পিনাকী ধোলে, পুরুলিয়া: নদীর স্রোতে ভাসছে ভেলা। ঘোমটা টেনে ঠায় বসে এক বধূ। পাশে শায়িত স্বামীর মরদেহ। ভেলায় যেতে যেতে রাতদিন এক করছেন তিনি। দেহে পচন ধরেছে। খসে খসে পড়ছে মাংসপিণ্ড। দুর্গন্ধে টেকা দায়! তবুও ঠায় বসে বধূ। তাঁর দু’চোখে জলের ধারা। মুখে মনসা-গীত। পুরুলিয়ার পুঞ্চা ব্লকের জামবাদের প্রত্যন্ত কুলডি গ্রামের বাসিন্দা মহম্মদ আনসারি কি ফুটিয়ে তুলতে পারবেন সেই বধূর এমন করুণ চরিত্র? একেই তিনি ধর্মপ্রাণ মুসলিম। তার উপর চাঁদ সওদাগরের মতো কট্টর শৈবভক্তের পুত্রবধূর নিখুঁত বেশধারণ, সে তো আর চাট্টিখানি কথা নয়! পারলেও দর্শক কি গিলতে পারবেন, এক মুসলিম যুবকের মুখে হিন্দু সনাতনী ধর্মের মহিমা কীর্তন? ধন্দে ছিলেন আনসারি নিজেও। কিন্তু, যখন তিনি ভক্তিভরে মা-মনসার বন্দনায় স্বামী লখিন্দরকে মর্তে জীবিত ফিরিয়ে আনলেন, তখন গ্রামের পুকুরের পাড়ে দাঁড়ানো হাজার হাজার দর্শক সেদিন হাততালি দিয়ে বুঝিয়ে দিয়েছিলেন শিল্পীর কোনও জাত হয় না। ধর্মও হয় না। বেহুলার প্রাণ প্রতিষ্ঠায় আনসারি সফল। সে সঙ্গে সেদিন এটাও ফের প্রমাণিত হয়েছিল, রবি ঠাকুর-নজরুলের বাংলার নির্ভেজাল উদারতা। সেই শুরু। আনসারিকে আর পিছন ফিরে তাকাতে হয়নি। এখন তিনি পুরোদস্তুর মনসা মঙ্গলকাব্যের ‘বেহুলা’। মানভূমে তো বটেই, ভিনজেলাতেও তাঁর অভিনয় উচ্চ প্রশংসিত। তাই হয়তো আবেগ জড়ানো গলায় আনসারি বলছিলেন, ‘একজন মুসলিম যুবককে হিন্দুধর্মের মাহাত্ম্য প্রচারে দর্শক যে গ্রহণ করবেন, তা ভাবলেই মনটা আনন্দে ভরে ওঠে। এটাই হয়তো আমাদের হিন্দু-মুসিলম ঐক্যের অহংকার।’ শুরুতে অবশ্য বাধা বিপত্তি ছিল। মুসলিম যুবকের গলায় মনসা বন্দনা ঠিক হজম হয়নি অনেক ধর্মপ্রাণ মানুষেরও। যদিও পরে তাঁদের ভুল ভাঙে। মহম্মদ বলছিলেন, ‘বহু বাধা এসেছে। আমাদের ধর্মেরও অনেকেই বলতেন যে মুসলিম হয়ে এসব করতে নেই। কিন্তু আমি সেসবে পাত্তা দিইনি। কারণ নিজের ধর্মাচারণে তো অবহেলা করি না। মসজিদে যাই। নামাজ পড়ি। মনসা-গীত আমার কাছে শিল্প।’ মহম্মদ মনে করিয়ে দেন, ‘আমি পুরুলিয়ার ছেলে। টুসু, ভাদু, ঝুমুর, ছৌ, জাতমঙ্গল এটা পুরুলিয়া তথা মানভূমের গর্ব। আমি সেই ঐতিহ্য বহন করে চলেছি।’



