কীভাবে যাবেন: ট্রেনে হাসিমারা পৌঁছে ৩৫ কিলোমিটার দূরের চিলাপাতায় গাড়িতে যাওয়া যায়। বিমানে বাগডোগরা পৌঁছেও গাড়িতে যেতে পারেন চিলাপাতা। সেক্ষেত্রে পাড়ি দিতে হবে ১৫০ কিলোমিটার পথ।
কীভাবে যাবেন: ট্রেনে হাসিমারা পৌঁছে ৩৫ কিলোমিটার দূরের চিলাপাতায় গাড়িতে যাওয়া যায়। বিমানে বাগডোগরা পৌঁছেও গাড়িতে যেতে পারেন চিলাপাতা। সেক্ষেত্রে পাড়ি দিতে হবে ১৫০ কিলোমিটার পথ।
হাসিমারা রেল স্টেশনে যখন কাঞ্চনকন্যা এক্সপ্রেস এসে থামল তখন দুপুর গড়িয়ে গিয়েছে ঘড়ির কাঁটা বলছে দুটো বেজে দশ মিনিট। হাসিমারার আগের স্টেশন মাদারিহাট। হাসিমারা আর মাদারিহাটের মাঝের পথটা পুরোটাই এলিফ্যান্ট করিডোর। মাঝে মাঝেই সেখান দিয়ে বুনো হাতির দল পার হয়। আর এই কারণে এই পুরো রাস্তাতেই গাড়ির গতিবেগ অনেকটাই অল্প রাখতে হয়। কিছুক্ষণ আগে পর্যন্ত সেখানে হাতি দাঁড়িয়েছিল। সে কারণেই হাসিমারায় ট্রেন পৌঁছাতে অনেকটাই দেরি হয়ে গেল। আমার এবারের গন্তব্য হাসিমারা থেকে ৩৫ কিলোমিটার দূরে চিলাপাতা অভয়ারণ্য। বাইরে বেরিয়ে দেখি কয়েকটা অটো আর গাড়ি দাঁড়িয়ে আছে। কিন্তু কেউই চিলাপাতা যেতে চাইছে না। অনেক বুঝেশুনে একটা ছোট্ট সাদা গাড়ি জুটল কপালে। অরণ্যের বুক চিরে শুরু হল আমার যাত্রা।
ভারতের বহু জঙ্গল ভ্রমণ করেছি। তার এক একটার এক একরকম রূপ। কোনোটা রেইন ফরেস্ট। কোনোটা ট্রপিকাল। কোনোটা আবার ম্যানগ্রোভ ফরেস্ট। নিজে প্রাণীবিদ্যা নিয়ে পড়াশোনা করেছি। ছোটো থেকে বহু পাহাড় জঙ্গল নদীর সঙ্গে পরিচিত হওয়ায় আমার বরাবর জঙ্গলের প্রতি টান। আমার বাবা চা বাগানে কর্মরত ছিলেন। তাই ছোটোবেলার দীর্ঘ সময় আমার কেটেছে উত্তরবঙ্গের চা বাগানে এবং জঙ্গলে। তাই উত্তরবঙ্গের চা বাগান, জঙ্গল, নদী, পাহাড় এগুলো আমার কাছে খুবই নস্টালজিক। চারপাশে সবুজ জঙ্গল তার আদিম রূপ, বাতাসে মাতাল করা বনফুলের গন্ধ অথবা এক পশলা বৃষ্টিতে গাছের পাতার কিশোরী মেয়ের মতো প্রথম সিক্ত দৃষ্টির প্রতি আমার ভালোবাসা অফুরান। আবার প্রচণ্ড দাবদাহে অরণ্যে হুতাশন কিংবা নিস্তব্ধ নিস্তরঙ্গ অরণ্যে ঝরে পড়া পাতার শব্দ দিনের পর দিন আমায় জঙ্গলকে পাগলের মতো ভালোবাসতে শিখিয়েছে।
হাসিমারা থেকে চিলাপাতা জঙ্গল রিসর্ট পৌঁছাতে এক ঘণ্টা ১৫ মিনিট সময় লেগে গেল। পথে একঝাঁক ময়ূরের সঙ্গে দেখা হয়ে মন ভালো হয়ে গেল। এই জঙ্গল ঘিরেই আছে নল রাজাদের কাহিনি। রিসর্টে পৌঁছাতেই পেলাম আন্তরিক আতিথেয়তা। ছোটো ছোটো কাঠের ঘর আর সঙ্গে লাগোয়া বাথরুম। তারই একটাতে আমার থাকার জায়গা হল। ঠিক করলাম পরের দিন বিকেলে সাফারি করব। আজ ঘুরে দেখি সামনেটা। অবশ্য বেশি দূরে যাওয়া বারণ। যখন তখন সামনের ঝোরায় বুনো হাতির দল জল খেতে চলে আসে। জঙ্গলের সামনে চা বাগান। সেখান থেকে আরেকটু এগলেই রাভা সম্প্রদায় অর্থাৎ এখানকার প্রাচীন আদিবাসী দল রাভাদের গ্রাম। শহুরে ছোঁয়া কিছুটা লাগলেও এরা জঙ্গলের সন্তান। হাজার দারিদ্র্যের মধ্যেও এরা জঙ্গলকে আগলে রাখে নিজের আত্মজের মতো।
সন্ধ্যা নেমে আসছে অরণ্যের বুকে। মাতাল করা জ্যোৎস্নায় স্নান করছে গাছগাছালি। সেই রুপোলি আভায় আমি ট্রি হাউসে কফির কাপ হাতে মুহূর্তে যেন হারিয়ে গেলাম। রিসর্টের সামনের ধানখেতের মধ্যে গাছগুলোতে বসেছে অজস্র জোনাকির দল। তারা যেন তৈরি করেছে আলোর গাছ। বনের মায়াবী রং, নদীর কলতান, দূরের ধূসর পাহাড়ের মৌনতার জ্যোৎস্না সব মিলেমিশে একাকার হয়ে জন্ম নিয়েছিল এক অন্তহীন মুহূর্ত। যে মুহূর্তে দাঁড়িয়ে আমার মনে হচ্ছিল আমিও যদি ওই রাভা শিশুদের মতো জঙ্গলের সন্তান হতাম! আমিও যদি জ্যোৎস্না রাতে বুনো হাতির পালের থেকে খেতের ফসল বাঁচাতে সারারাত জেগে পাহারা দিতাম! আমিও যদি শহরের এই সাদাকালো জীবন ছেড়ে ওদের মতো নদীর গন্ধ গায়ে মাখতে পারতাম!
ডিনার করবেন তো? হুঁশ ফিরল রিসর্টের কর্মচারীর ডাকে। দেখি নীচে হ্যারিকেন হাতে দাঁড়িয়ে আছেন তিনি। মিষ্টি হেসে জানালেন, রাতে বন মোরগের ঝোল আর ভাত। সঙ্গে ঘি, বেগুন ভাজা। চলবে তো? এই নিঝুম রাতে জ্যোৎস্না বনে অসাধারণ মেনুর প্রস্তাবে পেটে ছুঁচোদের ডন মারা যে ক্রমশ বাড়বে তা বলার অপেক্ষা রাখে না। খাওয়া শেষ হল দ্রুত। এবার ঘুমের পালা...।
রাত তখন কটা হবে জানি না দরজায় খট খট শব্দ। ঘুম চোখে শুনতে পেলাম, ওই কর্মচারী ডাকছেন। এত রাতে ডাকছেন কেন? কোনো বিপদ হল না তো? ঘড়িতে রাত ২টো বেজে ৫০ মিনিট। একটু ভয়ে ভয়ে দরজা খুললাম। দেখি হ্যারিকেন হাতে দাঁড়িয়ে ওই কর্মী। চোখে কেমন রহস্য নিয়ে মুচকি হেসে বললেন, ধানখেতে গণেশ বাবারা (বুনো হাতির দল) এসেছে, যাবেন নাকি দেখতে?
মস্তিষ্কের কুঠুরিতে বয়ে গেল বিদ্যুতের তরঙ্গ। সারা শরীরে প্রবাহিত হল অ্যাড্রিনালিন। কেমন যেন আচ্ছন্নের মতো লাগছিল। একটা মাতাল করার রিফ্লেক্সে ক্যামেরার
ব্যাগ নিতে যাচ্ছিলাম। চোখের ইশারায় বারণ করলেন তিনি। কারণ বুনো হাতিদের কাছে ক্যামেরার ফ্ল্যাশ তীব্র স্টিমুলেশনের কাজ করে। যখন তখন তারা কাউন্টার অ্যাটাক করতে পারে। হ্যারিকেনের আলোয় ওঁর দেখানো পথে ঘরের হাওয়াই চটি পরেই ছুটলাম...।
এক অপার্থিব দৃশ্যের মুখোমুখি হলাম আচমকা। ধান জমি জুড়ে পাহাড়ের মতো দামাল হাতির দল। কম করে ৪০-৫০ টা তো হবেই। তাদের ঘিরে একঝাঁক রাভা। জমির ফসল বাঁচাতে তারা লড়ছে। জ্যোৎস্নায় ভেসে যাওয়া প্রান্তরে মানুষ পশুর আদিম লড়াই যেন। বাতাসে ভেসে আসছে নাম না জানা ফুলের মাতাল গন্ধ...। চোখ বুজে অস্ফুটে নিজের অজান্তেই বললাম, ‘অরণ্যের দিনরাত্রি’।
পরের দিন সাফারি। প্রথমে গেলাম চিলাপাতা অভয়ারণ্যর প্রবেশ দ্বারে। জঙ্গলে প্রবেশ করতে চাইলে মানতে হবে অরণ্যের বিধান। এমন রঙের জামা পরা উচিত যাতে জঙ্গলের রঙের সঙ্গে নিজেকে মিশিয়ে নেওয়া যায়। বিজ্ঞানের ভাষায় একে বলে ক্যামোফ্লেজ। কোনোরকম পারফিউম ব্যবহার করা যায় না। ধূমপান নিষিদ্ধ। উৎকট গন্ধ জাতীয় কোনো খাবার নিয়ে জঙ্গলে প্রবেশ না করাই ভালো। তাতে আকৃষ্ট হয়ে বন্য জন্তুর আগমন হতে পারে।
যতটা সম্ভব নিঃশব্দে বিচরণ করাই শ্রেয়। কারণ মনে রাখবেন আপনি কাউকে দেখতে না পেলেও হাজার জোড়া চোখ আপনার উপর নজর রাখছে। অরণ্যকে ভালোবেসে প্রবেশ করলে বুঝতে পারবেন নিস্তব্ধ অরণ্যের এই রংবেরং রূপের কাছে পৃথিবীর সব রূপ এবং রং তুচ্ছ।
সাফারিতে গিয়ে বন্য জন্তুর দেখা পাওয়া পুরোটাই ভাগ্যের বিষয়। তাদের দেখা না পেলেও অরণ্য আপনাকে ভরিয়ে দেবে। এক একজায়গায় সবুজের নকশা এক একরকম। যদিও এ যাত্রায় আমার ভাগ্য সহায় ছিল। দুটো বুনো বাইসন হঠাৎই জিপের সামনে এসে পড়েছিল। সেই বিস্ময় কাটার খানিক পরে একপাল হাতি দর্শন দিল। এছাড়াও তোর্সা নদীর চরে শাবকসহ মা গন্ডারের নিঃশব্দ বিচরণ যেন অজানা কোনো গল্প শোনাল। অসংখ্য প্রজাপতি, পাখি আর নাম না যেন বুনো ফুল চিলাপাতার মাথার মুকুট। রিসর্টে ফিরতে ফিরতে সেকথাই ভাবছিলাম। দূরে রাভাদের গ্রামে পরব শুরু হয়েছে। বাতাসে ভেসে আসছে মাদলের শব্দ। রাত বাড়ছে, জঙ্গল যেন আরও রহস্যময় হয়ে উঠছে।
পরের দিন সকালটা আবার একেবারে অন্যরকম। জঙ্গল তখন যেন কিশোরী কন্যার প্রথম শাড়ি পরার মতন স্নিগ্ধ। ভালোবাসলে জঙ্গল নিজেকে উজাড় করে দেবে। ভয় নিয়ে সংশয় নিয়ে প্রকৃতিকে দেখলে তার বেশিরভাগটাই জানা বাকি থেকে যায়। আমার এবার জঙ্গলকে বিদায় জানানোর পালা। পাড়ি দেব পাহাড়ে। মনটা একটু হলেও বিষণ্ণ। জঙ্গলের কেমন যেন একটা মাতাল করা টান আছে। যেই টানে ঘরে ফেরার ইচ্ছাটা বেবাক হারিয়ে যায়। মনে হয় থেকে যাই আজীবনের জন্য...।
হোমাগ্নি ঘোষ