সত্য ঘটনা অবলম্বনে ১
বিয়ের বিজ্ঞাপনে লেখা ছিল ‘চাকুরিরতা চলবে’। সেটা দেখেই সুলক্ষণার বাবা এই সম্বন্ধে এগিয়েছিলেন। সুলক্ষণা দক্ষিণ কলকাতার নামী স্কুলের অঙ্কের ‘মিস’। গোল বাঁধল মেয়ে হওয়ার পর থেকে। বেতনের টাকা কেন সুলক্ষণার হাতেই মজুত থাকবে? ঠিক কত টাকা তার হাতে থাকবে, আর কত টাকা সে শ্বশুরবাড়িতে দিতে বাধ্য তার নির্দেশ এল। শ্বশুরবাড়িতে মেয়ে নিয়ে থাকছ, খাচ্ছ আর এখানে টাকা দেবে না কেন! শ্বশুর প্রশ্ন তুললেন। প্রতিবাদ করলে একটাই সমাধান। চাকরি ছেড়ে বাড়িতে বোসো! পারিবারিক অশান্তি এড়াতে চাকরি ছেড়ে দেওয়া মনস্থ করলে উল্টো চাপ। শাশুড়ি বললেন, এবার থেকে সব খরচ তাহলে একা আমার ছেলের কাঁধে!
সুলক্ষণার বর শৌর্য ব্যস্ত মানুষ। মুখে কিছু বলল না। শুধু রাতে খুব সামান্য কারণে এবার গায়ে হাত তুলল শৌর্য। গায়ে হাত ওঠা ও মানসিক নির্যাতন দিনে দিনে নিয়ম হয়ে গেল। একরত্তি মেয়ে আর লোকলজ্জার ভয়ে পুলিশে যেতে পারেনি সুলক্ষণা।
সত্য ঘটনা অবলম্বনে ২
বিয়ের বছর দুয়েক পরে সত্যিটা আবিষ্কার করেছিল তিথি। ওর বর সঞ্চয়নের সঙ্গে কিছুতেই তেমন বনিবনা হচ্ছে না। প্রেমের বিয়ে ওদের। তবু সংসার শুরু হতেই নানা ছুতোয়নাতায় ওকে অপমান করতে শুরু করল সঞ্চয়ন। ওর বাবা-মাও এতে ইন্ধন দিতে শুরু করলেন। প্রথমেই ওর এতদিনের সাধের গান বন্ধ হয়ে গেল। ভোরে উঠে রেওয়াজে সঞ্চয়নের বাড়ির সকলের নাকি অসুবিধা হয়। আর বাড়ির বউ তো আর টিভিতে গান গাইতে যাচ্ছে না! তার আবার এখন এত রেওয়াজের কী আছে? গান ঘুচে গেল বিয়ের তিন-চার মাসের মধ্যেই। এবার নতুন উপদ্রব যোগ হল। প্রেমের বিয়ে বলে সঞ্চয়ন লজ্জার মাথা খেয়ে বিয়ের সময় কী কী ‘বায়না’ করতে পারেনি শ্বশুরের কাছে, তার লিস্ট ধরানো। সত্তরোর্ধ্ব শ্বশুরকে এখনই জোগাতে হবে সেসব। না পারলেই মেয়ের মতামত, গুরুত্ব ও ইচ্ছের ভাগ কমবে। বাড়বে শুধুই লাঞ্ছনা।
অঙ্ক কী বলছে
আমাদের চারপাশেই ঘটে যাওয়া এমন খণ্ড খণ্ড ঘটনা লিখতে বসলে, ঘটনার ক্রমাঙ্ক কোনওদিন শেষ হবে না। গার্হস্থ্য হিংসার ইতিহাস এতই গাঢ় এদেশে। এমনটাই মত সমাজকর্মী ও নৃত্যশিল্পী অলকানন্দা রায়ের। তবু ক্যালেন্ডারে তারিখ নভেম্বরের ২৫ এলেই মনে পড়ে যায়, এবার একটু নড়েচড়ে বসার দিন এসেছে। ২৫ নভেম্বর মেয়েদের প্রতি হওয়া গার্হস্থ্য হিংসার বিরুদ্ধে সচেতন হওয়ার দিন। তারপর প্রায় দিন পনেরো পরেই আসে ১০ ডিসেম্বরের মানবাধিকার দিবস। এই এক পক্ষকাল জুড়ে আমাদের দেশে নারী অধিকার প্রতিষ্ঠার গরম গরম বক্তৃতা, গার্হস্থ্য হিংসা রুখে দেওয়ার নানা কর্মসূচি, সভা, সমিতি একটু বেশি পরিমাণে চলবে। তার পরেই ফের সচেতনতার ফানুস টেনে গুটিয়ে এনে কোথাও একটা তুলে রেখে দেব আমরা ‘আসছে বছর আবার হবে’-র তত্ত্ব মেনে। তা বলে এই দিন পনেরো কি মেয়েরা ‘সবাই রাজা’? তাদের পথে কোনও বাধা নেই? ভুলেও এমন ভাবার অবকাশ নেই। মাত্র বছর কয়েক আগেই, এই ২৫ নভেম্বর ২০১৭-য় নারী নির্যাতন বিরোধী দিবসেই প্রাণ দিয়েছিলেন অনন্যা কোনার! চাকরি না পেলে সন্তানও নেওয়া যাবে না— এমনই ছিল তার স্বামী ও শ্বশুরবাড়ির শর্ত। সঙ্গে জুটেছিল পণের জন্য অত্যাচার। তাও এই খাস কলকাতায়।
নিগ্রহের চাপ
মেয়েদের ভয়, লজ্জা, ঘৃণা অনেক কাছ থেকে দেখেছেন অলকানন্দা। জেলবন্দিদের নিয়ে কাজ করতে গিয়ে গার্হস্থ্য হিংসার নানা ঘটনা কানে এসেছে। তাঁর উপলব্ধি, ‘নারীপ্রগতি নিয়ে শহরে যতই সচেতনতা বাড়ুক, এই অত্যাচারের জাঁতাকলে বেশি পড়ে শহুরে মেয়েরাই। গ্রামের মেয়েরা বরং বহু ক্ষেত্রেই কোনওক্রমে বেরিয়ে আসতে পারে তাঁদের সহজাত সংগ্রামী স্বভাব দিয়ে। পারে না তথাকথিত শিক্ষিত শহুরে মেয়েরাই।’ বহু মেয়েই আছেন, এই অত্যাচার সহ্য করতে না পেরে নিজেকে শেষ করে দেন কিংবা হাতে তুলে নেন শত্রু নিকেষের অস্ত্র। তেমনই এক মেয়ের কথা বললেন অলকানন্দা। ‘সংশোধনাগারে বন্দিদের নিয়ে কাজ করতে গিয়ে আমি কাউকে জিজ্ঞাসা করি না, সে কেন গরাদের ভিতর। তবু কানাঘুষো শুনি। এমনই এক মেয়ে, নিয়ত অত্যাচারিত হতো শ্বশুরবাড়িতে। পরপর দুই মেয়ে হওয়ায় অত্যাচার বাড়ে। এতই অসহ হল তা, যে একদিন দুই মেয়েকে গঙ্গায় ভাসিয়ে দিল মা! নিজেও তারপর গঙ্গায় ঝাঁপ দিতে যাবে, এমন সময় তাকে বাঁচিয়ে দিল একজন। আইনের বিচারে দুই সন্তানকে খুন করার অপরাধে প্রমাণাভাবে মা দোষী সাব্যস্ত হল। শাস্তিও জুটল। কেউই ভেবে দেখল না কোন পরিস্থিতিতে একজন মা তাঁর দুই সন্তানকে মেরে নিজে মরতে যায়!’
পদে পদে বিপদ
ঘরে ঘরে এমন বহু মেয়েই শাস্তি পায় পরিস্থিতির কোপে পড়ে। কেউ বা আপস করে গৃহে শান্তিকল্যাণ বজায় থাকবে বলে। ‘মহানগর’ সিনেমায় আরতিকে ভুলি কী করে? যে আরতি ক্রমাগত বদলাতে থাকা কলকাতার আধুনিকা নারী হয়েও স্বামীর সন্দেহপরায়ণতা সামলাতে গিয়ে জানলা দিয়ে গোপনে তার লিপস্টিক ফেলে দেয়! কত মেয়েকে তো একবারের বেশি দু’বার ফোন করে ‘ব্যস্ত’ পেলে বাড়ি ফিরেই স্বামীর তির্যক বাক্য সইতে হয়। বাড়াবাড়ি দেখলেই চাকরি ছাড়িয়ে দেওয়ার হুমকি আসে। বহু রূপান্তরকামী মেয়েকেও মুখোমুখি হতে হয় সমাজ ও পরিবারের রক্তচক্ষুর। অলকানন্দা বাদ দিলেন না তাঁদের প্রসঙ্গও। জানালেন, ‘নিজের শরীর ও মনকে এক সুতোয় বাঁধতে চাইলেই তারা হয়ে যায় ‘অসুস্থ’, সমাজের কলঙ্ক! তার বেলা? আর মেয়েরা? তাঁরা নিজেরাও কি নিজেদের বিরোধী নয়? তাঁদের মধ্যেও উচ্চ-নীচ, শিক্ষিত-অশিক্ষিত, ধনী-গরিবিয়ানা এসব ফারাকের হাত ধরে ঢুকে পড়ে ঈর্ষা, না পাওয়ার হাহাকার। নাহলে অফিসে মহিলা সহকর্মীর উন্নতিতে কেন মনে হয় ‘নিশ্চয় গন্ডগোল আছে কিছু!’ ট্রেনে-বাসে নিত্যযাত্রী মেয়েরা কেনই বা সহযাত্রী মেয়ের ক্ষোভের কোপে পড়েন নানা অছিলায়? কেন গ্রামে-শহরে নারী নির্যাতন বিরোধী কমিটির মাথায় বসা কোনও মহিলার ঘরের অন্দরেই অত্যাচারিত হয় তারই বাড়ির বউ?’ এমন নানা প্রশ্ন তুললেন তিনি।
এসব প্রশ্নের সমাধান বইয়ে নেই। আছে, আমাদেরই মনের মধ্যে। তাহলে কী সেই পথ? অলকানন্দা বললেন, ‘স্কুলের নিচু ক্লাসের শিশুদের এত জটিল বিষয়ে না ভাবিয়ে বরং একাদশ-দ্বাদশ থেকেই গার্হস্থ্য হিংসা নিয়ে সচেতন করা হোক, ছেলে-মেয়ে উভয়কেই। মেয়েদের ‘মেয়ে’ না ভেবে ‘মানুষ’ ভাবা হোক। ছেলেদেরও তা-ই।’
আগামী ২৫ নভেম্বর গার্হস্থ্য হিংসা ও নারী নির্যাতন বিরোধী দিবস। দিন পালনেই দায়িত্ব শেষ? মত দিলেন সমাজকর্মী ও নৃত্যশিল্পী অলকানন্দা রায়। ঘরের ভিতর অসুখ
শুধু শ্বশুরবাড়ি নয়, মেয়েরা অত্যাচারিত নিজের বাড়িতেও। নিজের মেয়ের মনের অন্দরে উঁকি দিয়ে তার ইচ্ছের দাম দেন ক’জন বাবা-মা? তাহলে আজও নানা জায়গায় কেন মেয়েদের নিজেকে বাঁচাতে হয় ‘ক্ষতিকর’ আত্মীয়ের হাত থেকে? অনার কিলিং, নাবালিকা বিয়ে-র মতো অপরাধ বাড়ির লোকের হাতেই বারবার ঘটে কেন? কেন শ্বশুরবাড়িতে অত্যাচারিত মেয়েকে ফিরিয়ে আনা যায় না, পরবর্তীকালে তার বোন বা ভাইয়ের বিয়েতে অসুবিধা হবে বলে! কিংবা নেহাতই ‘লোকে কী বলবে’ ভেবে!
আসলে এই এত ‘কেন’-র অংশীদার আমরা সকলে। নারীনিগ্রহ ও তাদের মৃত্যুর দায় আমাদেরই। যতদিন এই দায় স্বীকার করে অন্যায়ের প্রতিরোধ গড়ে তুলতে না পারব, ততদিন এই এক পক্ষকালব্যাপী সচেতনতা পালন স্রেফ ‘কর্মসূচি’ হয়ে থাকবে। মেয়েদের মুক্তির আলো গেরস্থালির বারান্দায় এসে পড়বে না। সেখানে হেসে লুটোপুটি খাবে না আমার-আপনার মেয়ের শৈশব।
মনীষা মুখোপাধ্যায়