পুরুষ ও প্রকৃতি একাকার চেতলা অগ্রণীর ‘বিশ্বরূপে বিশ্বরূপিণী’তে
  • ১৫ অক্টোবর, ২০২৬ ০৪:০০
Prefer us on Google

অর্ক দে, কলকাতা: শ্রীকৃষ্ণ বা জগন্নাথের বিশ্বরূপ এবং চণ্ডীপুরাণে বর্ণিত দেবীর বিশ্বরূপের মেলবন্ধন এ বছরের চেতলা অগ্রণীতে। ১৯৫৯ সালে যাত্রা শুরু করে আজ ছয় দশকেরও বেশি সময় ধরে এই দুর্গাপুজো তার শৈল্পিক উৎকর্ষ ও নান্দনিক ভাবনার জন্য বঙ্গবাসীর হৃদয়ে এক বিশেষ স্থান করে নিয়েছে। ২০২৬ সালের শারদোৎসবেও সেই ধারা বজায় রেখে দর্শনার্থীদের ‘বিশ্বরূপে বিশ্বরূপিণী’র অনন্য অভিজ্ঞতা উপহার দিতে চলেছে পুজো উদ্যোক্তারা। 

Advertisement

এই বিশাল পৃথিবী, আকাশ, নদী, পাহাড়, গাছপালা, মানুষ, জীবজন্তু সবকিছু মিলেই আমাদের এই বিশ্ব। একটি বিশ্ব-অসংখ্য রূপ, অসংখ্য জীবন। কিন্তু সবকিছুর মধ্যে কোথাও যেন একটি অদৃশ্য যোগসূত্র আছে। এই ভাবনাই বিশ্বরূপ। মহাভারতে শ্রীকৃষ্ণ অর্জুনকে সেই বিশ্বরূপের দর্শন দিয়েছিলেন। অন্যদিকে প্রভু জগন্নাথদেবের রথযাত্রার মাধ্যমে আমরা দেখি ভারতের বিভিন্ন প্রান্তের মানুষ ও সংস্কৃতির মিলন। মহাভারতের গল্প এবং আমাদের সনাতন ঐতিহ্য, আজও জীবনের সঙ্গে সম্পৃক্ত, সেটাই এবার চেতলার ভাবনা। শ্রীমদ্ভগবদগীতার একাদশ অধ্যায়ে শ্রীকৃষ্ণ অর্জুনকে যে দিব্য ও অনন্ত বিশ্বরূপ দেখিয়েছিলেন, দেবীমাহাত্ম্যম্ বা শ্রীশ্রীচণ্ডীতে মা দুর্গাকে ঠিক সেই একই পরম ব্রহ্মের শক্তিরূপ বা ‘বিশ্বরূপিণী’ হিসাবে স্তুতি করা হয়েছে। পুজো কর্তা সব্যসাচী রায় চৌধুরী বলেন, শ্রীকৃষ্ণের বিশ্বরূপ পরম পুরুষ বা পরম চেতনা, যা সমগ্র সৃষ্টির আধার। মা দুর্গার বিশ্বরূপিণী রূপ পরম প্রকৃতি বা আদ্যাশক্তি, যা ছাড়া পরম পুরুষের ইচ্ছা বা সৃষ্টি রূপ পেতে পারে না। বিশ্বরূপের রূপান্তরকারিণী শক্তিই বিশ্বরূপীণি। সনাতন দর্শনে আমরা বিশ্বাস করি, এই অসংখ্য সৃষ্টির পিছনে আছে এক মহাশক্তি। যে শক্তি সৃষ্টি করে, জীবনকে ধরে রাখে, আবার প্রয়োজনে পুরনোকে সরিয়ে নতুনকে জন্ম দেয়। সেই মহাশক্তিই আমাদের কাছে, মা দুর্গা বিশ্বরূপিণী। মহাভারতের কুন্তী ও গান্ধারীর মধ্যে আমরা দেখি মায়ের শক্তি ও ত্যাগ। চিত্রাঙ্গদা ও দ্রৌপদীর মধ্যে দেখি নারীর আত্মসম্মান, প্রেম ও সংগ্রাম। আর গঙ্গার মতো নারীও জীবনের প্রতীক বয়ে চলেন, সবাইকে ধারণ করেন। জীবন দেন এবং নিজেকে বিলিয়ে দেন।
মূলত খড়, বাস এবং লোহা দিয়ে তৈরি করা হয়েছে মণ্ডপ। মণ্ডপে ভাবনার বিস্তার ঘটিয়েছেন শিল্পী সুব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়। তিনি বলেন, কথায় আছে যে রাঁধে সে চুলও বাঁধে। তাই গ্রামবাংলার নারী শিল্পীদের হাতে খড়ের বেণী ও বলম বুননে তৈরি বিশাল বিশ্বরূপ এবং তিনটি রথের আদলে সমগ্র মণ্ডপ। নারী মা, যিনি জীবন দেন। তিনি যোদ্ধা, যিনি অন্যায়ের বিরুদ্ধে লড়েন। তিনি প্রেম, যিনি মানুষকে কাছে টানেন। তিনি সৃষ্টিশক্তি, যিনি নতুন কিছু গড়ে তোলেন। তিনি সাহস, যিনি কঠিন সময়ে আমাদের শক্তি দেন। নারী এই বিভিন্ন চরিত্রের মধ্যে যোগসূত্র হিসাবে খড়ের বেণীকে ওয়েভের মতো করে ব্যবহার করা হয়েছে। নারীর এই নানা রূপকে নিয়েই দেবী দুর্গা বিশ্বরূপীণি।
সামনে বিশাল আকৃতির রথের স্ট্রাকচার বানানো হয়েছে। লোহা এবং কাঠ মিলিয়ে বানানো হয়েছে সেই রথ। মণ্ডপের বাইরে রথে রয়েছেন বিশ্বরূপ এবং ভেতরে দুর্গা রয়েছেন বিশ্বরূপীণি হিসাবে।