নিজস্ব প্রতিনিধি, বহরমপুর: নাম মৌসুমি বিশ্বাস। বাড়ি মুর্শিদাবাদের দৌলতাবাদের ছয়ঘড়ি। পেশা চাষবাস। কিন্তু এইটুকু বললেই সম্পূর্ণ হয় না মৌসুমির পরিচয়। তিনি নিজে হাতে চাষ করে সেই ফসল মাথায় করে বাজারে পৌঁছে দেন শুধু নয়, তাঁর নেশা হল চাষবাস ও বিভিন্ন ফসল নিয়ে গবেষণা করা। তাঁর ধানের বীজ নিয়ে সফল পরীক্ষা-নিরীক্ষার কথা জানেন সকলেই। ছয়ঘড়ি গ্রামে প্রায় পাঁচবিঘা জমিতে ধান, সব্জি, কলা ও মরশুমি ফসল চাষ করে তিনি হয়ে উঠেছেন প্রথম পূর্ণাঙ্গ সময়ের মহিলা কৃষক। আধুনিক উন্নতমানের চাষ করে জেলার চাষিদের কাছে অনুপ্রেরণা হয়ে উঠেছেন। মৌসুমির খ্যাতি জেলা ছাড়িয়ে গোটা রাজ্যে শুধু নয়,গোটা দেশে ছড়িয়ে পড়েছে।
শুরুটা হয়েছিল নিতান্তই পেটের টানে। মৌসুমি তখন কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের ছাত্রী। পড়াশোনা ঠিকই চলছিল। হঠাৎই দাদার মৃত্যুতে পালটে যায় তাঁর জীবনের গতিপথ। মায়ের দৃষ্টিশক্তি ক্ষীণ। সংসার বাঁচাতে তাই বাবার রেখে যাওয়া কয়েক কাঠা জমি আর কৃষি সরঞ্জাম নিয়ে মাঠে নেমে পড়েন। শুরুতে সহ্য করতে হয়েছিল নানা নিরাশাজনক কথা। সেসব পেরিয়ে সাফল্য আসে। আজ নিজের এক মাটির বাড়ি ভেঙে একতলা পাকা বাড়ি তুলেছেন। এখন তাঁর জমির পরিমাণ পাঁচ বিঘার বেশি। তিনি ক্ষতিকর কীটনাশক ও রাসায়নিক ছাড়াই সব্জি চাষ করেন। আট-দশ বছর ধরে কলা, পেঁয়াজ রসুন সহ নানা ধানের বীজ নিয়ে মাঠে বসেই গবেষণা চালিয়ে যাচ্ছেন। তাঁর অভিজ্ঞতা এবং দক্ষতার স্বীকৃতি মিলেছে ধানের বীজ উৎপাদন করে। প্রথমে নলাক আর আই আর-৩৬ ক্রস করে। তারপর প্রায় সাত বার ক্রস করিয়ে আনেন নতুন ধানের ভ্যারাইটি ‘এম যামিনী’। ১০ বছর পর ব্যাপক ফলন পেয়েছেন এই ধরনের বীজে।
কৃষি বিশেষজ্ঞদের দাবি, এই ধান পোকা মাকড়ের আক্রমণ সহ্য করতে পারে এবং রোগ সহনশীল। কম জলে ও শুষ্ক আবহাওয়ায় অধিক ফলনশীল ধান চাষের জন্য উপযুক্ত এই বীজ। গুজরাত ও পশ্চিমবঙ্গসহ নানা জায়গায় ফলন দিতে শুরু করেছে এই বীজ। চাষিরা বিঘাপ্রতি ৬-৭ কুইন্টাল ফলন পাচ্ছেন। চাষিদের দাবি, এই ধানে সেচ কম, রোগ কম, আবার ফলনও বেশি। মৌসুমির ‘এম যামিনী’ বীজ স্বীকৃতি পেলে মুর্শিদাবাদের মতো ভূগর্ভস্থ জলের অভাবে ক্ষতিগ্রস্ত জমিতেও কম সেচে, কম রাসায়নিকে অধিক ফলন মিলবে। এখনও পর্যন্ত সরকারি ভাবে এম যামিনী প্রজাতির বীজের স্বীকৃতি না মিললেও মহিলার উদ্যমকে সাধুবাদ জানিয়েছেন জেলার কৃষিকর্তারা।
জেলার এক কৃষি অধিকর্তা বলেন, যে কোনও পরামর্শের প্রয়োজন হলেই মৌসুমি আমাদের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। আমরা যথাসাধ্য সাহায্য করি। নানা রকমের ফসল তৈরি ও ধানবীজ নিয়ে মৌসুমির গবেষণা নতুন প্রজন্মের চাষিদের উৎসাহিত করে।
মৌসুমি বলেন, কোনও কাজই ছোট নয়। আন্তরিক ভাবে জমিতে চাষ করে সংসারের হাল ধরেছি। এবার সর্ষে বুনলাম। মুসুর ডালও লাগিয়েছি। পেঁয়াজ ও রসুন করব শীতে। সাড়ে চার বিঘা জমিতে ভাগ ভাগ করে নানা ফসল করছি। বিদেশি কলা লাগালাম, দেখি কেমন ফলন হয়। এছাড়া সারাবছর তো পটল, বেগুন, লঙ্কা, লাউ, কুমড়োসহ বিভিন্ন ফসল চাষ করি। রয়েছে একটি কলা বাগান। একটি পানের বরজ করেছিলাম। সকাল থেকে বিকেল পর্যন্ত রোজ নিজে হাতেই খেতের পরিচর্যা করি, এত ভালো ফসল হয়। ধানের বীজ এম যামিনী আমার কাছে স্বপ্নের মতো। সাত বার ক্রস করে দশ বছর গবেষণার পর ভালো ফলন পেয়েছি। নিজস্ব চিত্র