‘পূজা-বিজ্ঞান’ শব্দটি কোন বৈজ্ঞানিক পরিভাষা হিসাবে এখানে ব্যবহার করা হয়নি, বা বৈজ্ঞানিক কোন গূঢ় তত্ত্বের বিচার বা ব্যাখ্যাও এই আলোচনার বিষয় নয়। পূজা একটি বিজ্ঞানসম্মত সাধনা। বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে বিজ্ঞানসম্মত বিচার-বিশ্লেষণী পদ্ধতিতে দেখলে বোঝা যাবে যে তার প্রতিটি স্তরই যুক্তিপূর্ণ ও সুপরিকল্পিতভাবে বিন্যস্ত। শাস্ত্রের নির্দেশানুযায়ী যথাযথভাবে সম্পন্ন হলে পূজার দ্বারা সাধক বাঞ্ছিত ফললাভ করে জীবনের চরম লক্ষ্যে পৌঁছুতে পারেন—এটি বোঝাবার জন্যই এখানে ‘পূজা-বিজ্ঞান’ শব্দটির ব্যবহার।
স্বামী সারদানন্দজীর শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণলীলাপ্রসঙ্গ-গ্রন্থে পূজা-বিজ্ঞানের মূল তত্ত্বটি অল্প কয়েকটি কথায় অতি সুন্দর ও পরিষ্কারভাবে ব্যক্ত হয়েছে। কথাগুলি সূত্রাকারে হলেও এত সুস্পষ্ট যে, কোনরূপ ব্যাখ্যার অপেক্ষা রাখে না। সেখানে আছে, “তুমি কোনও দেবতার পূজা করিতে বসিলে অগ্রেই কুলকূণ্ডলিনীকে মস্তকস্থ সহস্রারে উঠাইয়া ঈশ্বরের সহিত অদ্বৈতভাবে অবস্থানের চিন্তা তোমায় করিতে হইবে; পরে পুনরায় তুমি তাঁহা হইতে ভিন্ন হইয়া জীবভাব ধারণ করিলে এবং ঈশ্বরজ্যোতিঃ ঘনীভূত হইয়া তোমার পূজ্য দেবতারূপে প্রকাশিত হইলেন এবং তুমি তাঁহাকে তোমার ভিতর হইতে বাহিরে আনিয়া পূজা করিতে বসিলে—ইহাই চিন্তা করিতে হইবে।” কুলার্ণবতন্ত্রে পূজার একটি সংজ্ঞায় বলা হইয়েছে, সেই ক্রিয়াকেই পূজা বলে, যে ক্রিয়া পূর্বজন্মকৃত কর্মপ্রবাহ শান্ত করে, জন্মমৃত্যু নিবারিত করে এবং সম্পূর্ণ ফলদান করে। সম্পূর্ণ ফলদান অর্থে বাঞ্ছিতফলদান—ভগবানের কাছে ভক্তের, উপাস্যের পূর্ণ আত্মসমর্পণ। পূজ্যের মধ্যে পূজকের আত্মলয়েই পূজার সার্থকতা, পূজার পরিসমাপ্তি। এই প্রসঙ্গে স্মরণ করতে বলি শ্রীরামকৃষ্ণের সাধন-যজ্ঞের সমাপ্তি-অধ্যায়ে অনুষ্ঠিত তাঁর ষোড়শী-পূজার ঘটনা। তাঁর জীবনী-পাঠকরা সকলেই জানেন, শ্রীরামকৃষ্ণ তাঁর সুদীর্ঘ দ্বাদশবর্ষব্যাপী বিচিত্র সাধনার পরিসমাপ্তি ঘটিয়েছিলেন শ্রীশ্রীমা সারদামণিদেবীর দেহাবলম্বনে আদ্যাশক্তিকে ষোড়শীরূপে পূজা করে। তাঁর সেই বিচিত্র পূজার পরিসমাপ্তির বর্ণনায় শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণলীলাপ্রসঙ্গে আছে, “সমাধিস্থ পূজক সমাধিস্থা দেবীর সহিত আত্মস্বরূপে পূর্ণভাবে মিলিত ও একীভূত হইলেন।” এখানেই পূজা-বিজ্ঞানের সার্থকতা। ঠাকুরের এই সাধনা পূজা-বিজ্ঞানের নবসমর্থন ও জয়যাত্রার শুভ ইঙ্গিত, সন্দেহ নাই।
পূজার অপর একটি সংজ্ঞাতে পূজার লক্ষ্যের কথা সুস্পষ্ট। সেখানে আছে, সেবক ও ঈশ্বরের ঐক্যই পূজা। উপাস্য ও উপাসকের এই ঐক্যবোধের চরম পরিণতিই আত্মস্বরূপের অবগতি বা ব্রহ্মোপলব্ধি। আর, পূজা সেই লক্ষ্যে উপনীত হওয়ার অন্যতম সোপান।
স্বামী প্রমেয়ানন্দের ‘পূজা-বিজ্ঞান’ থেকে