রামচন্দ্র লঙ্কা জয়ের উদ্দেশ্যে শরৎকালে মায়ের আবাহন করেছিলেন। কিন্তু পৃথিবীতে প্রথম দুর্গাপুজো হয়েছিল গড় জঙ্গলে। মার্কণ্ডেয় পুরাণ অনুযায়ী মর্তে প্রথম দুর্গাপুজোর প্রবর্তক রাজা সুরথ। তিনি ছিলেন রাজা সুবহসিংহের বংশধর। তাঁর রাজধানী ছিল বোলপুর সংলগ্ন বর্তমান সুপুর এলাকায়।
কীভাবে যাবেন: কলকাতা থেকে দূরত্ব প্রায় ১৭৩ কিলোমিটার। দুর্গাপুর বা পানাগড় থেকে প্রায় ২০-২৫ কিলোমিটার দূরে এটি অবস্থিত। কলকাতা থেকে সড়কপথে এনএইচ ১৯ ধরে সহজে যাওয়া যায়। নিকটবর্তী রেল স্টেশন দুর্গাপুর বা পানাগড় এবং বিমানবন্দর কাজী নজরুল ইসলাম বিমানবন্দর বা অণ্ডাল।
বিশ্বের প্রথম দুর্গাপুজো তাও বাড়ি থেকে মাত্র ঘণ্টাখানেকের দূরত্বে। তা প্রত্যক্ষ করতে আসানসোল থেকে বেরিয়ে পড়লাম দুর্গাপুরের উদ্দেশ্যে। এনএইচ১৯ ধরে দুর্গাপুরের মুচিপাড়া পৌঁছে বাঁদিকের রাস্তা ধরলাম। বামুনারা পেরিয়ে আজকের ভ্রমণের প্রথম গন্তব্য আড়া অঞ্চলে কালদিঘি পুকুরের পাশে রাঢ়েশ্বর শিব মন্দির। মন্দিরটি দ্বাদশ শতাব্দীতে তৈরি। কথিত আছে, রাজা বল্লাল সেন কোনো একসময় এক জটিল অসুখে আক্রান্ত হন। রাজ কবিরাজরা অসুখ সারাতে ব্যর্থ হন। হঠাৎই তিনি মহাদেবের স্বপ্নাদেশ পান। স্বপ্নে তিনি শিবমন্দির তৈরি করার আদেশ পান। রাজা পুকুর থেকে শিবলিঙ্গ তুলে মন্দির তৈরি করে দৈনন্দিন পূজা অর্চনার ব্যবস্থা করেন। তারপর অলৌকিকভাবে তাঁর রোগও নির্মূল হয়ে যায়। লোকালয়ে অবস্থিত হলেও আমরা সেরকম ভিড় পাইনি। মন্দিরটি বেলে ও ঝামাপাথর দিয়ে তৈরি। এই ধরনের মন্দিরে শিখরগুলি সাধারণত গোলাকার হয়। কিন্তু এখানে শিখর শঙ্কু আকৃতির। এটি এই অঞ্চলের একটি জনপ্রিয় মন্দির। শিবরাত্রিতে এখানে বড়ো মেলা বসে।
রাঢ়েশ্বর শিব মন্দির দর্শন করে আমরা আবার মূল রাস্তায় ফিরে এলাম। এই রাস্তা চলে গিয়েছে সোজা জয়দেব কেদুলি হয়ে বীরভূম জেলায়। দু’ধারে ঘন শাল পিয়ালের জঙ্গল। মাঝে মাঝে দু’-চারটি দু’চাকা, চার চাকার গাড়ি বা বাস চলে যাচ্ছে। নাহলে রাস্তা বেশ শুনশান। কিছুক্ষণ চলার পর ডানদিকে একটা সাইনবোর্ড চোখে পড়ল। মেধসমুনির আশ্রম আর শ্যামরূপা মন্দির যাওয়ার রাস্তা। আগে রাস্তাটি মোরামের ছিল। বর্তমানে বাঁধানো হয়েছে। তবে ব্যক্তিগত মত মোরাম বেছানো পথটি বেশি সুন্দর ও আকর্ষণীয় ছিল। ঘন জঙ্গলের মধ্য দিয়ে যাওয়া সুন্দর নীরবতা ও সবুজে ছাওয়া একটি পথ যা আপনাকে নিয়ে যাবে এক অপরূপ প্রাকৃতিক পরিবেশে। আমরা প্রথমে গেলাম মেধসাশ্রম গড়চণ্ডী ধামে। গড়চণ্ডীধাম বিভিন্ন যুগে মেধসাশ্রম, সুরতগড়, দেবীগড়, ঢেকুরগড় নামেও পরিচিত ছিল। সত্যযুগে এখানে মেধসমুনির আশ্রম ছিল। রামচন্দ্র লঙ্কা জয়ের উদ্দেশ্যে শরৎকালে মায়ের আবাহন করেছিলেন। কিন্তু পৃথিবীতে প্রথম দুর্গাপুজো হয়েছিল এই গড় জঙ্গলে। মার্কণ্ডেয় পুরাণ অনুযায়ী মর্তে প্রথম দুর্গাপুজোর প্রবর্তক রাজা সুরথ। তিনি ছিলেন রাজা সুবহসিংহের বংশধর। তাঁর রাজধানী ছিল বোলপুর সংলগ্ন বর্তমান সুপুর এলাকায়। কোনো এক যুদ্ধে যবনজাতির কাছে তাঁর পরাজয় ঘটে। তিনি আশ্রয় নেন মেধসমুনির আশ্রমে। আবার সমাধি-বৈশ্য নামে এক বণিক নিজ পরিজনদের কাছে প্রতারিত হয়ে আশ্রয় নেন এখানে। জীবনের দুঃখ কষ্ট থেকে মুক্তির পথ পেতে তাঁরা মেধসমুনির শরণাপন্ন হন। কিন্তু সর্বস্ব হারিয়েও তাঁরা সবসময় মানুষের মঙ্গলকামনা করেন। তখন ঋষি মেধসমুনি দেবীচণ্ডীর দেবী মাহাত্ম্য উল্লেখ করে বললেন মহামায়ার প্রভাবেই এমন হচ্ছে। রাজা সুরথ ঋষির কথায় অনুপ্রাণিত হয়ে তিন বছর কঠোর তপস্যা করেন। ঋষি তাঁদের ভাগ্য ফেরানোর জন্য দেবী দুর্গার পুজো করার পরামর্শ দেন। তখন রাজা সুরথ ও সমাধি বৈশ্য বসন্তকালে দেবী দুর্গার পুজো করেন। মনে করা হয় এই পুজোই ছিল বিশ্বের প্রথম দুর্গাপুজো। এরপর তাঁরা হারানো সমৃদ্ধি ফিরে পান।
আজও সেই ইতিহাসের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে গড় জঙ্গলের মহর্ষি মেধসাশ্রম। রয়েছে একটি গোশালা, অতি প্রাচীন এক তেঁতুল গাছ। আশ্রমে নতুন একটি শিব মন্দির তৈরি করা হয়েছে, থাকার জায়গাও তৈরি হচ্ছে দেখলাম। রাজা সুরথ এই স্থানে ত্রিদেবীর অর্থাৎ মহাকালী, মহাসরস্বতী ও মহালক্ষ্মীর মন্দির তৈরি করেন এবং চারপাশ প্রাচীর দিয়ে ঘিরে দেন। এখনও পুরানো রীতি মেনে প্রাচীরের চারপাশ প্রদক্ষিণ করা হয় পুজোর সময়। এখানের মহা বিষ্ণুমন্দিরে কবি জয়দেব গীতগোবিন্দ রচনা করেন। কাছেই শ্যামরূপা মন্দির। এই মন্দিরকে ঘিরেও নানান গল্প, লোকশ্রুতি প্রচারিত আছে। বংশপরম্পরায় এখানকার মন্দিরের পৌরোহিত্য করেন রায় বংশের বংশধররা। তাঁদের মুখ থেকেই জানা যায় বখতিয়ার খিলজির আক্রমণে রাজা বল্লাল সেন গৌড় সাম্রাজ্য থেকে পালিয়ে আত্মগোপন করেছিলেন এই জঙ্গলে। লক্ষ্মণ সেন বৈষ্ণব হলেও কালী মন্দির তৈরির অনুমতি দেন। তখন এই গভীর জঙ্গলে গড়ে তোলা হয় মন্দির। এই মন্দিরে সিদ্ধি লাভের আশায় কাপালিকদের আনাগোনা শুরু হয়। মন্দির উদ্বোধনের দিন এক কাপালিক নরবলি দিতে উদ্যত হন। সেখানে উপস্থিত গীতগোবিন্দের রচয়িতা কবি জয়দেব তাঁকে নিরস্ত করার চেষ্টা করেন। এবং কাপালিককে বোঝান নরবলি বন্ধ করলে তিনি শ্যামামাকে শ্যামরূপে দর্শন করানোর চেষ্টা করবেন। এরপর ভক্তিভরে দেবীর কাছে প্রার্থনা করেন জয়দেব। তাঁর প্রার্থনায় সাড়া দেন দেবী। আচমকাই মায়ের মূর্তির গায়ের রং কালো অর্থাৎ শ্যামরূপ ধারণ করে। কাপালিক ভয় পেয়ে নরবলি বন্ধ করে দেন। তখন থেকেই এর নাম শ্যামরূপা মন্দির। মন্দিরটি প্রায় এগারোশো বছরের পুরানো। বর্তমান মন্দিরটি নতুন করে নির্মাণ করা হয়েছে।
এরপর লক্ষ্মণ সেন নদীয়া ফিরে গেলে এই জায়গার দায়িত্ব দেন ধবল ঘোষকে। তাঁর পুত্র ঈশ্বর ঘোষ যাঁর ডাকনাম ইছাই, তিনি গৌড়ের পাল রাজাদের খাজনা দিতে অস্বীকার করে নিজেকে স্বাধীন গোপভূমির একজন শক্তিশালী সামন্ত রাজা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেন। তিনি দেবী চণ্ডী বা শ্যামরূপা দেবীর একনিষ্ঠ ভক্ত ছিলেন। তিনি লক্ষ্মণ সেনের সেনাপতি কর্ণ সেনকে পরাজিত করে বর্ধমানের বিস্তৃত অঞ্চল দখল করে এই গড়জঙ্গলে রাজধানী স্থাপন করেন। সৈন্যদের থাকার জন্য কেল্লা বা দুর্গ তৈরি করে তোলেন। তার চারদিকে পরিখা তৈরি করেন। এই পরিখার প্রয়োজনীয় জল অজয় নদ থেকে আসত।
বর্তমানে ঐতিহাসিক দিক থেকে বিচার করলে গড়জঙ্গলে শ্যামরূপা মন্দিরের উত্তর দিকে বেলে পাথরের বাঁধ দেখে সহজে অনুমান করা যায় যে হাজার বছর আগে অজয় নদ এই মন্দিরের পাশ দিয়ে প্রবাহিত হত। তবে বর্তমানে অজয় নদ দুই কিলোমিটার দূরে সরে গিয়েছে।
পরবর্তীকালে ইছাই ঘোষ কর্ণসেনের পুত্র লাউসেনের কাছে যুদ্ধে পরাজিত ও নিহত হন। শ্যামরূপা মন্দিরে মায়ের দুটি মূর্তি ছিল। একটি ইছাই ঘোষের সহচররা ইছাই ঘোষের মৃত্যুর পর দীপসায়রের জলে বিসর্জন দিয়ে দেন। আরেকটি মূর্তি ইছাই ঘোষের মানসকন্যা যাঁর বিয়ে হয়েছিল পুরুলিয়া জেলার কাশীপুর মহারাজার ছেলের সঙ্গে, তিনি নিয়ে যান।
মূর্তিটি ঘোড়ার পিঠে করে নিয়ে যেতে যেতে অকস্মাৎ মা বরাকর নদীতে পড়ে যান। ওখানে তিনি মা কল্যাণেশ্বরী নামে পূজিত হন। এখানে বেলা বারোটার মধ্যে পুজো সারা হয়। তারপর কল্যাণেশ্বরীতে পুজো হয়।
এই মন্দিরের আরেকটি বিশেষত্ব অষ্টমী আর নবমীর সন্ধিক্ষণে এখানে এক অলৌকিক তোপধ্বনি শোনা যায়। মন্দির চত্বরে আছে একটি বহু পুরানো বনকুসুম গাছ। ভক্তদের বিশ্বাস মনের কোনো ইচ্ছে নিয়ে মানত করলে মা মনস্কামনা পূর্ণ করেন। সেইমতো ভক্তরা সুতো দিয়ে ঢিল বেঁধে রাখেন।
সাধারণত এই মন্দিরে বিশেষ ভিড় থাকে না। আমরাও বেশ ফাঁকায় দেখেছিলাম। তবে শাল, পিয়াল আর মহুয়ার জঙ্গলে সবুজ প্রকৃতির কোলে দুর্গাপুজোর আনন্দ উপভোগ করতে পুজোর চার দিন বিভিন্ন জেলা থেকে প্রচুর মানুষ এখানে আসেন।
এদিনের আমাদের শেষ গন্তব্য দেউল পার্ক এবং ইছাই ঘোষের দেউল। দেউল পার্কে বেশ কিছু হরিণ আছে। কাছেই ইছাই ঘোষের দেউল। নামে ইছাই ঘোষের দেউল হলেও ঐতিহাসিকরা মনে করেন, ইছাই ঘোষের বংশধরেরা তাঁদের পূর্বপুরুষদের স্মরণে এটি নির্মাণ করেছেন। প্রায় ৫০ ফুট উঁচু এই মন্দিরে বর্তমানে শিবের আরাধনা করা হয়। বর্তমানে দেউল পুরাতত্ত্ব সংরক্ষণ অধীনে রয়েছে।
ইতিহাস, পুরাণ আর প্রকৃতির মেলবন্ধন প্রত্যক্ষ করে এবার বাড়ি ফেরার পালা।
বিশ্বরূপ মৈত্র



