আনন্দ সাহা, লালবাগ: ধ্বংসের মুখে বাংলার প্রথম সুবে স্বাধীন নবাব মুর্শিদকুলি খাঁর দৌহিত্র সরফরাজ খাঁ নির্মিত অসমাপ্ত ফৌতি বা ফুটি মসজিদ। অভিযোগ, অবহেলা এবং নজরদারির অভাবে পর্যটকদের অলক্ষ্যে পড়ে থাকা নবাবি ইতিহাসের অন্যতম দলিল ভগ্নপ্রায় অবস্থায় ধ্বংসের মুখে দাঁড়িয়ে রয়েছে। নজরদারি এবং রক্ষণাবেক্ষণের দাবিতে সরব হয়েছেন স্থানীয় বাসিন্দা, ইতিহাস গবেষক থেকে পর্যটন শিল্পের সঙ্গে যুক্ত মানুষ। প্রায় তিন শতাব্দী প্রাচীন এই মসজিদের অধিগ্রহণ ও রক্ষণাবেক্ষণের আবেদন জানিয়ে ইতিমধ্যেই মুর্শিদাবাদ হেরিটেজ কালচারাল অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট সোসাইটির পক্ষ থেকে ভারত সরকারের পুরাতত্ত্ব সর্বেক্ষণ দপ্তরে বেশ কয়েকবার চিঠি পাঠানো হলেও সংশ্লিষ্ট দপ্তর থেকে কোনও প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি বলে জানা গিয়েছে।
নবাবি আমলের অন্যতম স্থাপত্য নিদর্শন ফৌতি মসজিদ। হাজারদুয়ারি প্যালেস মিউজয়াম থেকে দেড় মাইল পূর্বে মুর্শিদাবাদ পুরসভার ৮ নম্বর ওয়ার্ডে এই অসমাপ্ত মসজিদটি রয়েছে। মুর্শিদকুলি খাঁর মেয়ে আজিমুন্নেসার পুত্র সরফরাজ খাঁ সুবে বাংলার নবাব পদে অভিষিক্ত হওয়ার পরে আনুমানিক ১৭৪০ সালে মসজিদের নির্মাণ কাজ শুরু করান। কিন্তু ওই বছর ৯ এপ্রিল সুতির কাছে গিরিয়ার মাঠে আলীবর্দির সঙ্গে যুদ্ধে সরফরাজ খাঁর মৃত্যু হয়। তার মৃত্যুর পরে পরবর্তী কোনও নবাব মসজিদের কাজ সম্পন্ন করতে উৎসাহ দেখাননি। কাজেই তখন থেকেই অসমাপ্ত অবস্থায় পড়ে রয়েছে মসজিদটি। ১৪২ ফুট লম্বা, ৩৯ ফুট চওড়া এবং ৪২ ফুট উচ্চতা বিশিষ্ট মসজিদটির উপরে তিনটে অর্ধ বৃত্তাকার গম্বুজের মধ্যে নবাব সরফরাজ খাঁর জীবিত অবস্থায় দু’টির কাজ সম্পন্ন হয়েছিল। গিরিয়ার যুদ্ধে নবাবের মৃত্যু হওয়ায় একটি গম্বুজের নির্মাণ কাজ অসমাপ্ত থেকে যায়। সেই কারণে ফৌতি মসজিদকে স্থানীয়রা অনেকে ফুটো মসজিদও বলে থাকেন। ২৮০ বছরের প্রাচীন নবাবি স্থাপত্যের এই নিদর্শনটি নজরদারি এবং দেখভালের অভাবে কালের নিয়মে ধীরে ধীরে ধ্বংসের দিকে এগিয়ে চলেছে। মসজিদের গায়ে বট সহ বিভিন্ন গাছ গজিয়ে উঠায় মসজিদের চার দেওয়াল জুড়ে বড় বড় ফাটল দেখা দিয়েছে। ফলে মুর্শিদাবাদ এসে হাজারদুয়ারি প্যালেস, কাটরা মসজিদ, ইমামবারা সব অন্যান্য স্থাপত্য নিদর্শনগুলি ঘুরে দেখলেও নবাবি আমলের অন্যতম উল্লেখযোগ্য স্থাপত্য নিদর্শন ফৌতি মসজিদ পর্যটকদের কাছে উপেক্ষিত থেকে যায়। মুর্শিদাবাদ ঘুরতে এসেছিলেন হুগলির বাসিন্দা দীনেশ দাস। তিনি বলেন, মসজিদের সামনের দিকে চুন ও সুরকির অসামান্য কাজ রয়েছে। মসজিদটি নবাবি স্থাপত্য ঘরানার অন্যতম শ্রেষ্ঠ নিদর্শন। এই নিদর্শনকে রক্ষা করতে উদ্যোগী না হলে আর কয়েক বছর পরে নবাবি ইতিহাসের আরও একটি দলিল চিরতরে হারিয়ে যাবে। মুর্শিদাবাদ হেরিটেজ অ্যান্ড কালচারাল ডেভেলপমেন্ট সংগঠনের সভাপতি স্বপন ভট্টাচার্য বলেন, দুই শতাব্দীর বেশি সময় ধরে অনাদর ও অবহেলায় পড়ে থেকে মসজিদটি ধ্বংসপ্রাপ্ত হচ্ছে। প্রশাসন মসজিদটি অধিগ্রহণ করে রক্ষণাবেক্ষণ করলে পর্যটকরা নবাবি স্থাপত্যের অন্যতম নিদর্শন প্রত্যক্ষ করতে পারবেন এবং ইতিহাসের ছাত্র ও গবেষকরাও উপকৃত হবেন। • নিজস্ব চিত্র