ফুটবলের মহাযজ্ঞের কাউন্টডাউন শুরু হয়ে গিয়েছে। বিশ্বকাপের মঞ্চে বার বার তাক লাগিয়েছেন জুনিয়র ফুটবলাররা। এবারের উঠতি তারকা কারা? কারা হাসতে পারেন শেষ হাসি? তেমনই পাঁচজন নতুন তারার খোঁজ করলেন সৌগত গঙ্গোপাধ্যায়।
ফুটবলের মহাযজ্ঞের কাউন্টডাউন শুরু হয়ে গিয়েছে। বিশ্বকাপের মঞ্চে বার বার তাক লাগিয়েছেন জুনিয়র ফুটবলাররা। এবারের উঠতি তারকা কারা? কারা হাসতে পারেন শেষ হাসি? তেমনই পাঁচজন নতুন তারার খোঁজ করলেন সৌগত গঙ্গোপাধ্যায়।
শ্বকাপ মানেই ফুটবলের মহাযজ্ঞ। প্রতিবারই এই মেগা আসর নিয়ে আসে নতুন কিছু গল্প। কখনো জয়ের, কখনো পরাজয়ের। আবার কখনো নতুন তারার। যাঁরা বিশ্বকাপ মাতিয়ে হয়ে ওঠেন আগামী উজ্জ্বল তারকা। অচেনা, অনামী মুখগুলির পায়েই কখনো কখনো লেখা হয় ফুটবলের সবচেয়ে মনোমুগ্ধকর গল্পগুলি। যেমনটা ২০১৪ বিশ্বকাপে হামেস রড্রিগেজ কলম্বিয়ার জার্সিতে বিশ্বকে তাক লাগিয়ে দিয়েছিলেন। ২০১৮-তে ১৯ বছর বয়সি কিলিয়ান এমবাপের গায়ে সেঁটে গিয়েছিল দ্রুততম ফুটবলারের তকমা। ২০২২ বিশ্বকাপে জুলিয়ান আলভারেজ, এনজো ফার্নান্ডেজ, ম্যাক অ্যালিস্টার— আর্জেন্তিনার মেসি-যুগের তরুণ নায়করা হয়ে উঠলেন ইতিহাসের অংশ।
এবার মঞ্চ তৈরি উত্তর আমেরিকায়। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও মেক্সিকোতে শুরু হতে চলেছে ফুটবলের মহাযজ্ঞ। ৪৮টি দলের এই বর্ণাঢ্য আসরে ভিড় করবেন বিশ্বের সেরা প্রতিভারা। সেই ভিড়ের মধ্যে পাঁচটি তরুণ মুখ— যাঁরা হয়তো এই মহাযজ্ঞকে কেবল নিজেদের প্রমাণের মঞ্চ বানাবেন না, বদলে দেবেন আধুনিক ফুটবলের মানচিত্রকেও। তাঁরা হলেন লামিনে ইয়ামাল, এনড্রিক, আদ্রা গুলের, মাইকেল ওলিসে ও নিকোলাস পাজ।
লামিনে ইয়ামাল
স্পেনের বিস্ময় প্রতিভা
বার্সেলোনার এসপ্লুগেস দে ইয়োব্রেগাতে জন্ম নেওয়া এই ছেলেটির বয়স মাত্র ১৮। কিন্তু তাঁর পায়ের জাদু দেখে তা বোঝার উপায় নেই। ২০০৭ সালে জন্মানো এই তরুণ তুর্কি ইতিমধ্যেই বিপক্ষ শিবিরের কাছে ত্রাস হয়ে উঠেছেন। এরই মধ্যে স্পেনের সর্বকনিষ্ঠ আন্তর্জাতিক ও সর্বকনিষ্ঠ গোলদাতা হিসেবে ইতিহাসের পাতায় নাম লিখিয়েছেন। ২০২৪ সালে স্পেনের ইউরো জয়েরও অন্যতম নায়ক তিনি। টুর্নামেন্টের সেরা খেলোয়াড়ের পুরস্কারও উঠেছে তাঁর হাতে। এবার লামিনের পাখির চোখ বিশ্বকাপ মাতানো। ক্লাব ফুটবলে বার্সেলোনার হয়ে খেলেন লামিনে। সদ্যসমাপ্ত লা লিগা মরশুমে তাঁর পরিসংখ্যান রীতিমতো অবিশ্বাস্য— ২৮ ম্যাচে ১৬ গোল, ১১ অ্যাসিস্ট, গড় রেটিং ৮.৩৩। চ্যাম্পিয়নস লিগেও ১০ ম্যাচে ৬ গোল ও ৪ অ্যাসিস্ট। এই মরশুমে তিনি লা লিগায় ১০০ ম্যাচ এবং চ্যাম্পিয়নস লিগে ৩০ ম্যাচ পূর্ণ করা সর্বকনিষ্ঠ খেলোয়াড় হয়েছেন।
২৬ জনের স্পেনের বিশ্বকাপ স্কোয়াডে কোচ লুইস ডে লা ফুয়েন্তের বড়ো অস্ত্র এই লামিনে। তবে মরশুম শেষে হ্যামস্ট্রিং চোটের কারণে প্রথম ম্যাচে তাঁকে পাওয়া যাবে কি না সে নিয়ে সংশয় আছে। কোচ ফুয়েন্তে অবশ্য নিশ্চিত করেছেন, ইয়ামাল বিশ্বকাপ কাঁপাতে তৈরি। বার্সেলোনার ১০ নম্বর জার্সিধারী এই তরুণ ডান উইংয়ে প্রতিপক্ষের রক্ষণে চিড় ধরাতে সিদ্ধহস্ত। এবার বিশ্বকাপের মঞ্চে তিনি কতটুকু ঝলক দেখাতে পারেন সেটাই অন্যতম বড়ো কৌতূহল।
এনড্রিক
ব্রাজিলের সোনার ছেলে
ব্রাজিলের রাজধানী ব্রাসিলিয়ার তাগুয়াতিঙ্গায় ২০০৬ সালে জন্ম নেওয়া এনড্রিক বেড়ে উঠেছেন অভাবের সংসারে। কিন্তু দারিদ্র্য তাঁর স্বপ্নকে দমাতে পারেনি। মাত্র ১১ বছরে পামেইরাসের অ্যাকাডেমিতে যোগ দিয়ে ষোলো বছর বয়সেই দলে অভিষেক করেন। সুযোগের সদ্ব্যবহারেও ভুল হয়নি তাঁর। ক্লাবের ইতিহাসে সর্বকনিষ্ঠ গোলদাতাও এনড্রিক। এরপর জাতীয় দলেও আলো ছড়ান তিনি। ১৭ বছর বয়সে ওয়েম্বলিতে ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে জয়সূচক গোল করে সেই মাঠে সর্বকনিষ্ঠ আন্তর্জাতিক গোলদাতার রেকর্ড গড়েন।
ক্লাব ফুটবলেও বেশ উজ্জ্বল এনড্রিক। রিয়াল মাদ্রিদে প্রথম মরশুমে ৩৭ ম্যাচে ৭ গোল করলেও নিয়মিত সুযোগ পাননি। তাই ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে লিয়েনে ফরাসি ক্লাব নিওঁতে যোগ দেন। আর সেখানে তিনি রীতিমতো ফুল ফোটাচ্ছেন। ১৪ ম্যাচে ৬ গোল ও ৫ অ্যাসিস্টের পাশাপাশি লিগ ওয়ানের মাসের সেরা খেলোয়াড়ের স্বীকৃতি পেয়েছেন। আর দুরন্ত এই ফর্মের সুবাদেই ব্রাজিলের বিশ্বকাপ স্কোয়াডে জায়গা নিশ্চিত করেছেন ১৯ বছর বয়সি এই স্ট্রাইকার। ভিনিসিয়াস, নেইমারদের পাশে ম্যাচ বদলে দেওয়ার ক্ষমতা এনড্রিকের রয়েছে। আসন্ন বিশ্বকাপে তিনি কার্লো আনসেলোত্তির তুরুপের তাস হয়ে উঠতে পারেন।
আদ্রা গুলের
তুরস্কের মেসি
তুরস্কের আঙ্কারায় ২৫ ফেব্রুয়ারি ২০০৫ সালে জন্ম নেওয়া আদ্রা গুলের মাত্র একুশ বছরে ফুটবলের সবচেয়ে দামি ক্লাব রিয়াল মাদ্রিদের প্রথম একাদশে নিজের আসন পাকা করে নিয়েছেন। ফেনারবাখ থেকে ২০২৩ সালে মাদ্রিদে যোগ দেওয়ার পর তাঁকে অপ্রতিরোধ্য দেখাচ্ছে।
ফুটবলপ্রেমীরা তাঁকে ‘তুরস্কর মেসি’ নামেই বেশি চেনেন। বিশেষজ্ঞরাও তাঁকে সেরাদের মধ্যে একজন ভাবছেন। সদ্যসমাপ্ত লা লিগায় ৯টি অ্যাসিস্ট রয়েছে তাঁর। তুরস্কের জাতীয় দলের হয়ে ২৮ ম্যাচে ৬ গোল ও বিশ্বকাপ বাছাইয়ে ৪ অ্যাসিস্ট করেছেন— বাছাই পর্বে মাত্র দু’জন খেলোয়াড় তাঁর চেয়ে বেশি চান্স তৈরি করেছেন। তুরস্কের জাতীয় দলও দারুণ ছন্দে। দীর্ঘ ২৪ বছর পরে বিশ্বকাপে ফিরেছে তারা। গুলের সঙ্গে কেনান ইলদিজকে নিয়ে তুরস্কের আক্রমণভাগ বেশ শক্তিশালী। বাঁ পায়ে ফ্রি-কিক থেকে শুরু করে ড্রিবল, থ্রু বল গুলের আক্রমণাত্মক মিডফিল্ডে যা করেন তাতে অনেক সিনিয়র খেলোয়াড়ও লজ্জা পাবেন। বিশ্বকাপের বড়ো মঞ্চে এই তরুণ তুর্কি কতটা ঝলক দেখান, সেটা দেখার অপেক্ষায় গোটা ফুটবল দুনিয়া।
মাইকেল ওলিসে
বায়ার্নের সেরা, ফ্রান্সের ট্রাম্পকার্ড
লন্ডনের হ্যামারস্মিথে ২০০১ সালে জন্ম নেওয়া মাইকেল ওলিসে এখন ইউরোপের অন্যতম সেরা উইঙ্গার। চেলসি, ম্যানচেস্টার সিটির অ্যাকাডেমি, রিডিং ও ক্রিস্টাল প্যালেস হয়ে ২০২৪ সালে বায়ার্ন মিউনিখে যোগ দিয়েছেন। জার্মানিতে এরই মধ্যে দু’টি বুন্দেশলিগা শিরোপা জিতেছেন। চলতি মরশুমে স্বপ্নে ফর্মে ছিলেন তিনি। বুন্দেশলিগায় ১৫ গোল ও ১৯ অ্যাসিস্ট মিলিয়ে মোট ৩৪টি গোল কনট্রিবিউশন।
জাতীয় দলেও নজর কেড়েছেন ওলিসে। ফ্রান্সের হয়ে ১৩টি ম্যাচে ৪টি গোল— ক্রোয়েশিয়া ও জার্মানির বিরুদ্ধে নেশনস লিগে এবং বিশ্বকাপ বাছাইয়ে ইউক্রেনের বিরুদ্ধেও গোল পেয়েছেন। ডানদিক থেকে ভেতরে কেটে বাঁ পায়ে শট নেওয়া বা নিখুঁত ক্রস করার দক্ষতায় তিনি অদ্বিতীয়। ২০২৪ প্যারিস ওলিম্পিকসে রুপোও পেয়েছেন। এমবাপে, ডেম্বেলের পাশে ওলিসে— ফ্রান্সের এই আক্রমণভাগ বিপক্ষের ঘুম কাড়তে সক্ষম।
নিকোলাস পাজ
আর্জেন্তিনার উঠতি তারা
স্পেনের তেনেরিফে ২০০৪ সালে জন্ম নেওয়া নিকোলাস পাজের জীবনের গল্পটা অদ্ভুত সুন্দর। বাবা পাবলো পাজ ছিলেন আর্জেন্তিনার ফুটবলার— সেই সূত্রে স্পেনে জন্ম নিলেও সন্তান বেছে নিলেন আর্জেন্তিনার নীল-সাদা জার্সি। রিয়াল মাদ্রিদের অ্যাকাডেমি থেকে উঠে আসা এই মিডফিল্ডার ২০২৪ সালে ইতালির সিরি এ’র ক্লাব কোমোতে যোগ দিয়ে রীতিমতো ঝড় তুলে দিয়েছেন। চলতি মরশুমে ক্লাবের হয়ে ১২ গোল ও ৬ অ্যাসিস্ট করে তিনি সিরি এ-র বর্ষসেরা মিডফিল্ডার। ইতালির ফুটবল কিংবদন্তি ফ্রান্সেসকো তোত্তি পর্যন্ত বলেছেন, ‘একমাত্র যাকে দেখে আমি মুগ্ধ হচ্ছি, সে ইতালিয়ান নয়, সে নিকো পাজ।’ কোমোর ম্যানেজার ফ্যাব্রেগাস তাঁকে দিয়েছেন দরাজ সার্টিফিকেট। আর্জেন্তিনার জার্সিতেও ইতিমধ্যে নজর কেড়েছেন। জাতীয় দলে অভিষেকের দিনই মেসিকে অ্যাসিস্ট করেছিলেন তিনি। এখন পর্যন্ত সিনিয়র দলে ৮টি ম্যাচ খেলেছেন। তবে বিশ্বকাপের আগে হাঁটুতে চোট পেয়ে সামান্য শঙ্কা তৈরি হয়েছিল তাঁকে নিয়ে। আর্জেন্তিনা ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন চায়নি তিনি কোনো ঝুঁকি নিক। তবে স্বস্তির খবর, তিনি এখন সুস্থ। বিশ্বচ্যাম্পিয়নদের হয়ে খেতাব রক্ষার মিশনে নিকো পাজই হতে পারেন আর্জেন্তিনার রহস্যময় তুরুপের তাস যা প্রতিপক্ষ অনুমান করতে পারবে না।
ইয়ামাল, কুবার্সি, গুলের, ওলিসে, পাজ— এই পাঁচ তরুণের পায়ে রয়েছে, সেই প্রতিভা যা রাতারাতি পৃথিবীর দৃষ্টি আকর্ষণ করে নিতে পারে। ইতিহাস বলে, বিশ্বকাপের আলোয় তরুণ প্রতিভারাই সবচেয়ে বেশি ঝলমল করে। এবার দেখা যাক তরুণ তুর্কিরা প্রত্যাশপূরণে কতটা সফল হন।