সঞ্জিত সেনগুপ্ত, শিলিগুড়ি: সাবেকিয়ানাই শিলিগুড়ির মিত্র সম্মিলনীর পুজোর অহঙ্কার। চারিদিকে থিমের প্রতিযোগিতা। সেখানে ৯৯ বছর ধরে সাবেকিয়ানায় পুজো করে চলেছে শিলিগুড়ির হিলকার্ট রোডের মিত্র সম্মিলনী। শিলিগুড়ির সংস্কৃতির পীঠস্থান মিত্র সম্মিলনীতে একসময় পুজোর তিনদিন রাতভর নাটক হতো। শহরের আশপাশ থেকে চা বাগান এলাকার মানুষ আসতেন এই পুজো দেখতে। প্রতিমা দর্শনের পর প্রসাদ গ্রহণ করে সবাই নাটক দেখতে বসে পড়তেন। নাটক শেষ হতে হতে ভোর হয়ে যেত। ভোরের আলো ফুটতেই আবার গোরুর গাড়ি করে সকলে ফিরে যেতেন।
এখন আর নাটক হয় না। অনেক বছর আগেই বন্ধ হয়ে গিয়েছে। তবে পুজোয় সেই সাবেকিয়ানা বজায় রয়েছে এখনও। একচালা ঠাকুর, নাটমন্দির সব আগের মতোই। গত বছর কালীঘাটের পটচিত্রে পুজো প্রাঙ্গণ সাজিয়ে তোলা হয়েছিল। এবার নাটমন্দিরকে সুন্দর করে সাজিয়ে তোলা হচ্ছে টেরাকোটা শিল্পে। মিত্র সম্মিলনীর সম্পাদক সৌরভ ভট্টাচার্য বলেন, শিলিগুড়ির সংস্কৃতির পীঠস্থান মিত্র সম্মিলনীর পুজো শিলিগুড়িবাসীর একটা আলাদা আবেগ। সেই কারণেই আমাদের সাবেকিয়ানা আজও অটুট। বছরের পর বছর ধরে চলে আসা রীতি মেনেই এখানে আজও রথের দিন নাটমন্দিরে প্রতিমা তৈরির কাজ শুরু হয়ে যায়। এবছর আমাদের পুজো ৯৯ বছরের। আগামী বছর শতবর্ষ। তারই অঙ্গ হিসেবে এবার আমাদের পুজোর আয়োজন এই বাড়তি চমক, থাকবে দৃষ্টিনন্দন আলোকসজ্জা। সেই সঙ্গেই নানা সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ও ছোটদের নিয়ে আঁকা প্রতিযোগিতা।
মিত্র সম্মিলনীর পুজোর আরএকটি বৈশিষ্ট অন্যান্য পুজোর মত সেলিব্রিটি বা অতিথি দিয়ে এখানে পুজোর উদ্বোধন হয় না। পঞ্চমীর দিন আগমনী গানের মধ্য দিয়ে পুজো শুরু হয়। আর প্রতিমা বিসর্জন হয় দশমীর দিন বেলা ১২টার পর। একসময় মিত্র সম্মিলনীর প্রতিমা টয় ট্রেনে করে মহানন্দার ঘাটে নিয়ে গিয়ে বিসর্জন দেওয়া হতো।
পুজোর শুরুটা হয়েছিল শহরের কিছু নাটক পাগল মানুষের হাত ধরে। তখন নাম ছিল, ‘ফ্রেন্ডস অব ইউনিয়ন’। ১৪ কাঠা জমিতে ক্লাব তৈরি হয়। জমিদাতার শর্ত ছিল, প্রতি বছর সরস্বতী পুজো ও দুর্গাপুজো এই মঞ্চেই করতে হবে। পুজোর পাশাপাশি ইন্ডোর গেম, অভিনয়, সাহিত্য চর্চা, পত্রপত্রিকা পরিচালনা এবং অন্যান্য সামাজিক উন্নয়নমূলক কাজকে গুরুত্ব দিয়ে তৈরি হয় মিত্র সম্মিলনী।
অনেক গল্পগাঁথার সাক্ষী শিলিগুড়ির অন্যতম প্রাচীন মিত্র সম্মিলনীর পুজো। ক্লাবের সদস্যরা বলেন, দেবীর বোধন থেকে সিঁদুর খেলা সবতেই মিত্র সম্মিলনী এখনও শহরের বাকি পুজোগুলির থেকে এগিয়ে। অতীতের সেই রাতভর নাটকের আয়োজন নেই। তবে বিজয়া সম্মিলনীর অনুষ্ঠানে নাটকের আয়োজন হয়ে থাকে। সাবেকিয়ানার জন্য এই পুজো আজও সকলের মন কাড়ে। বহু প্রবীণ নাগরিক পুজোর দিনগুলিতে এখানে আসেন। স্মৃতিচারণায় নবীন-প্রবীণের মেল বন্ধনে মিত্র সম্মিলনীর পুজোয় পারিবারিক পরিবেশ গড়ে ওঠে বলে দাবি ক্লাব সম্পাদকের। নিজস্ব চিত্র।