আইন দিয়ে লেখাপড়ার সংস্কৃতিকে ফেরানো যায় না
আইন দিয়ে লেখাপড়ার সংস্কৃতিকে ফেরানো যায় না
অহনা বিশ্বাস, অধ্যাপিকা
তিন দশক আগে একটি গ্রামের কলেজে ছাত্র পড়ানোর জন্য নিয়োজিত হয়েছিলাম। চাকরি পাওয়ার আগে পর্যন্ত নিজের লেখাপড়া, নিজের জীবিকা অর্জনের চিন্তায় নিজের চারপাশেই আবর্তিত হতাম। তারপর যখন হঠাৎ করে আমাকে ঘরভরতি চল্লিশ, পঞ্চাশ বা ষাট জন ছাত্রছাত্রীর মুখোমুখি হয়ে এক ধরনের অভিভাবকের আসন নিতে হয়, আমার মাথা ঘুরে যায় প্রায়। তখন মাথায় চিন্তা আসে, কাদের পড়াচ্ছি, কেন পড়াচ্ছি, এই পড়ানোর পরিণতি কী? শুধু কি আমার হাতে অর্থ আসার জন্য এই ব্যবস্থাপনা! সেই গ্রামেই থাকতাম। আমি ছাত্রছাত্রীদের সঙ্গে কথা বলতে শুরু করি। প্রথম প্রজন্মের পড়াশোনা বেশির ভাগের, অনেকের দ্বিতীয় বা তৃতীয়। তাতে খুব বেশি ফারাক হয় না। চাষিবাসি ঘরের ছেলেকে মা-বাবা মোটেও মাঠে নামতে দেয় না। নাপিত বাড়ির ছেলেকে সেই কাজ শেখানো হয় না। তাদের একমাত্র অন্বিষ্ট চাকরি পাওয়া, বিশেষত বিদ্যালয় স্তরের শিক্ষকতার চাকরি। তখন স্কুল সার্ভিস কমিশন চালু হয়েছে। লোকে বলছে, আগে মাইনে কম ছিল বলে ডাকলেও আমরা স্কুলের চাকরিতে যেতাম না, এখন এত টাকা!
শুনে আতঙ্কিত হতাম। এত প্রত্যাশা বাবা-মায়ের! অথচ স্কুলের চাকরি যদি ছেলেমেয়েরা পায়, তবে একটা ক্লাস থেকে কত জন পাবে? খুব বেশি হলে চার কি পাঁচজন। আর বাকিরা কি বানের জলে ভেসে এসেছে? তাদের কারও সাধারণ বুদ্ধিশুদ্ধি কম নেই। সবাই প্রায় উনিশ-কুড়ি। তারা তবে কী করবে ?
এরপর পথ খুঁজতে থাকি। এদিক-ওদিক নানা নিজস্ব জীবিকার সন্ধানে ছাত্র-ছাত্রীদের নিয়ে ঘুরি। কেউ কেউ আকর্ষিত হলেও সকলে হয় না। অনেক মেধাবী ছাত্র প্রাইমারি স্কুলে চাকরির জন্য একটা বছর কলেজে পড়েই ট্রেনিং নিতে ছোটে। চারদিকে তখন প্রচুর বেসরকারি বিএড কলেজ শুরু হয়েছে। বাড়ির সব পুঁজিটুকু সেখানে দিয়ে দেয়। চাকরি পেয়ে গেলে পড়াটাও ছেড়ে দেয়। আপশোস করি। মনে হয় মেধাবী ছেলেমেয়েগুলো আরও অনেক দূর যেতে পারত, এখানেই থেমে গেল!
বাংলা সাহিত্য পড়াই। ছাত্ররা যাতে সাহিত্যের পাঠ নেয়, গ্রন্থাগারমুখী হয়, তার জন্য সঙ্গে করে কলেজের লাইব্রেরিতে নিয়ে যাই। গ্রামের গ্রন্থাগারটিও সদস্য সংগ্রহের জন্য আমার উপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে। হ্যাঁ, ছেলেরাও স্বচ্ছন্দে যায়। যারা সিলেবাসের বাইরে স্কুলজীবনে আর কিছু পড়েনি, পড়ার কথা ভাবেনি, তারাও পড়তে শুরু করলে, দেখে আনন্দ পাই। তারপর যখন দেখি পছন্দসই জীবিকা না পেয়ে কালো রুগ্ণ চোখমুখ নিয়ে আমার প্রাক্তন ছাত্র-ছাত্রীরা ঘুরে বেড়াচ্ছে, তখন খুব কষ্ট হয়। এমন তো কথা ছিল না! এরা পড়তে চেয়েছিল, দাঁড়াতে চেয়েছিল। কিন্তু সাধারণ ছেলেমেয়েরা যা পড়ে, তাদের যা পড়ার বিষয়বস্তু তা বাস্তবে প্রায় কোনো জীবিকার কাজে লাগে না।
এরপর দেশে এল চিটফান্ডের রমরমা। চাকরির নেশায় আমাদের ছেলেমেয়েরা এসব কাজে যুক্ত হয়ে পড়ল। পঞ্জি স্কিমের ভালো সময় দেখতাম, ছেলে মেয়েরা ফিটফাট হয়ে হাসিমুখে ঘুরত। দেখা হলে বলত, অফিস যাচ্ছি। ম্যাডাম, আপনি আমার কাছে একটা ইনভেস্টমেন্ট করুন না। অনেক লাভ পাবেন।
কিছু বলতে পারতাম না। বলে লাভ হত না। আমি নিজে সরকারি চাকরি করি। চাকরি বাদে নিজে নিজে কিছু গড়ে তোলার উদাহরণ হয়ে উঠতে পারিনি। হোয়াইট কলার জব- এর প্রতি যে মোহ, যে সামাজিক প্রতিপত্তি ইংরেজ আমল থেকে আমাদের দেশে ছড়িয়েছে, তার ব্যাধি থেকে উদ্ধার হওয়ার পথ নেই। সেই থেকে অফিসে কাজ করার প্রতি আমাদের এত লোভ।
তারপর দিন যায়। আমি গ্রামের কলেজ ছেড়ে আরেকটি মফস্সল কলেজে পড়াতে আসি। স্কুলে চাকরির আশা যত কমে যায়, কলেজে ছাত্র আসাও তত কমতে থাকে। অভিভাবকরা চান না সন্তান বাস-ট্রেনের ভাড়া গুনে পয়সা খরচ করে কলেজে আসুক। ক্লাসে পনেরো-কুড়িটা ছেলেমেয়ে এলেই অনেক মনে হয়। আজ যারা আসছে, কাল তারা আসে না। ফলে ছাত্র-ছাত্রীদের সঙ্গে শিক্ষকদের সম্পর্ক তৈরি হয় না। খুব কষ্ট করে কলেজে অনুষ্ঠান করাই। আইন দিয়ে লেখাপড়ার সংস্কৃতিকে ফেরানো যায় না। ছাত্রদের লাইব্রেরিমুখী করাতে পারি না। এমনকি পরীক্ষায় যা আসবে, তার বাইরে ফোন থেকে একটা পিডিএফ পড়াতেও যুদ্ধ করতে হয়।
এখন প্রায় প্রত্যেক ছাত্র-ছাত্রী কলেজে পড়তে ঢুকলেই স্কলারশিপের নামে কিছু টাকা পায়। শুধু এই টাকার জন্যই কলেজে নাম লেখানো, পরীক্ষা দেওয়া। পরীক্ষায় এত বেশি ছোটো ছোটো প্রশ্ন যে, পাশ করতে খুব একটা অসুবিধে নেই। পাঁচ-ছয়টি বড়ো রচনাধর্মী উত্তর মুখস্থ করে লিখলেও যতটুকু বোধ তৈরি হয়, এখানে তার সুযোগ নেই। এখন আর হোয়াইট কলার জবেরও আকাঙ্ক্ষা নেই। যেকোনো কাজ করলেই হল। একটা মোবাইল আর মোটরসাইকেল হাতে এলেই মন ভরে যায়। তার সঙ্গে কেবল কলেজে নাম লেখানো। এর মধ্যে দিয়ে গড়পড়তা পরিবারের ছাত্র-ছাত্রীদের বিকাশ কীভাবে সম্ভব— সে আমাদের দেশের শিক্ষা কর্মকর্তারাই জানেন।
আমি সম্পন্ন, অধিক শিক্ষিত, দেশ-বিদেশ ঘোরা পিতা-মাতার সন্তানদের কথা লিখলাম না। মাটির কাছাকাছি মানুষদের কথা লিখলাম। যেখানে ক্রমান্বয়ে বেড়েছে টাকার জন্য ডিগ্রি লাভ, অধিক পরিমাণে বিবাহিত মেয়ে এবং হিজাব বোরখা পরা মেয়েদের সারি। চুল এবং মুখ না দেখানোর এমন বিলাস দশ বছর আগেও দেখিনি।
সঞ্জয় বারুই, শিক্ষক
সন্তানকে কঠিন পরিস্থিতি সামলাতে দিন
২০০৯। শিক্ষক হিসেবে যোগ দিয়েছিলাম দক্ষিণ দিনাজপুরের একটা স্কুলে। দেখতে দেখতে ১৮ বছর...। শিক্ষক হিসেবে সাবালক হয়ে গেলাম! পরে আবার এসএসসি দিয়েছিলাম। ২০১৩-র শেষ দিকে আমি যোগ দিই বারুইপুরের কাঁঠালবেড়িয়া হরিহর হাইস্কুলে। এখনও সেখানেই পড়াই। আমার বিষয় ইংরেজি।
আমার শিক্ষক জীবনের শুরুর দিকে ইন্টারনেট, হোয়াটসঅ্যাপের এত প্রচলন ছিল না। আগে ছাত্রছাত্রীরা হাতে তথ্য কম পেত। এখন ইন্টারনেটের দৌলতে তাদের হাতের সামনে প্রচুর তথ্য। তথ্য এত বেশি যে কোন তথ্য নেওয়া উচিত, কোনটা নয়, সেটা ওদের গাইড করতে হয়। এটা আমার ব্যক্তিগত মত। এখন ফোন খুললেই উপযোগী নয় এমন নানা বিষয় চোখের সামনে চলে আসে। ফলে কী দেখব, আর কী দেখব না, সেটা ফিল্টার করে নেওয়া ভালো। ‘এটা এখনই তোদের জন্য নয়, এটা দেখিস না। বরং এটা দেখ, কাজে লাগবে’— এটুকু বুঝিয়ে বললে ওরা শোনে।
কোনোদিনই শিক্ষক হিসেবে আমি অর্ডার করি না। বন্ধুর মতো মিশি। কিন্তু শিক্ষক আর বন্ধুর মধ্যে একটা সূক্ষ্ম ফারাক থাকে। সেটা বজায় রাখি সবসময়। ওদের সঙ্গে এতটাও বন্ধুত্ব হয় না, যে ওরা আমার কাঁধে হাত দিয়ে চলতে পারে। আবার এতটাও গুরুগম্ভীর নয় যে, ওদের কোনো সমস্যা হলে ওরা শেয়ার করতে পারবে না। শাসন, স্নেহের মেলবন্ধন বলতে পারেন। কিন্তু তার মধ্যেও কিছু অনভিপ্রেত ঘটনা তো ঘটেই। শিক্ষক শাসন করলে, কখনো অভিভাবকদের আপত্তি তৈরি হয়। একটা ঘটনার কথা মনে পড়ছে। অ্যানুয়াল প্রোগ্রামের আগে স্কুলের মাঠ পরিষ্কার করার হচ্ছিল। আমরা ছাত্র-ছাত্রীদের নিয়ে নিজেরাই পরিষ্কার করছিলাম। পরে একজন অভিভাবক এসে অভিযোগ করেন, কেন তাঁর মেয়েকে দিয়ে কাজ করানো হয়েছে? তখন ব্যাপারটা আমিই সামলেছিলাম। বুঝিয়েছিলাম, শিক্ষা তো শুধু পুঁথিগত বিষয় নয়। সার্বিক বিকাশ না হলে শিক্ষা সম্পূর্ণ হয় না। স্কুলের মাঠ তো আমরাই নোংরা করেছি। তাই আমরাই পরিষ্কার করছি। এতে আপনার মেয়ে শিখছে, আমি যেটা নোংরা করেছি, সেটা আমাকেই পরিষ্কার করতে হবে। অন্য মানসিকতা নিয়ে আপনার মেয়েকে মাঠ পরিষ্কার করাতে নামিনি। অনেকটা বোঝানোর পর বুঝতে পেরেছিলেন। কয়েক বছর আগেও শিক্ষকের অনুশাসনে অভিভাবকরা নালিশ জানাতে আসতেন না।
কঠোর শিক্ষক আমি নই। খোলাখুলি আলোচনা করার চেষ্টা করি। প্রথমদিকে গ্রামের স্কুলে পড়াতাম। সেখানে হয়তো এতটা এগিয়ে এসে কথা বলত না ছাত্র-ছাত্রীরা। এখন বিষয়টা কিছুটা অন্যরকম। একদিন যেমন ক্লাস টেনের একটি মেয়ে অন্যমনস্ক। আমি পড়াতে গিয়ে সেটা লক্ষ করলাম। জিজ্ঞেসও করলাম, কী হয়েছে? পরে আলাদা করে আমাকে বলল, কোনো বন্ধু ওর কথা শোনেনি বা ওর বিরুদ্ধে কিছু বলেছে। আমি ওকে বোঝালাম, তুমি এটা আশা করছ কেন, সকলে তোমার ব্যাপারে ভালো কথাই বলবে? ওরা যুক্তি দিয়ে বোঝার চেষ্টা করে। এমন নয় যে আমি শিক্ষক বলে যা বলছি সেটাই অন্ধের মতো অনুসরণ করবে। ওরা প্রশ্ন করে।
যুগ বদলেছে। অভ্যেস বদলাবে, এটাই স্বাভাবিক। আমার মনে আছে, আমরা যখন ছাত্র, ধরা যাক রাস্তায় সাইকেল চালাচ্ছি, স্যারকে দেখতে পেলে নেমে যেতাম। হেঁটে গিয়ে কথা বলতাম। সেটা ২০০৯-’১০ অবধিও আমি পেয়েছি। আমি নামতে বারণ করতাম। কিন্তু ছাত্রছাত্রীরা নেমে যেত। সেই অভ্যেস এখন কম দেখতে পাই।
এখন বেশিরভাগ বাড়িতেই একটিই সন্তান। ফলে বাবা, মায়েদের সম্পূর্ণ মনোযোগ একজনের উপরই থাকে। কিন্তু বাচ্চাদের সাবলম্বী করার জন্য একটু ছেড়ে দেওয়া উচিত। আমাদের ছোটোবেলায় বাবা, মায়েরা ছায়াসঙ্গী থাকতেন না। মাঠে খেলতে গিয়ে হাত কেটে গিয়েছে। সেটা নিজেই চেপে ধরে লুকিয়ে বাড়ি ফিরেছি। কারণ, জানতে পারলে মা বকবে। ফলে নিজের সমস্যার সমাধান নিজেকেই করতে হবে, এটা শিখতে হবে। কিছু অভিভাবক এতটাই ওভার প্রোটেকটিভ যে বাচ্চারা বুঝতেই পারে না, ওদের সঙ্গে কী ঘটছে বা ওদের কী করা উচিত। সন্তানকে কঠিন পরিস্থিতি সামলাতে দেওয়া উচিত বলে মনে করি।