Bartaman Logo
১০ জুন, ২০২৬
বর্তমান / চতুষ্পর্ণী

হারানো রান্নার গল্প

আমার বাবা ছিলেন ডাক্তার। রানাঘাটে ছিল তাঁর মূল প্র্যাকটিস। সেই সূত্রে আমারও ছোটবেলা কেটেছে রানাঘাটে। যে অঞ্চলে আমরা থাকতাম তার নাম বেগো পাড়া।

হারানো রান্নার গল্প
  • ২২ নভেম্বর, ২০২৫ ০৪:০০
Prefer us on Google

শ্রাবণী রায়: আমার বাবা ছিলেন ডাক্তার। রানাঘাটে ছিল তাঁর মূল প্র্যাকটিস। সেই সূত্রে আমারও ছোটবেলা কেটেছে রানাঘাটে। যে অঞ্চলে আমরা থাকতাম তার নাম বেগো পাড়া। পাড়াটি মূলত খ্রিস্টান পাড়া নামেই পরিচিত ছিল। আমি পড়তাম খ্রিস্টান মিশনারি স্কুলে। আমার বন্ধুবান্ধবদের মধ্যেও প্রচুর অ্যাংলো ইন্ডিয়ান ছিল। তাদের পরিবারে রান্নার ধরন, স্বাদ ও গন্ধ ছিল একেবারেই অন্যরকম। সেই স্বাদ আমাদের পরিচিত বাঙালি রান্নার স্বাদ নয়, তবু কোথাও যেন ভীষণ মিলও রয়েছে দু’টি রান্নার মধ্যে। অদ্ভুত এক দ্বৈতভাব মনে জাগত এই খাবারগুলো চেখে দেখলে। মনে হতো এই খাবার কোথাও যেন আমার খুবই পরিচিত, আবার ঠিক রোজকার খাবারের মধ্যেও তা পড়ে না। ভেবে দেখতে গেলে অ্যাংলো ইন্ডিয়ান সেইসব পদই বোধহয় আদি ফিউশন ফুড। পরবর্তীকালে যখন কলকাতায় চলে এলাম তখনও মিশনারি স্কু঩লেই ভর্তি হই। ফলে খ্রিস্টান আচার অনুষ্ঠান ও সেইসব রান্না আমার চিরকালের সঙ্গী হয়ে থেকে গিয়েছিল। 
ছোটবেলায়, আমাদের মিশনারি স্কুলে তো বটেই এমনকী গোটা পাড়াতেও বড়দিন থেকে ইংরেজি নিউ ইয়ার জুড়েই চলত ফেস্টিভ মরশুম। নানারকম রান্না হতো অ্যাংলো ইন্ডিয়ান বাড়িতে। সেইসব রান্নার স্বাদের একটা বৈশিষ্ট্য ছিল। এই রান্নায় একাধারে যেমন বিদেশি উপকরণ থাকত, তেমনই আবার ভারতীয় উপকরণও ব্যবহার করা হতো। কখনও হয়তো উপকরণগুলো ভারতীয় আর রান্নার পদ্ধতি বিদেশি। অর্থাৎ মাছ দিয়ে রোস্ট বা গ্রিল। এমন বিভিন্ন উদাহারণ রয়েছে। আজকে তেমনই একটা রান্না শিখতে চলেছি আমরা, নাম ফিশ মোলি। প্রথমেই বলি, এই রান্নার সঙ্গে ফিশ মৌলি বা ফিশ মোইলি-কে গুলিয়ে ফেলবেন না, সেগুলো ভিন্ন পদ। আজকের পদটির নাম ফিশ মোলি। কেরলে যখন পর্তুগিজদের দখল ছিল তখনই এই পদটির প্রচলন ঘটে। পদটি সম্ভবত পর্তুগিজ ফিশ স্টু-এর ভারতীয় সংস্করণ। পর্তুগিজ স্টু-এর আঝালি স্বাদের সঙ্গে দক্ষিণ ভারতীয় ঝাল, মশলা মিশিয়ে নতুন পদটি বানিয়েছিলেন মলি নামে এক অ্যাংলো ইন্ডিয়ান মহিলা। সেই কারণেই সম্ভবত পদের নাম হয় ফিশ মোলি। চলুন শিখে ঩নিই তার রেসিপি।

Advertisement

ফিশ মোলি

উপকরণ: একটু মোটা করে কাটা মাছের ফিলে ১ কেজি, পেঁয়াজ স্লাইস করে কাটা ৩টে, চেরা কাঁচালঙ্কা ৪-৫টা, রসুন কুচি ১ চা চামচ, আদা কুচি ১ চা চামচ, নারকেলের দুধ (ঘন) ১ কাপ, টম্যাটো কুচি ১টা, কারিপাতা ৬-৭টা, গোলমরিচ গুঁড়ো ১ চা চামচ, শুকনো লঙ্কা গুঁড়ো  চা চামচ, হলুদ গুঁড়ো  চা চামচ, ধনে গুঁড়ো ১ চা চামচ, গোটা সর্ষে  চা চামচ, লেবুর রস ১ টেবিল চামচ, তেল ৩ টেবিল চামচ, নুন স্বাদ মতো।    

প্রণালী: মাছে নুন ও হলুদ মাখিয়ে নিন। কড়াইতে তেল গরম করে মাছ সোনালি রং ধরিয়ে ভেজে নিন। তারপর তা আলাদা করে রেখে দিন। একই কড়াইতে আর একটু তেল যোগ করে গোটা সর্ষে ফোড়ন দিন। তারপর পেঁয়াজ, রসুন ও আদা দিয়ে ভাজুন। লালচে হলে টম্যাটো ও কারিপাতা দিয়ে দিন। একটু নাড়াচাড়া করে নিন। এবার নুন ও গোলমরিচ গুঁড়ো যোগ করুন। সবটা মিশিয়ে নিন। একটা বাটিতে বাকি মশলা নিয়ে লেবুর রস যোগ করে একটা পেস্ট বানিয়ে নিন। এরপর সেই পেস্ট মূল রান্নায় দিয়ে নাড়াচাড়া করুন। সব শেষে নারকেলের দুধ মেশান। ঢিমে আঁচে রান্না হতে দিন। ফুটতে শুরু করলে এবং ঝোল বেশ ঘন হলে একে একে ভাজা মাছ দিয়ে দিন। মাছ গ্রেভিতে মিশে গেলে এবং গ্রেভি বেশ ঘন হয়ে গেলে নামিয়ে নিন। সাদা ভাত সহযোগে পরিবেশন করুন পদটি।   

 

মাটন স্টু

উপকরণ: মাটন ৪ পিস, গাজর (বড় টুকরোয় কাটা) ২ পিস, পেঁপে (বড় টুকরোয় কাটা) ২ পিস, মাঝারি সাইজের আলু মাঝখান থেকে কেটে ২ টুকরো করে নেওয়া, মাঝারি সাইজের পেঁয়াজ সরু করে কুচিয়ে নেওয়া ১টা, রসুন বাটা ১ চা চামচ, ১ ইঞ্চি মতো আদা সরু লম্বা করে কুচিয়ে নেওয়া, ছোট এলাচ ২টি, দারচিনি ১ ইঞ্চি কাঠি, লবঙ্গ ৩টি, তেজপাতা ১টি, গোলমরিচ ৪-৫টি, কাঁচা লঙ্কা ১টি, দুধ ২ টেবিল চামচ, ময়দা  চা চামচ, ঘি ১ চা চামচ, সাদা তেল প্রয়োজন মতো, নুন স্বাদমতো, গোলমরিচ গুঁড়ো আন্দাজ মতো।

প্রণালী: মাটনে নুন, সাদা তেল, রসুন বাটা ও গুঁড়ো গোলমরিচ মাখিয়ে আধ ঘণ্টা রেখে দিন। কড়াইতে সাদা তেল গরম করে নিন। তাতে তেজপাতা, গোটা গোলমরিচ ও গোটা গরমমশলা ফোড়ন দিন। সুগন্ধ উঠলে প্রথমে আদা কুচি দিয়ে নাড়াচাড়া করুন। এর উপর পেঁয়াজ কুচি যোগ করুন ও হালকা বাদামি রং ধরিয়ে ভেজে নিন। সব সব্জি ও মাটন যোগ করে মিনিট পাঁচেক মাঝারি থেকে মৃদু আঁচে নাড়াচাড়া করে রান্না করুন। প্রয়োজন মতো জল যোগ করে প্রেশার কুকারে সব কিছু ঢেলে দিন। দুধে ময়দা গুলে নিন। তা স্টুতে যোগ করুন। এবার প্রেশার কুকারে একটি সিটি তুলে নিন। আঁচ কমিয়ে ১০ মিনিট মৃদু আঁচে রেখে দিন। তারপর নামিয়ে নিন। চেরা কাঁচালঙ্কা দিয়ে ও মাখন ছড়িয়ে পরিবেশন করুন।

 

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ