Bartaman Logo
৮ আগস্ট, ২০২৬
বর্তমান / চতুষ্পর্ণী

দ্বিতীয় ইনিংসটাই সেরা

চাকরিটা আমি পেয়ে গেছি বেলা শুনছো...।’ উঁহু, টেলিফোনে এমন কোনো গান তিনি গাইতে পারেননি। কারণ, সে সময়ে ফোনের এত ‘প্রাদুর্ভাব’ ছিল না।

দ্বিতীয় ইনিংসটাই সেরা
  • ৮ আগস্ট, ২০২৬ ০৪:০০
Prefer us on Google

ছিলেন অন্য পেশায়। জীবন এনে দাঁড় করিয়েছে আর এক অচেনা চ্যালেঞ্জের সামনে। সাফল্য এসেছে সেখানেও। পেশার বাঁক বদলে নতুন পথেও জয়ী হলেন যাঁরা, তাঁদের নিয়েই শুরু হয়েছে নতুন বিভাগ। এই পর্বে পরান বন্দ্যোপাধ্যায়। ২০০০ সালে চাকরি থেকে অবসর। তারপর ৬০ বছর বয়সে শুরু করলেন দ্বিতীয় ইনিংস, পেশাদার অভিনয়। জীবনে এল নতুন চ্যালেঞ্জ। প্রতি পদে সাফল্যের সঙ্গে তার মোকাবিলা করেছেন।

Advertisement

চাকরিটা আমি পেয়ে গেছি বেলা শুনছো...।’ উঁহু, টেলিফোনে এমন কোনো গান তিনি গাইতে পারেননি। কারণ, সে সময়ে ফোনের এত ‘প্রাদুর্ভাব’ ছিল না। এখন তো প্রেম হয় সোশ্যাল মিডিয়া না হলে ডেটিং অ্যাপে। তখন হত চোখের ভাষায়। সুগন্ধি কাগজে কলমের আঁচড়ে প্রাণ পেত সে প্রেমের ভাষা। সেটা ১৯৬০ সাল। চাকরি পেয়ে প্রেমিকাকে ফোনে গান শোনাতে না পারলে কী হবে, গানটা তিনি খাসা গাইতে পারেন। তাঁর ফোনের কলার টিউন হল শচীন দেব বর্মনের ‘হায় কী যে করি এ মন নিয়া, সে যে প্রণয় হুতাশে ওঠে উথলিয়া...।’ তাঁর মন তখন সত্যিই প্রণয় হুতাশে উথলে উঠছিল। পাড়ার সেরা সুন্দরী তাঁর প্রেমিকা। অবস্থাপন্ন ঘরের মেয়ে। মেয়ের বাবাও জাঁদরেল গোছের। এদিকে তাঁর বাড়িতে ‘নুন আনতে পান্তা ফুরায়’। ফলে দাদার চেষ্টায় পিডব্লিউ রোডসের সরকারি চাকরিটা পেয়ে যেন হাঁফ ছেড়ে বেঁচেছিলেন। ৬০-এ চাকরি, ৬২-তে রেজিস্ট্রি আর ৬৪ সালে জাঁদরেল শ্বশুরের ঘর থেকে নিজের স্ত্রীকে ‘অপহরণ’। ঠিক যেন পৃথ্বীরাজ চৌহান সংযুক্তাকে তুলে আনছেন। তবে এ ক্ষেত্রে ঘোড়া ছিল না, ভাঙা সাইকেল টাইকেল থাকলেও থাকতে পারে। চাকরিটা দরকার ছিল সে জন্যই। তবে সে চাকরি যে খুব ভালোবেসে করেননি তা নিজেই স্বীকার করে নিয়েছেন। চাকরিটা করতেন কৃতজ্ঞতাবশে। কারণ মাস গেলে মাইনে দেয় যে! সংসার চালাতে সেই যৎসামান্য মাইনেটুকুই তো সম্বল। আসলে ছোটো থেকেই তাঁর ভালোবাসা অভিনয়ের প্রতি। মাত্র ১৪ বছর বয়সে নব্বই বছরের এক বৃদ্ধের ভূমিকায় অভিনয় করে সোনার মেডেল পেয়েছিলেন। তারপর থেকে নাটকই তাঁর ধ্যানজ্ঞান। বিজন ভট্টাচার্য, ঋত্বিক ঘটক, উৎপল দত্ত— সব স্টলওয়ার্টের পরিচালনায় অভিনয় করেছেন মঞ্চে। আইপিটিএ করতেন। সেই সূত্রেই জোছন দস্তিদার চিনতেন তাঁকে। এই দেখুন এতক্ষণ ধরে নামটাই বলা হয়নি ভদ্রলোকের! পরান  বন্দ্যোপাধ্যায়। তা সেই জোছনবাবু, যিনি চার্বাক নামে গ্রুপ থিয়েটারের পরিচালক ছিলেন, তিনি ১৯৮৭ সালে দূরদর্শনে শুরু করলেন ‘১৩ পার্বণ’ ধারাবাহিক। যেটি বাংলা ভাষায় প্রথম টেলিভিশন ধারাবাহিক। ১৯৯০ সাল নাগাদ জোছনবাবুই নিয়ে এলেন আর একটি নতুন ধারাবাহিক ‘সেই সময়’। তাতে ডাক পেলেন পরান বন্দ্যোপাধ্যায়। নতুন এক মাধ্যমে কাজ করে দারুণ খুশি তিনি। তারপর ‘জন্মভূমি’। তারপর একে একে অন্যান্য ধারাবাহিকে অভিনয়ের অফার আসতে থাকল। তবে সেসব মোটেই নিয়মিত ছিল না। চাকরির ফাঁকে ফাঁকে নিতান্তই শখের কাজ। তিনি কোনোদিন কারও কাছে গিয়ে অভিনয়ের সুযোগ চাননি, এখনও চান না। পরিচালকরা ঠিক তাঁকে খুঁজে নিয়েছেন। এইভাবে চলতে চলতে ২০০০ সালে অবসর নিলেন চাকরি থেকে। তারপর শুরু হল তাঁর দ্বিতীয় ইনিংস— পেশাদার অভিনেতার জীবন। 
৬০ বছর বয়সে শুরু করা দ্বিতীয় ইনিংসেই কিন্তু তিনি পরিচিতি পেলেন। লোকে জানতে পারল পরান বন্দ্যোপাধ্যায় নামে এক অভিনেতার কথা। দ্বিতীয় ইনিংসের চতুর্থ ছবিতেই ছক্কা! সেই ছবির নাম ‘বোম্বাইয়ের বোম্বেটে’। সন্দীপ রায়ের পরিচালনায় এই ছবিতে বলিউডের বাঙালি পরিচালক পুলক ঘোষালের ভূমিকায় অভিনয় করেছিলেন তিনি। ব্যস! ছুটতে শুরু করল তাঁর অশ্বমেধের ঘোড়া। থামায় কে! সন্দীপ রায়ের সব ছবিতেই কোনো না কোনো ভূমিকা তাঁর বাঁধা। পাশাপাশি অপর্ণা সেন, বুদ্ধদেব দাশগুপ্ত, কৌশিক গঙ্গোপাধ্যায়, নন্দিতা-শিবপ্রসাদ থেকে শুরু করে দেব, সবার ছবিতেই তিনি। এর মধ্যে কৌশিক গঙ্গোপাধ্যায়ের ‘সিনেমাওয়ালা’ ছবিতে অভিনয় করে ভীষণ তৃপ্তি পেয়েছিলেন বাবু। ওদিকে অনীক দত্তের ছবি ‘ভূতের ভবিষ্যৎ’, ‘ভবিষ্যতের ভূত’, ‘অপরাজিত’-তেও তিনি। দেবের প্রযোজনায় ‘টনিক’, ‘কিশমিশ’, ‘টেক্কা’ ছবিতেও দর্শকদের প্রভূত প্রশংসা কুড়িয়েছেন। 
কোন পেশাটা ভালো লাগল? প্রশ্নের জবাবে একমুহূর্তও না ভেবে তাঁর উত্তর— ‘অভিনয়। ওটাই তো আমার প্রথম প্রেম। চাকরিটা তো ভালোবেসে করতে পারিনি। ঢুকেই এমন সব অভিজ্ঞতা হয়েছিল, যা মোটেই কাঙ্ক্ষিত নয়। সেই দুরাচারের স্রোতে তো গা ভাসাতে পারিনি। সবাই যা করত, আমি তা করতে পারিনি। তাই চাকরিটা করতাম স্রেফ কৃতজ্ঞতাবশত। মাসের শেষে সংসার চালানোর মতো একটা বেতন পেতাম। তবে অভিনয়কে যখন থেকে পেশা করে নিলেন, তখনও কিন্তু কাজের খোঁজে দোরে দোরে ঘোরেননি তিনি। পরিচালকরাই তাঁর শরণাপন্ন হয়েছেন। বলিউডেও কাজ করেছেন। এখনও ডাক আসে বলিউড থেকে। কিন্তু সেখানে গিয়ে শ্যুটিং করার পক্ষপাতী নন ৮৬ বছরের এই যুবক। 
যাঁর জন্য চাকরি করতে বাধ্য হয়েছিলেন, সেই নীলিমা মুখোপাধ্যায়, মানে তাঁর স্ত্রী গত হয়েছেন ২০১৯ সালে। ছেলেমেয়েরা প্রতিষ্ঠিত। এখন তিনি শুধু মনের খোরাকের জন্য কাজ করেন। এই ‘বন্ধু’ শতায়ু হন, সেই কামনা তাঁর সমস্ত অনুরাগীর। 
স্বস্তিনাথ শাস্ত্রী

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ