চালাকিটা ধরা পড়ে গিয়েছে। কেন্দ্রের নরেন্দ্র মোদি সরকারের বাণিজ্য মন্ত্রক গত বছরের অক্টোবর থেকে ডিসেম্বর—এই তিনমাসে মূল্যবৃদ্ধির হার তলানিতে পৌঁছেছে বলে দাবি করে আসছিল। এমনও বলা হচ্ছিল, আট বছরের মধ্যে দেশে এই মূল্যবৃদ্ধির হার সর্বনিম্ন। তার আগে সেপ্টেম্বর মাস পর্যন্ত অবশ্য এমন দাবি করার সাহস দেখায়নি কেন্দ্র। তখন দিল্লির অজুহাত ছিল, মূলত খাদ্যপণ্যের মূল্যবৃদ্ধির কারণেই সামগ্রিকভাবে মূল্যবৃদ্ধিতে রাশ টানা যাচ্ছে না। এর অর্থ দাঁড়ায়, অক্টোবর থেকে খাদ্যপণ্যের দাম কমে গিয়েছে। যার ফলশ্রুতিতে মূল্যবৃদ্ধির হার ২ শতাংশের নীচে নেমে গিয়েছে। আসলে কি তাই? ২০২৫-এর বছরের শেষ তিনমাসে কাঁচা আনাজ থেকে খাদ্যপণ্যের দাম কি আদৌ কমেছিল? বাজার ফেরত আম জনতার অভিজ্ঞতা ঠিক উলটো। উৎসবের মরশুমে যে আকাশছোঁয়া দামে নিত্যপণ্য সংগ্রহ করতে হয়েছে মানুষকে, আর শীতে পণ্যের চাহিদা বাড়ার কথা থাকলেও তার সুফল মেলেনি। অর্থাৎ, বাজারদরের সঙ্গে সরকারের দাবি মিলছে না। সাধারণত সরকারি পরিসংখ্যানকে সঠিক বলে মান্যতা দেওয়াই রীতি। কিন্তু এক্ষেত্রে আম জনতার অভিজ্ঞতাকে মান্যতা দিয়ে মোদি সরকারের দেওয়া তথ্যকে পুরোপুরি অস্বীকার করল রিজার্ভ ব্যাংক। মূল্যবৃদ্ধি নিয়ে দেশের সর্বোচ্চ ব্যাংক যা বলেছে, তাতে ধন্দ কেটেছে মানুষের। পাশাপাশি ধরা পড়ে গিয়েছে সরকারের চালাকি।
চলতি মাসে প্রকাশিত রিজার্ভ ব্যাংকের ইনফ্লেশন এক্সপেকটেশন সার্ভে রিপোর্ট প্রকাশিত হয়েছে। তাতে দেখা যাচ্ছে, যে সময়ে সরকারি খাতায় মূল্যবৃদ্ধির হার দেখানো হয়েছে ১ শতাংশ, সেই সময় সাধারণ মানুষের খাদ্য ও অন্যান্য পণ্য কেনার হার দাঁড়িয়েছে ৬.৬ শতাংশ। অর্থাৎ কোনও পণ্যের দাম ১০০ টাকা থাকলে তা বেড়ে ১০১ টাকা হয়েছিল বলে দাবি করেছিল কেন্দ্রীয় সরকার। কিন্তু সাধারণ মানুষকে তা কিনতে হয়েছে প্রায় ১০৭ টাকায়। মানে কেন্দ্র যা বলেছে, তার প্রায় ৭ গুণ বেশি দামে পণ্য কিনতে হচ্ছে সাধারণ মানুষকে। আরবিআইয়ের সমীক্ষা রিপোর্ট উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেছে, এ বছরের এপ্রিল মাস পর্যন্ত এই হার ৮ শতাংশে পৌঁছে যেতে পারে। এই পরিসংখ্যানে পরিষ্কার, গত বছরের শেষ তিন মাসে পণ্যের দাম সর্বনিম্ন হওয়া তো দূর অস্ত, বরং লাফিয়ে বেড়েছে। যদিও সরকারি খাতায় পণ্যের দাম কম দেখানো নিয়ে অনেকদিন ধরেই সরব দেশের বিরোধী দলগুলি। এই সুর আরও চড়ে ভারতের জিডিপি, শিল্পবৃদ্ধি ও মূল্যবৃদ্ধি হিসাব করার তথ্য নিয়ে আইএমএফ সন্দেহ প্রকাশ করায়। বাজার বিশেষজ্ঞদের একাংশের ধারণা, জিএসটি কমার পুরো সুবিধা ক্রেতারা এখনও পাচ্ছেন না। পণ্য কিনলে তাঁদের যতটা দাম গুনতে হচ্ছে, সরকারি খাতায় তার প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে না। অনেকের মতে আবার, কিছু ক্ষেত্রে অত্যধিক ঠান্ডায় ফলন নষ্ট হওয়ায় দাম নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গিয়েছে।
বৃদ্ধির হার নিয়ে এই বৈপরীত্য কাটাতে কেন্দ্র যে নতুন পদ্ধতি চালু করতে চলেছে, তাতে মূল্যবৃদ্ধির প্রকৃত ছবিটা আরও অধরা হয়ে উঠবে বলে বিশেষজ্ঞদের একাংশের ধারণা। কী সেই পদ্ধতি? এতদিন মূল্যবৃদ্ধি, জিডিপি ও শিল্পোৎপাদনের হার নির্ধারণ করতে ভিত্তিবর্ষ হিসেবে ধরা হত ২০১২ সালকে। এবার থেকে জিডিপি ও শিল্পোৎপাদনের ক্ষেত্রেও ২০২২-২৩ সাল এবং মূল্যবৃদ্ধির ক্ষেত্রে ২০২৪ সালকে ভিত্তিবর্ষ হিসেবে ধরা হয়েছে। চালাকিটা এখানেই। এর ফলে ২০২৪-এর তুলনায় দাম বৃদ্ধির হার খুব বেশি হবে না। কারণ, ওই বছর মূল্যবৃদ্ধির হার বেশ চড়া ছিল। তাই ওই বছরকে ভিত্তিবর্ষ করায় সরকার বলতে পারবে, দাম বেড়েছে সামান্যই। প্রকৃত তথ্য ধামাচাপা দিতে আরও একটি পরিবর্তন আনা হয়েছে। সাধারণ নিয়মে খুচরো পণ্যের মধ্যে সব থেকে বেশি কেনাকাটা হয় খাদ্যদ্রব্য। এতদিন তাই মূল্যবৃদ্ধি নির্ধারণের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি ওয়েটেজ ৪৯ শতাংশ ছিল খাদ্যেরই। সামগ্রিক মূল্যবৃদ্ধির হার কমিয়ে দেখাতে এবার সেই খাদ্যের ওয়েটেজ কমিয়ে করা হয়েছে ৩৬ শতাংশ। অঙ্কটা পরিষ্কার। যেহেতু খুচরো পণ্যের মধ্যে খাদ্যদ্রব্যের দামই বেশি বাড়ে, সুতরাং তার মূল্যায়ন কমিয়ে দেখাতে পারলে সামগ্রিক মূল্যবৃদ্ধির হারও কম বলে দাবি করা যাবে। মূল্যায়নের ক্ষেত্রে এই নতুন পদ্ধতি অবলম্বন করলে ভবিষ্যতে সরকারের দেওয়া তথ্য ‘সঠিক নয়’ বলে তুলে ধরা কঠিন হবে। অর্থাৎ জল মিশিয়ে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলবে সরকার। তাতে চালাকি ধরা পড়ার সম্ভাবনাও কমবে। সরকার উলটে সাফল্যের জয়গান গাইবে। জনগণের কষ্ট লাঘব হবে না। কিন্তু সব মানুষকে বোকা ভাবা বোধহয় ঠিক নয়। ছল-চাতুরি, কৌশল করে মোদি সরকার যতই বাস্তব সত্যকে আড়াল করার চেষ্টা করুক না কেন ভুক্তভোগী আম জনতা কিন্তু তাঁদের অভিজ্ঞতা দিয়েই সব কিছুই বুঝতে পারছেন, ধরতে পারছেন ভাঁওতাটাও।