Bartaman Logo
১০ জুন, ২০২৬
বর্তমান / সম্পাদকীয়

শুনানি পর্বেই আসল ‘খেলা’

খসড়া তালিকা অনুযায়ী এরাজ্যে ২০২৫ সালের নিরিখে প্রায় ৫৮ লক্ষ ২০ হাজার নাম বাদ গিয়েছে। তবে, এরা কেউ রোহিঙ্গা বা বাংলাদেশি নয়

শুনানি পর্বেই আসল ‘খেলা’
  • ২০ ডিসেম্বর, ২০২৫ ০৪:০০
Prefer us on Google

তন্ময় মল্লিক: খসড়া তালিকা অনুযায়ী এরাজ্যে ২০২৫ সালের নিরিখে প্রায় ৫৮ লক্ষ ২০ হাজার নাম বাদ গিয়েছে। তবে, এরা কেউ রোহিঙ্গা বা বাংলাদেশি নয়। বাদ গিয়েছে মূলত মৃত, স্থানান্তরিত এবং দু’জায়গায় নাম আছে এমন ভোটারের নাম। সংখ্যাটা অপ্রত্যাশিত নয়। কারণ এসআইআর-এর সময় ‘ডোর টু ডোর’ অনুসন্ধান হয়। তাতে প্রতিবারই লক্ষ লক্ষ নাম বাদ যায়। এবারও তেমনটাই হয়েছে। বিয়ের জন্য ও কর্মসূত্রে অন্যত্র যাওয়া ভোটাররা নতুন করে নাম তোলার সুযোগ পাবেন। এছাড়াও জীবিতকে ‘মৃত’ দেখানো ভোটাররাও তালিকাভুক্ত হবেন। 

Advertisement

ফলে সংখ্যার কিছুটা হেরফের হবে। তবে, এই 
সংখ্যা ধরে হিসেব কষলে এসআইআর নিয়ে বঙ্গ বিজেপির বিপুল উৎসাহের কারণ বোঝা যাবে না। রহস্য লুকিয়ে আছে শুনানিতে। অনেকে বলছেন, আসল ‘খেলা’ হবে শুনানির সময়। শুনানি পর্বের লড়াইটা দাঁতে দাঁত চেপে করতে পারলেই বিজেপির জন্য ব্যুমেরাং হবে এসআইআর। 
কতজন শুনানিতে ডাক পাবেন, তা কমিশন স্পষ্ট করেনি। তবে যা খবর, শুনানিতে প্রায় ১কোটি ৬০লক্ষ ভোটার ডাক পেতে পারেন। কমিশনের চোখে এঁরা ‘সন্দেহজনক’। কী কারণে তাঁদের ডাকা হচ্ছে? কমিশন সূত্রের খবর, এর মধ্যে প্রায় ৩০ লক্ষ ‘নো ম্যাপিং’ ভোটার রয়েছেন। অর্থাৎ ২০০২ সালের ভোটার তালিকায় এঁদের বা পরিবারের কারও নাম ছিল না। বাংলাদেশি অনুপ্রবেশকারীদের নাম বাদ দেওয়াটাই উদ্দেশ্য হলে এই ৩০ লক্ষ ভোটারকে ডাকলেই ঝামেলা মিটে যেত। কারণ এঁদের বাবা বা পরিবারের সদস্যরা ২৩ বছর আগে এই রাজ্যের ভোটার ছিলেন না। শুনানি পর্বে যাঁরা কমিশন নির্দিষ্ট ১১টি প্রমাণের একটি দাখিল করতে পারবেন, তাঁদের নাম তালিকায় উঠবে। যাঁরা পারবেন না তাঁরা ‘ডি ভোটার’ হয়ে যাবেন। তাতে ‘কাঁকর’ বাছার কাজটা অনেক সহজ হত।  
এখন প্রশ্ন হচ্ছে, বাংলাদেশি বা তথাকথিত রোহিঙ্গা বাছাইয়ের যে কাজটা অতি সহজে সেরে ফেলা যেত, সেটাকে এত জটিল করা হচ্ছে কেন? ৩০ লক্ষ ‘নো ম্যাপিং’ ভোটারের বদলে প্রায় ১কোটি ৬০ লক্ষকে কেন ডাকার চিন্তা করছে কমিশন? সূত্রের খবর, বাকি ১কোটি ৩০ লক্ষ ভোটারের কারও বাবা-মায়ের বদলের রয়েছে দাদু, ঠাকুমা, দিদিমার নাম। কারও বাবার সঙ্গে সন্তানের বয়সের পার্থক্য ১৫ বছরের কম। কিছু ক্ষেত্রে ভোটারের পদবির সঙ্গে অভিভাবকের পদবির বানান মিলছে না। বানান বিভ্রাটের ঘটনা বেশি ঘটছে সংখ্যালঘু এলাকায়। 
বাংলায় ‘সন্দেহজনক’ ভোটারের সংখ্যাটা বাড়ানোর জন্য রীতিমতো গবেষণা চলছে। তারজন্য বিভিন্ন সময় নতুন নতুন নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। প্রাথমিক পর্যায়ে বাবার বয়সের সঙ্গে সন্তানের ১৫ বছরের কম পার্থক্য আছে, এমন ভোটারদের চিহ্নিত করার নির্দেশ ছিল না। কিন্তু, ইনিউমারেশন ফর্ম বিলির পরও যখন দেখা গেল, ‘সন্দেহজনক’ ভোটারের সংখ্যাটা টার্গেটের ধারেকাছে যাচ্ছে না তখন বঙ্গ বিজেপির নেতাদের মাথায় আকাশ ভেঙে পড়ে। তারা বিলএলওদের দিকে আঙুল তুলে কমিশনের কাছে একের পর এক দাবি জানাল। তারপরই জারি হল নানান রকমের তথ্য জোগাড়ের ফরমান। সন্তান ও বাবার বয়সের ফারাকের বিষয়টি তখনই যুক্ত করা হয়। পরিবর্তন করতে হল বিএলও অ্যাপের। এমনিতেই অল্প সময়ের মধ্যে এসআইআর করতে হচ্ছে। তার উপর ঘনঘন নির্দেশিকা পরিবর্তন। জটিল হল বিএলওদের কাজ।
বিএলওদের একাংশের বক্তব্য, সন্তানের সঙ্গে বাবা-মায়ের বয়সের ফারাকের বিষয়টি ভোটার তালিকা সংশোধনের সঙ্গে কোনওভাবেই সরাসরি যুক্ত নয়। কারণ এসআইআরের উদ্দেশ্য নির্ভুল ভোটার তালিকা তৈরি। নাবালক বা নাবালিকা অবস্থায় বিয়ে হয়েছিল কি না, সেটা খতিয়ে দেখা নয়। যদিও কমিশনের ব্যাখ্যা, নকল বাবা সাজিয়ে ভোটার তালিকায় নাম তোলা ঠেকাতেই বয়সের ফারাকটা দেখা হচ্ছে। কিন্তু কমিশনের ব্যাখ্যায় সন্তুষ্ট হননি অধিকাংশ বিএলও। তবুও নির্দেশ তাঁরা মানতে বাধ্য। 
অনেকে বলছেন, ‘সন্দেহজনক’ ভোটারের সংখ্যা বৃদ্ধি করাই লক্ষ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে। তারজন্য এমন সব শর্ত দেওয়া হচ্ছে, যা অতীতে কখনও হয়নি। উল্লেখযোগ্য বিষয়, এবার এসআইআর পর্বে অধিকাংশ নির্দেশ আসছে মৌখিকভাবে। লিখিতভাবে না দিয়ে নির্বাচনের কাজে যুক্ত আধিকারিকদের ফোনে জানিয়ে দেওয়া হচ্ছে। ঘনঘন সিদ্ধান্ত পরিবর্তনে বাড়ছে বিভ্রান্তি। শোনা যাচ্ছে, দিল্লি থেকে আসা বিশেষ পর্যবেক্ষকদের কেউ কেউ সেই নির্দেশ দিচ্ছেন। সেটা বাস্তবে কার্যকর করা সম্ভব কি না, কতটা সময়সাপেক্ষ, সেটা ভেবে দেখছেন না।
একদিকে অল্প সময়ের মধ্যে ফর্ম বিলি এবং সংগ্রহ করে তা অ্যাপে আপলোড করতে হয়েছে। তার উপর নিত্যনতুন ফরমান মেনে তথ্য জোগাড় করতে গিয়ে নাজেহাল হচ্ছেন বিএলওরা। অনেকে কাজের চাপে অসুস্থ হয়েছেন। এমনকি, চাপ সহ্য করতে না পেরে আত্মহত্যাও করেছেন। চাপের মধ্যে কাজ করতে গিয়ে অনেকেই ভোটারের নামের ও পদবির বানান সহ কিছু ভুল করেছেন। কেউ কেউ জীবিতকে ‘মৃত’ বলে দেখিয়েছেন। অনেক যোগ্য ভোটারের নাম তালিকা থেকে বাদ গিয়েছে। কোথাও আবার পুরুষের জায়গায় মহিলার ছবি বসেছে।
খসড়া তালিকা প্রকাশের পর সেই সমস্ত ত্রুটি সামনে আসছে। ভোটারদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ তৈরি হচ্ছে। নাম বাদ যাওয়ায় বিএলওর বাড়িতে চড়াও হওয়ার ঘটনা ঘটেছে মুর্শিদাবাদের সামশেরগঞ্জের জয়কৃষ্ণপুরে। সেখানে ১৮জন ভোটারের নাম তালিকায় নেই। সেই নিয়ে কৈফিয়ত চাওয়ায় মারপিট, এমনকি থানা-পুলিশ পর্যন্ত হয়েছে। শারীরিক হেনস্তার শিকার হয়েছেন বর্ধমানের কাঁকসার বিরুলিয়ার মহিলা বিএলও মায়া কোনার। ভুলের জন্য ‘বলির পাঁঠা’ বানানো হচ্ছে সংশ্লিষ্ট এলাকার বিএলওদের। ইতিমধ্যেই ১০জন বিএলওকে শোকজ করা হয়েছে। আশঙ্কা, শুনানি পর্বে এই পরিস্থিতি আরও জটিল হতে পারে। এটা খসড়া তালিকা। এরপর চূড়ান্ত তালিকায় জায়গা না পেলে ক্ষোভ আছড়ে পড়বে বিএলওদের উপরেই।
তবে শুনানির জন্য শেষ পর্যন্ত প্রায় দেড় কোটি ভোটারকে ডাকা হলে চরম বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হবে। 
অল্প সময়ের মধ্যে বিপুল সংখ্যক ভোটারের তথ্য যাচাই করে নির্ভুল তালিকা প্রকাশ করা, একপ্রকার অসম্ভব। কীভাবে পরিস্থিতি সামাল দেওয়া যাবে, সেই চিন্তায় ঘুম ছুটেছে প্রশাসনিক কর্তাদের। কারণ শুধু শুনানিই নয়, পাশাপাশি চলতে থাকবে নতুন ভোটারদের আবেদন জমা নেওয়া ও খতিয়ে দেখার কাজ। তাই নির্ধারিত সময়ের মধ্যে এবং নির্বিঘ্নে কাজ শেষ করার একটাই রাস্তা। সংক্ষিপ্ত করতে হবে ‘সন্দেহজনক’ ভোটারের তালিকা। 
পরিসংখ্যান বলছে, উত্তর ২৪ পরগনা জেলার প্রায় ২৩ লক্ষ ভোটার শুনানিতে ডাক পেতে চলেছেন। মুর্শিদাবাদ জেলায় সেই সংখ্যাটা প্রায় ১৬ লক্ষ। বঙ্গ বিজেপির নেতারা একটা কথাই বলে আসছেন, রোহিঙ্গা, অনুপ্রবেশকারী বাংলাদেশিদের (পড়ুন মুসলিম) নাম বাদ দিতে হবে। সেই কারণেই 
তাঁরা এসআইআর নিয়ে লাফালাফি করছেন। কিন্তু এখনও পর্যন্ত যা হিসেব পাওয়া যাচ্ছে তাতে ভোটার তালিকায় বড়ো কোনও ‘সার্জিক্যাল স্ট্রাইক’ না হলে ক্ষতি হবে বিজেপিরই। ‘সন্দেহজনক’ ভোটারের সংখ্যা মুর্শিদাবাদ জেলার চেয়ে অনেক বেশি মতুয়া অধ্যুষিত উত্তর ২৪ পরগনায়। ফলে রক্তচাপ বাড়ছে গেরুয়া শিবিরের নেতাদের। গাইঘাটার বিজেপি বিধায়ক তথা ঠাকুরবাবড়ির সদস্য সুব্রত ঠাকুর সে কথা গোপন করেননি। 
সুব্রতবাবু বলেছেন, বনগাঁ মহকুমায় ‘নো ম্যাপড’ ভোটারের সংখ্যা ১ লক্ষ ৩৫ হাজার। তার ৮০ থেকে ৯০ শতাংশই মতুয়া। কমিশন যে ১১টি নথির কথা বলেছে তার একটিও তাঁদের কাছে নেই। তাহলে উপায়? ‘মোদি শরণং গচ্ছামি’। তাঁরা চাইছেন, মোদি এমন কিছু বলুন যাতে শঙ্কা দূরে সরিয়ে মতুয়ারা রাস্তায় নেমে পড়েন জয়ডঙ্কা নিয়ে।
কোথাও যাওয়ার আগে রীতিমতো হোমওয়ার্ক করে যান স্বপ্নের সওদাগর। আজ, শনিবার মতুয়াগড় রানাঘাটে আসছেন স্বপ্নের ফেরি করতে। এবারও তিনি ফের মতুয়াদের বরাভয় দেবেন, নাগরিকত্বের ‘গাজর’ ঝোলাবেন। কিন্তু সেই উদ্দেশ্য কি সফল হবে? সিএএ হওয়ার পর বাংলায় এখনও পর্যন্ত নাগরিকত্ব পেয়েছেন মাত্র ৪০০জন। আবেদনকারী ৫০ হাজার। সুপ্রিম কোর্ট জানিয়ে দিয়েছে, ‘আগে নাগরিকত্ব। পরে ভোটার।’ তাহলে? বাংলায় একটা প্রবাদ আছে, ‘বারে বারে ঘুঘু তুমি খেয়ে যাও ধান, এবার ঘুঘু তোমার বধিব পরান।’

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ