Bartaman Logo
১০ জুন, ২০২৬
বর্তমান / রাজ্য

ব্রিটিশ শাসনে অস্ত্র আইনে সশ্রম কারাবাসে দণ্ডিত, বিপ্লবী দুকড়িবালা দেবীকে মনে রাখেনি বাংলার মানুষ

প্রতি বছর দেশজুড়ে ঘটা করে স্বাধীনতা দিবস পালন করা হয়।

ব্রিটিশ শাসনে অস্ত্র আইনে সশ্রম কারাবাসে দণ্ডিত, বিপ্লবী দুকড়িবালা দেবীকে মনে রাখেনি বাংলার মানুষ
  • ১৫ আগস্ট, ২০২৫ ০৪:০০
Prefer us on Google

বলরাম দত্তবণিক, রামপুরহাট: প্রতি বছর দেশজুড়ে ঘটা করে স্বাধীনতা দিবস পালন করা হয়। কিন্তু বরাবরই অবহেলিত থেকেছেন ব্রিটিশ বিরোধী স্বাধীনতা আন্দোলনের নারীবিপ্লবী দুকড়িবালা দেবী। ব্রিটিশ শাসনকালে দুকড়িবালা দেবীই অস্ত্র আইনে প্রথম সশ্রম কারাদণ্ডে দণ্ডিতা মহিলা। স্বাধীনতা সংগ্রামীদের কাছে ‘মাসিমা’ নামে পরিচিত ছিলেন। অবশেষে দেশে প্রথম দুকড়িবালার মূর্তি স্থাপন হতে চলেছে নলহাটিতে। পঞ্চায়েত সমিতির উদ্যোগেই সেই মূর্তি বসানোর কাজ চলছে।  

Advertisement

১৮৮৭ সালের ২১ জুলাই নলহাটির ঝাউপাড়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন দুকড়িবালা দেবী। তাঁর বোনপো রানিগঞ্জের সিয়ালসোল গ্রামের নিবারণচন্দ্র ঘটক সরাসরি স্বাধীনতা আন্দোলনের সাথে যুক্ত ছিলেন। বোনপোর টানে প্রায়ই সিয়ারসোলে আসতেন দুকড়িবালা দেবী। বোনপোর সঙ্গে জ্যোতিষচন্দ্র ঘোষ, বিপিনবিহারী গঙ্গোপাধ্যায়ের মতো বিপ্লবীদের কার্যকলাপে উদ্বুদ্ধ হয়ে তিনিও নেমে পড়েন স্বাধীনতা সংগ্রামে। আর এই নিবারণ ঘটকই স্বদেশী আন্দোলনকারীদের জন্য গোপন ডেরা হিসেবে মাসিমার বাড়ি অর্থাৎ ঝাউপাড়াকে বেছে নিয়েছিলেন। বিপ্লবী বিপিনবিহারী গঙ্গোপাধ্যায়, ক্ষুদিরাম বসু, মাস্টারদা সূর্যসেন এই বাড়িতে আত্মগোপন করে থাকতেন। দুকড়িবালা দেবী, নিবারণ ঘটকের বিপ্লবী কার্যকলাপ সম্পর্কে বিস্তৃত বিবরণ পাওয়া যায় সৌরেন্দ্রকুমার চক্রবর্তীর লেখা ‘শেকল ভাঙার পণ ও বাংলার মেয়ে দুকড়িবালা’ শীর্ষক গ্রন্থে। প্রয়াত সৌরেন্দ্রকুমার চক্রবর্তী দুকড়িবালা দেবীর ছেলে। 
১৯১৪ সালের ২৪অক্টোবর জার্মানির রডা কোম্পানির মাওজার পিস্তল ও গোলাবারুদ স্টিলের ট্যাঙ্কের মধ্যে ভরে গোরুর গাড়িতে করে ফোর্ট উইলিয়াম ক্যান্টনমেন্টে আসছিল। যারমধ্যে একটি গোরুর গাড়ির গাড়োয়ানের ছদ্মবেশে বিপ্লবী হরিদাস দত্ত ৯ বাক্স কার্তুজ ও ৫০টি মাওজার পিস্তল চুরি করে চন্দননগরের গোপন আস্তানায় পাচার করেন। তাতে নাম জড়ায় নিবারণ ঘটক ও বিপিনবিহারী গঙ্গোপাধ্যায়ের। তাঁরা আত্মগোপন করেন। ১৯১৭সালের জানুয়ারির শুরুতে মুরারিপুকুর ডাকাতি মামলায় ব্রিটিশ পুলিসের হাতে গ্রেপ্তার হন বিপিনবিহারী। লুট করা অস্ত্র বিভিন্ন জায়গায় পৌঁছে দেওয়ার দায়িত্ব পড়ে নিবারণের উপর। তিনি সেগুলি রেখে আসেন হাওড়ার বিপ্লবী অনুকুলচন্দ্র মুখোপাধ্যায়ের কাছে। তল্লাশির ভয়ে সেখান থেকে আটটি মাওজার পিস্তল এবং দু’টি বাক্সভর্তি গুলি নিয়ে নলহাটিতে  মাসিমার বাড়িতে আসেন। পরের দিন অনুকূলচন্দ্র নিয়ে আসেন আরও কিছু কার্তুজ এবং পিস্তল। সেগুলি উঠানে খড়ের পালুইয়ে লুকিয়ে রাখেন মাসিমা। কিন্তু সেই খবর পৌঁছয় ব্রিটিশদের কাছে। ১৯১৭সালের ৭জানুয়ারি ভোররাতে ব্রিটিশ পুলিস মাসিমার বাড়ি ঘিরে ফেলে। 
সেদিনের রাতের সেই কাহিনী শোনাচ্ছিলেন দুকড়িবালা দেবীর নাতি ৭২ বছর বয়সি পার্থসারথী চক্রবর্তী। তিনি বলেন, ঠাকুমা অত্যন্ত সাহসী ছিল। ওই রাতে ভারী বুটের আওয়াজেও ভয় পায়নি। দরজা খোলার জন্য বলে পুলিস। ঠাকুমা বলেছিল, ‘ঘরে পুরুষ নেই। ছোট ছেলেপুলে নিয়ে একা রয়েছি। সকাল হলে দরজা খুলব।’ এরইমধ্যে পাশের সুরধনী মোল্লানির বাড়িতে অস্ত্রগুলি পাচার করে দেয়। এক গ্রামবাসী তা দেখে ফেলে। এদিকে ঘরের দরজা খুলে দিলে পুলিস গোটা ঘরে তন্নতন্ন করে তল্লাশি চালায়। অস্ত্র না পেয়ে পুলিস যখন চলে যাচ্ছে তখন গ্রামের ওই বাসিন্দা টাকার বিনিময়ে সুরধনীর বাড়ি ইশারা করে দেখিয়ে দিলে অস্ত্র উদ্ধার করে পুলিস। গ্রেপ্তার করা হয় দুকড়িবালা ও সুরধনীকে। অস্ত্র আইনে মাসিমার দু’বছর সশ্রম কারাদণ্ড হয়। জামিন পান সুরধনী। দুকড়িকে পাঠানো হয় প্রেসিডেন্সি জেলে। তিনিই পরাধীন ভারতের প্রথম মহিলা যিনি অস্ত্র আইনে দণ্ডিত হয়েছিলেন। জেলে তাঁর উপর অকথ্য অত্যাচার করা সত্ত্বেও তাঁর মুখ দিয়ে কিছুই বের করতে পারেনি পুলিস। ওইসময় প্রেসিডেন্সি জেলে সাজা খাটছিলেন স্বাধীনতা সংগ্রামের প্রথম মহিলা রাজবন্দি ননীবালা দেবী। জেলে তিনি দুকড়িবালাকে সাহায্য করেন। ১৯৭০সালের ২৮এপ্রিল ৮৩ বছর বয়সে বার্ধক্যজনিত কারণে ঝাউপাড়ার বাড়িতে তাঁর মৃত্যু হয়।
দুকড়িবালাকে যোগ্য সম্মান না জানানোয় আক্ষেপ রয়েছে নাতি পার্থসারথিবাবুর। তিনি বলেন, ঠাকুমার নামে তেমন কোনও নিদর্শন নেই। শুধুমাত্র তারই জমিতে গড়ে ওঠা প্রাথমিক বিদ্যালয় দুকড়িবালা ও নিবারণ ঘটকের নামে নামাঙ্কিত। কয়েকবছর আগে কলকাতার চালতাতলা উদয়ন স্পোটিং ক্লাবের তরফে বাড়ির মধ্যে ঠাকুমার আবক্ষ মূর্তি স্থাপন করা হয়েছে। 
অবশেষে নারী বিপ্লবীর প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে তাঁর আবক্ষ মূর্তি স্থাপনের উদ্যোগ নিয়েছে নলহাটি-১ পঞ্চায়েত সমিতি। দপ্তরের বাইরে সেই মূর্তি বসছে। সমিতির সভাপতি আশাদুজ্জামান বলেন, আগস্টে মাসের মধ্যেই দুকড়িবালা দেবীর মূর্তি উদ্বোধন করা হবে। তাতে নতুন প্রজন্ম এই স্বাধীনতা সংগ্রামীর সম্পর্কে জানতে পারবে। -নিজস্ব চিত্র

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ