রাস্তা ধরে চলতে চলতে গন্তব্যে পৌঁছনো সম্ভব। ফলে ম্যাপ যেখানে সাহায্য করছে না বা পথ চলতি লোকেরও দেখা মিলছে না, সেখানেও পথ হারানোর ভয় নেই।
সাহসে ভর দিয়ে দুর্গম পথে কাজার উদ্দেশে পাড়ি জামালাম। যতই এগচ্ছি, রাস্তা ততই খারাপ হয়ে উঠছে। রুক্ষ পাহাড় আর পাথুরে রাস্তা পেরিয়ে চলেছে আমাদের গাড়ি। কাজার পথে প্রথম রাত কাটল লোসার গ্রামে। ছোট্ট পাহাড়ি গ্রাম। হাতে গোনা কয়েক ঘর লোকের বাস। হোটেল বলে কিছুই নেই। পর্যটকদের জন্য কয়েকটি গ্রাম্য হোমস্টে। সেখান থেকে পরের দিন যাব স্পিতি উপত্যকার জেলা শহর কাজা। পথে পড়বে কিব্বের গ্রাম, কি গুম্ফা আর চিচাম ব্রিজ। এটি এশিয়ার উচ্চতম ব্রিজ। ১৩,৫০০ ফুটেরও সামান্য বেশি উচ্চতা। হিমালয়ের এক গিরিখাতের মাঝে লোহার মোটা দড়ি দিয়ে ঝুলিয়ে দেওয়া হয়েছে ব্রিজটিকে। নীচ দিয়ে বয়ে চলেছে খরস্রোতা স্পিতি নদী আর উপরে ঝুলন্ত চিচাম ব্রিজ। একবারে একটার বেশি গাড়ি চলে না ব্রিজের উপর দিয়ে। ব্রিজের কাছেই রয়েছ চা-কফি, স্যান্ডউইচ, মোমোর স্টল। অস্থায়ী বন্দোবস্ত। এপথে প্রকৃতি বড়োই বেসামাল। এই রোদ তো এই তুষার পাত। শীতেও বরফে ঢেকে যায় গোটা অঞ্চল। ফলে স্থায়ী দোকান রাখা দায়।
গাড়িতে নয়, ব্রিজের দুলুনি অনুভব করার জন্য পায়ে হেঁটেই তা পেরনোর সিদ্ধান্ত নিলাম। তারপর খানিক দূর হেঁটে পৌঁছে যাওয়া যায় কিব্বের গ্রাম। লোসারের মতোই ছোট্ট এই গ্রাম। এখানে রয়েছে একটা বৌদ্ধ গুম্ফা। বুদ্ধ মূর্তির শান্ত, স্নিগ্ধ, মৈত্রেয় রূপ। রুক্ষ খয়েরি পাহাড়ের গায়ে যেন একমুঠো রং ঢেলে দিয়েছে কেউ। লাল, সোনালি কাজের মনাস্ট্রি উজ্জ্বল হয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছে দুর্গম পথের ধারে। কিব্বের গ্রাম পেরিয়ে আরও খানিকটা পথ চলেছি, পথের একধারে নীচ দিয়ে বয়ে যাচ্ছে নদী, অন্য দিকে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে রয়েছে হিমালয়। আমরা গিয়েছিলাম অক্টোবর মাসের গোড়ায়। তাই তুষারপাতে রাস্তা ঢেকে যায়নি। বরং খয়েরি পাথুরে পাহাড়ের গায়ে কড়া রোদ পড়ে যেন সোনা রং ধরিয়ে দিয়েছে। আবার কোথাও হাওয়ার ক্ষরণের ফলে পাহাড় কেটে সরু লম্বাটে গড়ন দেখা যায়। ঠিক যেন পাথরের দেবদারু গাছ কোনো ভাস্কর আপন মনে পাহাড়ের গায়ে রচনা করে গিয়েছেন। হাওয়ায় কাটা পাহাড়ের এই অনন্য রূপই স্পিতি হিমালয়ের বিশেষত্ব। পোশাকি নাম ‘স্পাইরাল মাউন্টেনস’।
পাহাড়ি পথ কখনো স্পিতি নদীর কোলে নেমে যাচ্ছে তো এক নিমেষে আবার পাক খেতে খেতে উঠে পড়ছে সহস্র ফুট উঁচুতে। রাস্তার অবস্থা বেশ খারাপ। সেই পথেই চলতে চলতে পৌঁছলাম কাজায়। বাজার দোকান, হোটেল, রেস্তরাঁ সবই আছে এখানে। আর আছে রুক্ষ, গাছ বিহীন পাহাড়ের গায়েও রঙের প্রাচুর্য। খয়েরি, সোনালি, বাদামি কতই না রঙের খেলা। পাথরের গায়ে কোথাও বা বুনো ফার্ন গজিয়ে উঠেছে অযত্নে। তার পাতায় হলদে সবুজ ছোপ। পাথুরে পাহাড়ের গায়ে যা একেবারে ভিন্ন ধরনের সৌন্দর্য ঢেলে দিয়ে যাচ্ছে। আর আছে রূপের ডালি নিয়ে স্পিতি নদীর অবিরাম বয়ে চলা। কাজা থেকেই একটা পথ নেমে গিয়েছে নদীর জলে। বেশ খাড়া নিচু রাস্তা, ভীষণ সরু। এ পথে গাড়ি যায় না। পায়ে হেঁটে ট্রেক করে নামতে হয়। নদীর এই পাড়টা নুড়ি পাথরে ছেয়ে রয়েছে। সাদা, নীল, লাল, কমলা কতই না রং সেই পাথরের। নদীর স্বচ্ছ জলে ধুয়ে যাচ্ছে পাথরের গায়ের মলিনতা। কোথাও বা বড়ো বোল্ডারে ধাক্কা খাচ্ছে নদীর জল, সৃষ্টি হচ্ছে পাথর পেরিয়ে তার পথচলা।
কাজায় আমরা থাকব দু’রাত। এই জেলা শহরের উচ্চতা মোটামুটি ১৩ হাজার ফুটের কাছাকাছি। সেখান থেকেই ঘুরে আসব হিকিম পোস্ট অফিস। এটি পৃথিবীর উচ্চতম কর্মক্ষম পোস্ট অফিস! উচ্চতা মোটামুটি ১৪,৫০০ ফুট। কাজা শহর থেকে যাতায়াতে সময় লাগে ঘণ্টা চারেক। শহর ছাড়িয়ে বেশ কিছুটা চলার পর একটা মোড় পড়ল। সেখান থেকে রাস্তাটা একেবারে খাড়া উঠে গিয়েছে উপর দিকে। প্রচণ্ড সরু, পাথুরে এই রাস্তার একদিকে উঁচু হিমালয় আর অন্য দিকে অতল খাদ। উলটো দিক দিয়ে গাড়ি এলে সাইড দিতে গিয়ে আমাদের গাড়ির একটা চাকা চলে যাচ্ছে সেই খাদে, মহাশূন্যে! তখন খানিক পিছিয়ে সাইড করতে হচ্ছে গাড়ি। আগুপিছু করতে করতে পৌঁছে গেলাম হিকিম পোস্ট অফিস। রাস্তাটা সেখানে তুলনামূলক চওড়া। গাড়ির পার্কিং রয়েছে একধারে। তারপর পাহাড় ডিঙিয়ে খানিকটা উঠে লাল ছোটো পোস্ট অফিস। প্রথম দেখে মনে হয়েছিল এটা আবার পোস্ট অফিস কোথায়? এ তো ডাক বাক্স । হ্যাঁ, আমাদের ছোটবেলায় যখন হাতে লেখা চিঠিই ছিল যোগাযোগের অন্যতম মাধ্যম। তখন সেই চিঠিতে স্ট্যাম্প লাগিয়ে ফেলা হত ডাক বাক্সে। লাল রঙের সিলিন্ডারের মতো ডাক বাক্স। হুবহু তেমনই চেহারা হিকিম পোস্ট অফিসের। গোলাকার লাল রঙের এই পোস্টঅফিসের সামনে কাচের জানলা। তার ভেতর দিয়ে দেখলাম ঘরে বসে রয়েছেন প্রবীণ পোস্টমাস্টার। আপাদমস্তক সোয়েটার, কোট, টুপি, মাফলারে ঢাকা। শুধু চোখ মুখটুকু দেখা যাচ্ছে। পর্যটকদের নানা ধরনের প্রশ্ন অনায়াসে সামলাচ্ছেন তিনি। কখনো একটু বিরক্তও হচ্ছেন, কখনো বা মজা পাচ্ছেন নেটযুগের ই-মেইলে অভ্যস্ত নাগরিকদের অদ্ভুত প্রশ্ন শুনে। পোস্ট অফিসের সামনে বসে রয়েছেন পোস্টমাস্টারের সহায়ক। তাঁর কাছে একগুচ্ছ পিকচার পোস্টকার্ড। স্পিতি উপত্যকার নানাবিধ ছবি ছাপানো এই পোস্টকার্ডগুলোর দাম ৩০ টাকা করে। এরপর খাম ১০ টাকা এবং স্ট্যাম্পের দাম নির্ভর করছে কোথায় পাঠানো হবে তার উপর। পর্যটকরা নিজেদের পছন্দমতো কার্ড নিয়ে চিঠি লিখে ফেলছেন। কিন্তু তারপরেই অনভ্যস্ত মন হাতড়ে বেড়াচ্ছে ঠিকানা। নেটিজেনরা ঠিকানা বলতে বোঝেন ইমেল আইডি। বাড়ির ঠিকানার সঙ্গে তাঁদের পরিচিতি কম। আস্ত একটা ঠিকানা মনে করে লেখা বেশ ঝকমারি লাগছিল অনেকেরই। একজন তো বলেই বসলেন, ‘আচ্ছা চিঠির সাবজেক্ট লাইনে কী লিখব?’ এক সদ্য বিবাহিত দম্পতির ভারী বেসামাল অবস্থা। দামাল হাওয়ায় চিঠি উড়ে গিয়েছে স্ত্রীর হাত থেকে। স্বামীটি দৌড়চ্ছেন ‘আরে মেরা খত উড় গেয়া...’ বলতে বলতে।
চিঠি লেখা পর্ব মিটিয়ে ততক্ষণে অনেকেই লাইন দিয়েছেন পোস্টমাস্টারের ঘরের সামনে। তাঁকে ঠিকানা বা অঞ্চলের নাম জানিয়ে কিনে নিচ্ছেন স্ট্যাম্প। এবার ডাক বাক্সে ফেলে দিলেই কেল্লা ফতে। চিঠিখানা পৌঁছে যাবে নির্দিষ্ট গন্তব্যে। পৃথিবীর চূড়ায় বসে প্রিয়জনকে চিঠি লেখার আনন্দই আলাদা। হিমাচলের এই প্রত্যন্ত গ্রাম থেকে কলকাতায় চিঠি এসেছিল দিন পনেরো কুড়ির মাথায়। এই পোস্ট অফিসই নাকি প্রত্যন্ত অঞ্চলের সঙ্গে বাকি পৃথিবীর সংযোগ স্থাপন করে রেখেছে। তাই এর গুরুত্ব অসীম, জানালেন পোস্টমাস্টার অজিত গুপ্তা। অজিতের কাঁধেই যোগাযোগের সম্পূর্ণ দায়িত্ব। ছুটি বিশেষ মেলে না। তবে ভীষণ শীতে বরফের নীচে যখন ঢাকা পড়ে যায় পোস্ট অফিস, তখন কাজ বন্ধ করে কাজায় নেমে আসতেই হয় তাঁকে। সেই সময় হিকিমের বিস্তৃর্ণ অঞ্চলে শুধুই তুষার চিতাদের রাজত্ব।
চিঠি পর্ব সেরে, হিকিমের পাহাড়ি অঞ্চলের সৌন্দর্য মনে গেঁথে নিয়ে ফেরার পথ ধরলাম। খানিক দূর এসে একটা বাঁকে হঠাৎ জোরে ব্রেক কষে দাঁড়াল গাড়ি। থমকে গিয়ে, সামনে চেয়ে দেখি গোল গোল চোখে আমাদের দিকে চেয়ে রয়েছে একটা ব্লু শিপ। গায়ের রং সাদাটে নীল। মাথায় খাড়া দুটো শিং। আঞ্চলিক ড্রাইভারদের কাছে শুনলাম সাধারণত সন্ধেবেলা খাবারের খোঁজে পাহাড় বেয়ে লোকালয়ে নামে এরা। আজ সময়ের গোলমালে একটু আগেই এসে গিয়েছে। এত লোকের ভিড়ে খানিক ঘাবড়ে গিয়ে উপরে উঠছে তড়িঘড়ি। তারই মাঝে পিছন ফিরে একটু পোজ দিল আমাদের ক্যামেরায়। এক মন স্মৃতি নিয়ে ফেরার পথ ধরলাম আমরা।
কমলিনী চক্রবর্তী