দায়িত্ব মানুষের নয়, সরকারের
  • ১০ অক্টোবর, ২০২৬ ০৪:০০
Prefer us on Google

মার্কিন ডলারের দৌড়ে কেবলই হাঁপিয়ে পড়ছে টাকা (ভারতীয় মুদ্রা রুপি)! এই ঘটনা নিছক মুদ্রার বাজারের পরিসংখ্যান বদলে যাওয়া নয়, ভারতীয় অর্থনীতির স্বাস্থ্য সম্পর্কেও উদ্বেগজনক ইঙ্গিত বহন করে। গত ডিসেম্বরে যে ডলারের বিনিময় মূল্য ছিল ৮৯ টাকা। এমাসের প্রথম সপ্তাহে তা পৌঁছে গিয়েছে প্রায় ৯৭ টাকায়! মাত্র কয়েকমাস ব্যবধানের এই কাণ্ডকে ভারতীয় মুদ্রার মহাপতন বললে অতিরঞ্জন হয় না। স্বাভাবিক আশঙ্কা, ডলার-রুপির বিনিময় হার শতক ছুঁয়ে ফেলল বলে! আন্তর্জাতিক আর্থিক সমীক্ষক ও রেটিং সংস্থাগুলির পূর্বাভাস তেমনই। আরও খারাপ খবর এই যে, এশিয়ার গুরুত্বপূর্ণ অর্থনীতিগুলির মধ্যে গত একবছরে ভারতীয় মুদ্রার পতনই সর্বাধিক। অথচ চীন, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া প্রভৃতির মুদ্রা ঘুরে দাঁড়াচ্ছে। বাংলাদেশের টাকার অবস্থাও ভারতের তুলনায় স্থিতিশীল। ২০২৬ অর্থবর্ষের সূচনায়, পূর্ববর্তী একবছরে বাংলাদেশি টাকার পতন যেখানে দেড় শতাংশের আশপাশে, সেখানে ভারতীয় মুদ্রার অবমূল্যায়ন প্রায় ৫ শতাংশ। ভারত ও বাংলাদেশের অর্থনীতিকে একাসনে না বসিয়েও এই তুল্যমূল্য বিচার আজ প্রাসঙ্গিক। মুদ্রার পতন রুখে দেওয়ার প্রশ্নে বাংলাদেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংক কিন্তু রিজার্ভ ব্যাংককে (আরবিআই) টক্করই দিচ্ছে। বাংলাদেশ প্রমাণ দিয়েছে যে, অর্থনীতির আকার বড়ো মানেই মুদ্রার শক্তি বেশি নয়। বরং অর্থনীতির প্রকৃত শক্তি বোঝা যায় বৈদেশিক বাণিজ্যের ভারসাম্য, রপ্তানির সক্ষমতা, বিদেশি পুঁজির আস্থা এবং মুদ্রাবাজারের স্থিতিশীলতায়। সোজা কথায়, হাজার লম্বা চওড়া দাবি পেশ করে ভারতীয় অর্থনীতির এই ক্ষত সারানো কঠিন।

Advertisement

টাকার পতনের অভিঘাত অবশ্য কেবল আন্তর্জাতিক মুদ্রাবাজারের পর্দায় আটকে থাকে না, তার বিল এসে পৌঁছায় জনগণের হেঁশেলে, শিক্ষা ও চিকিৎসার খরচে এবং সাংসারিক হিসাবের খাতায়। ডলার দামি হলে জ্বালানি তেল, যন্ত্রপাতি, ইলেকট্রনিক পণ্য, রাসায়নিক উপাদান প্রভৃতির আমদানি খরচ বৃদ্ধি পায়। এই বিপুল বোঝা দিনের শেষে ক্রেতাকেই নাজেহাল করে। কেননা, অগ্নিমূল্য হয়ে যায় প্রতিটি সামগ্রী এবং পরিষেবা। মানুষ বাধ্য হয় একাধিক উপভোগ এবং বিনোদনে দাঁড়ি টানতে, নিদেনপক্ষে সেসব কমিয়ে ফেলতে। অর্থাৎ নাগরিকের জীবনযাত্রার মান নেমে যায়। এর বিরূপ প্রভাব পড়ে শিক্ষায়, স্বাস্থ্যে, শিল্প-বাণিজ্যে, উৎপাদনে, কর্মসংস্থানে, সর্বোপরি আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থায়। আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে ব্যাকফুটে চলে যায় দেশ। দুর্বল টাকা রপ্তানি ক্ষেত্রে এবং বিদেশি পর্যটক কেন্দ্রিক শিল্পে কিছু সুবিধা দিলেও, বাড়তে থাকে বাণিজ্য ঘাটতি। অথচ একটি সফল অর্থনীতির সর্বক্ষণের চ্যালেঞ্জ থাকে বাণিজ্য ঘাটতি কমিয়ে বৈদেশিক বাণিজ্যে একটি সম্মানজনক আসন অর্জন করা। অতএব, মুদ্রার অবমূল্যায়নকে মহিমান্বিত করার কোনো সুযোগ নেই। আবার প্রতিটি পতনকে অর্থনৈতিক বিপর্যয়ের একমাত্র কারণ বলাটাও অতিসরলীকরণ। এই পতন যেন দীর্ঘস্থায়ী নাহয়, নিশ্চিত করতে হবে এটাই। নাহলে আমদানি খরচ, মুদ্রাস্ফীতি, মূল্যবৃদ্ধির চাপ এবং বৈদেশিক মুদ্রার জোগানের দিকটি আরও জটিল আকার নিতে পারে। বাজারে হস্তক্ষেপ করে টাকার পতন রোখার চেষ্টা করেছে আরবিআই। কিন্তু বিনিময়মূল্য ধরে রাখতে নির্বিচারে ডলার বিক্রয় মুদ্রার ভাণ্ডার রুগ্ন করে দিতে পারে। আবার পরিস্থিতি পুরোটাই বাজারের হাতে ছেড়ে দিলে অস্থিরতা আরও বাড়ার আশঙ্কা থাকে। সোজা কথায়, ভারসাম্য রক্ষার খেলায় জিততে হবে আরবিআইকে।
সরকারের অর্থনৈতিক দর্শন প্রশ্নের মুখে পড়েছে এখানেই। টাকার দুর্বলতার দায় কার? সরকার কি তার দায়িত্ব অস্বীকার করতে পারে? তাহলে লেজেগোবরে অবস্থা সামলাবার দায় শুধু নাগরিককেই নিতে হবে কেন? প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির ডাকে সাড়া দিয়ে আমরা বিদেশ ভ্রমণে লাগাম টানব, প্রয়োজন মতো সোনার গয়না কিনব না। অর্থাৎ সরকারের আবদার, বৈদেশিক মুদ্রার খরচে আমরা যেন বেশি করে লাগাম টানি। কিন্তু জরুরি চিকিৎসা, উচ্চশিক্ষা এবং প্রয়োজনে বিদেশ ভ্রমণের কী হবে? নাগরিকের এই প্রয়োজনগুলি অনির্দিষ্টকাল অপেক্ষা করতে পারে না। রাষ্ট্রের কাজ নাগরিককে অপরাধবোধে জর্জরিত করা নয়, বরং এমন অর্থনৈতিক পরিবেশ তৈরি করা, যাতে দেশের উৎপাদন বৃদ্ধি পায়, মজবুত হয় রপ্তানি বাণিজ্য, লঘু হয় আমদানিনির্ভরতা। একইসঙ্গে বিদেশি লগ্নিকারীদের আস্থা বৃদ্ধিও জরুরি। এর জন্য প্রয়োজন উপযুক্ত শিল্পনীতি, কর্মসংস্থান বৃদ্ধির সহায়ক লগ্নি, গবেষণা ও প্রযুক্তি ক্ষেত্রে উন্নতি এবং বাণিজ্য ঘাটতি হ্রাসের জন্য পর্যাপ্ত পদক্ষেপ। রুপির পতন বিনিময়মূল্যের অবনমনের চেয়ে নীতির সাফল্য ও ব্যর্থতার দিকটি অধিক নির্দেশ করে। বিষয়টি অগ্রাধিকারেরও পরীক্ষা বটে। এই পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে হলে স্লোগান ছেড়ে দায় স্বীকার করে দায়িত্বপালনেই মনোনিবেশ করুক মোদি সরকার।