শ্রুতির হার না মানার গল্প
  • ৩১ অক্টোবর, ২০২৬ ০৪:০০
Prefer us on Google

আইএএস অফিসার হওয়ার স্বপ্ন দেখতেন তিনি। সেই স্বপ্ন পূরণ করতে বছরের পর বছর ধরে প্রস্তুতি নিয়েছিলেন শ্রুতি শ্রীবাস্তব। একবার নয়, ছ’বার ইউপিএসসি পরীক্ষায় বসেছিলেন। চারবার প্রিলিমিনারি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হলেও শেষ পর্যন্ত অধরা থেকে যায় সাফল্য। একবার পৌঁছেছিলেন ইন্টারভিউ পর্যন্তও। কিন্তু তাতেও স্বপ্নপূরণ হয়নি। ২০২৪ সালের এপ্রিলে ইউপিএসসির ফলপ্রকাশের পর শেষ হয়ে যায় তাঁর প্রায় এক দশকের লড়াই। তখন তাঁর বয়স ৩০। যে জীবনকে এত দিন ধরে কল্পনা করেছিলেন, তা আর কোনো দিন সত্যি হবে না— এই বাস্তব মেনে নেওয়া সহজ ছিল না শ্রুতির পক্ষে। কিন্তু সেখানেই থেমে থাকেননি তিনি। বরং নতুন করে শুরু করার সাহস দেখিয়েছেন। আজ তাঁর উদ্যোগে মধ্যপ্রদেশের গ্রামীণ এলাকার প্রায় ৯০০ শিশু শিক্ষাগ্রহণের সুযোগ পাচ্ছে। কাজের সুযোগ পেয়েছেন গ্রামের প্রায় ৩০ জন মহিলা।

Advertisement

মধ্যপ্রদেশের বিভিন্ন শহর ঘুরে শৈশব কেটেছে তাঁর। অভিভাবকের বদলির সরকারি চাকরি। সেই চাকরিই তাঁকে স্বপ্ন দেখতে শিখিয়েছিল। ছোটো থেকে পড়াশোনার প্রতি ভালোবাসা শ্রুতির। পরে মধ্যপ্রদেশের থেকে তাঁর পরিবার চ঩লে যায় দিল্লিতে। সেখানে লেডি শ্রীরাম কলেজে শ্রুতি ভরতি হন দর্শনশাস্ত্র নিয়ে। এর পাশাপাশি চলল ইউপিএসসির প্রস্তুতি। বারবার ব্যর্থতার জেরে মানসিকভাবে ভেঙে পড়েন তিনি। নতুন কিছু শুরুর কথা ভাবছিলেন অবশ্য, তবে তাতেও একরাশ সংশয় বাসা বেঁধেছিল মনে। তখনই এক নতুন পথের সামনে তাঁকে দাঁড় করাল জীবন। কলেজের বন্ধু মৃণালিকা রাঠোরে একটি প্রস্তাব দিলেন তাঁকে। ২০১৭ সালে জয়পুরে ‘সশক্তিকরণ ফাউন্ডেশন’ নামে এক প্রতিষ্ঠান শুরু করেছিলেন মৃণালিকা। তবে তিনি আইএএস অফিসার হওয়ার পর সেই প্রতিষ্ঠান বন্ধ হওয়ার মুখে পড়ে। মৃণালিকা শ্রুতিকে প্রতিষ্ঠানটি চালিয়ে নিয়ে যাওয়ার প্রস্তাব দেন। নতুন সুযোগ হাতছাড়া করতে চাননি শ্রুতি। ২০২৪ সালের জুলাই মাসে ওই প্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব কাঁধে নেন তিনি। বন্ধুর অসমাপ্ত কাজ এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার পণ করেন শ্রুতি। বছরের পর বছরের ইউপিএসসি প্রস্তুতি তাঁকে সাহায্য করেছিল প্রতিষ্ঠানের কাজ বুঝতে। নির্ভয়ে কাজ করতে। শ্রুতির বাবা, মাও ফাউন্ডেশনে ডোনেশন দেন। এরপর প্রজেক্ট ‘নিভ’-এর সূচনা। কী এই প্রজেক্ট? মধ্যপ্রদেশের বিভিন্ন সরকারি স্কুল ঘুরে শ্রুতি ও তাঁর সহকর্মীরা বুঝতে পারেন শিক্ষকদের একসঙ্গে একাধিক শ্রেণির দায়িত্ব সামলাতে হয়। ফলে প্রত্যেক শিশুকে আলাদা করে সময় দেওয়া সম্ভব হয় না। স্কুলের এই সমস্যা সমাধানে ২০২৪ সালের অক্টোবর থেকে প্রজেক্টটি শুরু করেন শ্রুতি। এই প্রজেক্টের মাধ্যমে পাঁচজন শিশু ৩০ মিনিটের জন্য একেকটি করে ক্লাস করে। তাদের হাতে দেওয়া হয় একটি ট্যাব। সেখানে থাকা বিশেষ অ্যাপে পড়াশোনা করে তারা। সংশয় থাকলে অ্যাপেই তার জবাব মেলে। এভাবে প্রত্যেক শিশু আলাদা আলাদা করে সময় পায়। ফলে গোড়া থেকে তাদের পড়াশোনা মজবুত হচ্ছে। মধ্যপ্রদেশের গ্রামীণ এলাকার ১০টি সরকারি স্কুলের ৯০০ ছাত্রছাত্রী এভাবে পড়াশোনা করে। এছাড়াও ন’টি আবাসিক হস্টেলেও এই প্রজেক্ট শুরু করেছেন শ্রুতি। ‘প্রজেক্ট নিভ’-এর অন্তর্গত ‘শিক্ষা সাথী’তে কাজ করছেন বহু মহিলা। তাঁদের তথাকথিত ডিগ্রি অবশ্য নেই। তবে প্রশিক্ষণের মাধ্যমে শিক্ষকতার সুযোগ দেওয়া হচ্ছে তাঁদের। 
একসময় শ্রতির নিজের স্বপ্নপূরণ হয়নি। কিন্তু এখন তিনি নিজেই বহু শিশুর ভবিষ্যতের স্বপ্নপূরণের কাণ্ডারি।