রঞ্জুগোপাল মুখোপাধ্যায়, গঙ্গাজলঘাটি: দেশ তখন স্বাধীনতার আন্দোলনে তোলপাড়। ১৯৪০ সালে বাঁকুড়ার গঙ্গাজলঘাটিতে এসেছিলেন নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু। তিনি সেখানে একটি সভা করেছিলেন। সেই সভামঞ্চে নেতাজি যে চেয়ারে বসেছিলেন, সেটি এখনও সংরক্ষণ করে রাখা আছে গঙ্গাজলঘাটি ব্লকের দেশুরিয়া গ্রামের কর্মকার বাড়িতে। আশপাশের বাসিন্দারা ওই বাড়িকে ‘ডাক্তার বাড়ি’ বলেই চেনেন। ডাক্তার বাড়ির ঠাকুরঘরে দেবদেবীর বিগ্রহের পাশেই সযত্নে নেতাজির ব্যবহৃত সেই কাঠের চেয়ার স্থান পেয়েছে। ওই চেয়ারে রাখা নেতাজির প্রতিকৃতি বারোমাস দেবতাদের সঙ্গেই পূজিত হয়ে আসছে। দেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের শ্রেষ্ঠ সংগ্রামী তথা দেশনায়কের স্পর্শ পাওয়া ওই চেয়ার চাক্ষুষ করতে অনেকেই কর্মকার বাড়িতে আজও ভিড় জমান। প্রতি বছর স্বাধীনতা দিবস ও নেতাজির জন্মজয়ন্তীতে ওই চেয়ার বাইরে বের করে বিশেষ অনুষ্ঠানের আয়োজন হয়।
দেশুরিয়া গ্রামের বাসিন্দা রামরূপ কর্মকার পেশায় হাতুড়ে চিকিৎসক ছিলেন। গঙ্গাজলঘাটিতে তাঁর একটি ওষুধের দোকানও ছিল। নেতাজি সভা করতে আসবেন শুনে অন্যান্যদের মতো রামরূপবাবুও অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছিলেন। সভার উদ্যোক্তারা নেতাজির বসার জন্য রানিগঞ্জ থেকে বিশেষ সোফা ভাড়া করে এনেছিলেন। বাকিদের জন্য সাধারণ কাঠের চেয়ারের ব্যবস্থা ছিল। নেতাজি তা দেখে মঞ্চ থেকে রাজকীয় সেই সোফা সরিয়ে নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছিলেন। সভামঞ্চ থেকে উদ্যোক্তারা তড়িঘড়ি সোফা সরিয়ে রামরূপবাবুর ওষুধের দোকানের ওই কাঠের চেয়ারে নেতাজির বসার ব্যবস্থা করেছিলেন। সভা শেষে কার্যত মাথায় করে ওই চেয়ার রামরূপবাবু নিজের বাড়ি নিয়ে যান। তারপর থেকে তাঁদের ঠাকুরঘরেই স্থান পেয়েছে আজাদ হিন্দ বাহিনীর সর্বাধিনায়কের স্পর্শধন্য সেই চেয়ার।
রামরূপবাবু আজ আর নেই। তাঁর আট ছেলে ও দুই মেয়ে। ছেলেদের অধিকাংশই চিকিৎসক। সেই কারণেই ডাক্তার বাড়ি হিসাবে কর্মকার বাড়ির এলাকায় বিশেষ খ্যাতি। রামরূপবাবুর পঞ্চম পুত্র অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক সমীর কর্মকারের কথায়, চল্লিশের দশকে গঙ্গাজলঘাটি ব্লক এলাকায় ডেকরেটর্সের চল ছিল না। তখন আশপাশের বাড়ি থেকেই চেয়ার, টেবিল এনে সভা, সমিতি হতো। বাবার মুখে শুনেছি, ওইদিনের সভায় অন্যান্য অভ্যাগতদের জন্য চেয়ারের ব্যবস্থাও সেভাবেই হয়েছিল। কিন্তু নেতাজির জন্য শুধু রানিগঞ্জ থেকে সোফা বা গদিযুক্ত চেয়ার ভাড়া করে আনা হয়েছিল। কিন্তু কিছুতেই সুভাষচন্দ্র তাতে বসতে রাজি হননি। ফলে দ্রুত সোফা সরিয়ে ফেলেন উদ্যোক্তারা। খোঁজ শুরু হয় কাঠের চেয়ারের। সভামঞ্চের পাশেই বাবার রোগী দেখার চেম্বার ছিল। তখন নেতাজির বসার জন্য তড়িঘড়ি বাবার কাছ থেকে উদ্যোক্তারা ওই চেয়ারটি মঞ্চে নিয়ে যান। নেতাজি তাতেই সচ্ছন্দে বসেছিলেন।
রামরূপবাবুর ছোটো ছেলে পেশায় হোমিওপ্যাথি চিকিৎসক প্রদীপকুমার কর্মকার বলেন, নেতাজি গঙ্গাজলঘাটিতে সভা সেরে আমাদের গ্রাম রামহরিপুর হয়ে ফিরছিলেন। ফেরার পথে বিড়রা গ্রামের বাসিন্দারা নেতাজির পথ আটকান। তাঁদের গ্রামে নেতাজিকে কিছুক্ষণের জন্য হলেও দাঁড়িয়ে বক্তব্য রাখার অনুরোধ জানিয়েছিলেন গ্রামবাসীরা। এছাড়াও রাস্তার দু’পাশে অগণিত মানুষ নেতাজিকে দেখার জন্য ভিড় জমিয়েছিলেন সেদিন। ওই ঘটনা থেকেই বোঝা যায় উত্তাল সেসব দিনে প্রত্যন্ত গ্রামে-গঞ্জেও সুভাষচন্দ্রের জনপ্রিয়তা ছিল তুঙ্গস্পর্শী।