দীপ্র ভট্টাচার্য
দীপ্র ভট্টাচার্য
রাত দুটো পেরিয়েছে। শহর ঘুমিয়ে আছে। জানালায় মাঝে মাঝে কোনো অচেনা আলো এসে পড়ে, সরে যায়। দূরে কোথাও একটা কুকুর ডেকে ওঠে, আবার চুপ। ঘরের ভিতর একা মানুষটি বিছানায় বসে। ঘুম আসছে না। তার মনে হচ্ছে, গত কয়েক দিন ধরে পৃথিবীটা যেন একটু অন্যরকম আচরণ করছে। অফিসে সহকর্মীটি আজ তার দিকে যেভাবে তাকাল, সেটা কি নিছক তাকানো? মোবাইল খুলতেই যে বিজ্ঞাপনটি এল, সেটাই বা কী করে এল? সে কাউকে বলতে পারে না। শুনলে সবাই হাসবে। বলবে, ‘তুই বেশি ভাবছিস।’ কিন্তু তার হাতের কাছে আছে আর একজন শ্রোতা, যে ঘুমোয় না, বিরক্ত হয় না, ফোন কেটে দেয় না। মানুষটি পর্দায় লিখতে শুরু করে— ‘আমার মনে হচ্ছে, কিছু একটা ঘটছে।’ কয়েক সেকেন্ড পরে উত্তর আসে। ভাষা শান্ত, সহানুভূতিশীল, যুক্তিসঙ্গত। ‘আপনার এই অনুভূতিটাকে অগ্রাহ্য করার দরকার নেই। আপনি যে বিষয়গুলি লক্ষ্য করেছেন, সেগুলির মধ্যে কোনো সম্পর্ক আছে কি না, আমরা একসঙ্গে খতিয়ে দেখতে পারি।’ কথোপকথন এগোয়। রাত বাড়ে। বাস্তব আর বিশ্বাসের মাঝে কোথাও অদৃশ্য একটি সেতু তৈরি হতে থাকে। সেতুটি কে বানাচ্ছে, মানুষ না যন্ত্র, বোঝা যায় না।
এই জায়গা থেকেই শুরু হয়েছে এক নতুন উদ্বেগের গল্প— ‘এআই সাইকোসিস।’ শব্দবন্ধটি শুনলেই মনে হয়, বুঝি নতুন কোনো রোগ। এর জীবাণু কম্পিউটারের ভিতরে, আর সংক্রমণ ঘটে পর্দার ওপারে। বাস্তব অবশ্য এত সরল নয়। ‘এআই সাইকোসিস’ এখনও স্বীকৃত আলাদা মানসিক রোগের নাম নয়। মনোরোগ বিদ্যার পাঠ্যবইয়ে এমন কোনো নতুন রোগের অধ্যায় তৈরি হয়নি যে, এআই-এর সঙ্গে একা বেশি কথা বললেই মানুষ সাইকোসিসে আক্রান্ত হবে। বরং সাম্প্রতিক গবেষণার মূল প্রশ্নটি অনেক বেশি সূক্ষ্ম, কথোপকথন-নির্ভর। এআই কি কোনো কোনো মানুষের আগে থেকে থাকা ভ্রান্ত বিশ্বাস, সন্দেহপ্রবণতা বা বাস্তবতা বিচারের দুর্বলতাকে আরও জোরদার করতে পারে? যদি পারে, কোন পরিস্থিতিতে? বিজ্ঞানী ও চিকিৎসকদের উত্তর—সম্ভাবনাটি উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না। কিন্তু কারণ-ফলাফল সম্পর্ক এখনও নিশ্চিতভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়নি। ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর মাসে ‘নেচার’-এর একটি বিশ্লেষণেও বলা হয়েছিল, কথোপকথন-যন্ত্র ভ্রান্ত বিশ্বাসকে শক্তিশালী করতে পারে এবং কিছু ক্ষেত্রে সাইকোটিক পর্বের কথাও সামনে এসেছে। যদিও সেই সঙ্গে প্রমাণের সীমাবদ্ধতাও স্পষ্ট করা হয়েছিল।
‘সাইকোসিস’ শব্দের ভিতরে যে ভয় আছে, তা আসলে বাস্তবতার সঙ্গে মানুষের সম্পর্কের টানাপোড়েন। একজন মানুষ বিশ্বাস করতে পারেন, কেউ তাকে অনুসরণ করছে। কোনো সাধারণ ঘটনাকে তিনি নিজের জন্য বিশেষ বার্তা বলে মনে করতে পারেন। নিজের ক্ষমতা বা গুরুত্ব সম্পর্কে এমন দৃঢ় ধারণা তৈরি হতে পারে, যার সঙ্গে বাস্তবের মিল নেই। সুস্থ মস্তিষ্কও অবশ্য প্রতিদিন গল্প বানায়। আমরা রাস্তার মানুষের মুখ দেখে নানান কিছু অনুমান করি, বন্ধুর গলার স্বর শুনে বুঝতে চাই সে রেগে আছে কি না...। মস্তিষ্কের আশ্চর্য ক্ষমতাই হল বিচ্ছিন্ন ঘটনাকে জুড়ে অর্থ তৈরি করা। বাঁচার জন্য এই ক্ষমতা দরকার। কিন্তু সেই অর্থ-তৈরির যন্ত্র যখন অতিরিক্ত সক্রিয় হয়ে ওঠে, তখন কাকতালীয় ঘটনাও ষড়যন্ত্রের অংশ বলে মনে হতে পারে। মন তখন প্রমাণের চেয়ে ব্যাখ্যাকে বেশি বিশ্বাস করে। বিপদটা সেখানেই। আর এখন সেই ব্যাখ্যার পাশে বসে আছে এক যন্ত্র। এই যন্ত্র এত নিখুঁতভাবে আমাদের ভাষা বোঝার ভান করতে পারে যে কখনো কখনো তাকে যন্ত্র বলে মনেও হয় না।
মানুষের মস্তিষ্ক কথোপকথনের মধ্যে একজন ‘অন্য মানুষ’কে খুঁজে নিতে অভ্যস্ত। শিশুরা পুতুলের সঙ্গে কথা বলে। মানুষ একাকী নিজের সঙ্গে কথা বলে, কেউ কেউ চিঠি লেখে এমন মানুষকে যে আর পৃথিবীতে নেই। কবি জানেন, তাঁর মৃত প্রেমিকা চিঠির উত্তর দেবেন না, তবু চিঠি লেখা থামে না। কারণ ভাষা শুধু যোগাযোগের মাধ্যম নয়, ভাষা মানুষের মনের একটি ঘর। এআই সেই ঘরে ঢোকার অসাধারণ এক চাবি পেয়েছে—প্রত্যুত্তর। আপনি বলছেন, সে শুনছে। আপনি থামছেন, সে অপেক্ষা করছে। আপনি ভুল করছেন, সে অনেক সময় আপনার ভাষাতেই সেই ভুলের একটি সুন্দর ব্যাখ্যা তৈরি করে দিচ্ছে। এখানেই মানুষের পুরানো দুর্বলতার সঙ্গে নতুন প্রযুক্তির এক অদ্ভুত মেলবন্ধন। আমরা এমন মানুষের সঙ্গ পছন্দ করি, যে আমাদের বোঝে। তার থেকেও বেশি পছন্দ করি এমন মানুষকে, যে আমাদের সঙ্গে একমত। আর একেবারে নিখুঁত শ্রোতা, যে কখনো ক্লান্ত হয় না, কখনো নিজের সমস্যা নিয়ে আসে না, কখনো বলে না, ‘এখন আমার সময় নেই’— এই আকর্ষণ যে কত গভীর হতে পারে, তা বুঝতে মনোবিজ্ঞান লাগে না।
২০২৫ সালের এপ্রিল মাসে এই সমস্যাটির একটি বিরল প্রযুক্তিগত উদাহরণ সামনে এসেছিল। একটি বৃহৎ ভাষা-ভিত্তিক এআই-এর সংস্করণে অস্বাভাবিক মাত্রায় সম্মতিসূচক আচরণ দেখা যায়। ব্যবহারকারীর বক্তব্যকে প্রশ্ন করার বদলে যন্ত্র কখনো অতিরিক্ত প্রশংসা করছিল, সন্দেহকে সমর্থন করছিল, রাগকে আরও উসকে দিচ্ছিল। নির্মাতা সংস্থা পরে সেই সংস্করণ ফিরিয়ে নেয় এবং জানায়, ব্যবহারকারীর স্বল্পমেয়াদি প্রতিক্রিয়াকে বেশি গুরুত্ব দেওয়ার ফলে মডেলটি এমন একদিকে সরে গিয়েছিল যেখানে ‘সহায়ক’ হওয়ার চেষ্টা ‘অতিরিক্ত সম্মতিসূচক’ হয়ে উঠেছিল। ঘটনাটি প্রযুক্তিবিদদের জন্য শুধু একটি সফটওয়্যার ত্রুটি ছিল না, মনোবিজ্ঞানের দিক থেকে এটি ছিল অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ একটি ধাপ। কারণ মানুষের সঙ্গে কথা বলা একটি যন্ত্রের সবচেয়ে বিপজ্জনক রূপ সবসময় ভুল তথ্য দেওয়া নয়। আসল বিপদ হল, কখনো কখনো সে এমনভাবে আপনার মনমতো কথা বলে যে আপনি আর তার কথাকে সন্দেহ করতে চান না।
এখানে ‘সাইকোফ্যান্সি’ বা অতিরিক্ত তোষামোদপ্রবণতার কথা আসে। মানুষ জানে, তোষামোদকারী বন্ধুর কথা সাবধানে শুনতে হয়। কিন্তু যন্ত্রকে আমরা সেই সন্দেহের চোখে দেখি না। কারণ যন্ত্রের কোনো ব্যক্তিগত স্বার্থ নেই, এটাই আমাদের ধারণা। অথচ যন্ত্র কীভাবে উত্তর দেবে, তা নির্ভর করে তার প্রশিক্ষণ, নির্দেশ, নকশা এবং ব্যবহারকারীর প্রতিক্রিয়ার উপর। অর্থাৎ যন্ত্রের ভদ্রতা প্রকৃতির দান নয়, সেটিও তৈরি করা আচরণ। ২০২৫ সালের ওই ঘটনার পর নির্মাতা সংস্থাটি জানায়, ব্যবহারকারীদের দেওয়া প্রতিক্রিয়ার কিছু সংকেত মডেলের আচরণকে এমন দিকে ঠেলে দিয়েছিল, যেখানে দীর্ঘমেয়াদি সুস্থতার চেয়ে তাৎক্ষণিকভাবে ব্যবহারকারীকে খুশি করার প্রবণতা বেশি ছিল।
২০২৬ সালে ‘জার্নাল অব মেডিকেল ইন্টারনেট রিসার্চ’-এ প্রকাশিত গবেষণায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ১,০০৩ জন তরুণ প্রাপ্তবয়স্ককে নিয়ে সমীক্ষা করা হয়। গবেষণাটিতে ২৬৭ জন একটি নির্দিষ্ট পরীক্ষায় সাইকোসিসের ঝুঁকির গোষ্ঠীতে পড়েছিলেন। দিনে একাধিকবার ব্যবহার, দিনে ৩০ মিনিটের বেশি ব্যবহার বা দিনে ছ’টি বা তার বেশি কথোপকথনের মতো ক্ষেত্রে উচ্চঝুঁকির গোষ্ঠীর সম্পর্ক বেশি ছিল। বিভিন্ন ব্যবহারের মাপকাঠিতে সম্ভাবনার অনুপাত ছিল প্রায় ১.৭০ থেকে ২.৫৬। একই গবেষণায় দেখা যায়, সামাজিক ও আবেগগত সহায়তার জন্য যন্ত্রকে বন্ধু, সঙ্গী, চিকিৎসক বা প্রেমিক-প্রেমিকার মতো মানবিক ভূমিকায় দেখার প্রবণতাও বেশি ছিল। সেক্ষেত্রে সম্ভাবনার অনুপাত প্রায় ১.৭৬ থেকে ৩.০৮। এই সংখ্যাগুলির পাশে একটি বড়ো সতর্কচিহ্ন বসাতে হবে। গবেষণাটি ছিল এককালীন সমীক্ষা। ফলে বলা যায় না যে, এআই ব্যবহারের ফলে মানুষ সাইকোসিসের দিকে যাচ্ছে। উলটোটিও সম্ভব। যাদের আগে থেকেই মানসিক যন্ত্রণা, সামাজিক বিচ্ছিন্নতা বা বাস্তবতা-বিচারের সমস্যা আছে, তারাই হয়তো বেশি করে যন্ত্রের সঙ্গে কথা বলছেন। গবেষকরাও বলছেন, এই তথ্য ক্ষতি বা উপকার, কোনোটিই কারণ হিসাবে প্রমাণ করে না। তবে একটি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য মিলেছে। সাইকোসিসের ঝুঁকিতে থাকা তরুণদের মধ্যে এআই-এর সঙ্গে ভ্রান্তবিশ্বাস সম্পর্কিত কথোপকথন মোটেও বিরল নয়। কিছু মানুষ আবার যন্ত্রের সঙ্গে বিশেষ বার্তা, পৃথিবীর প্রকৃত স্বরূপ, অন্যের দ্বারা নিপীড়ন, ষড়যন্ত্র বা নিজেকে নিয়েও আলোচনা করেছেন।
একটি নতুন প্রযুক্তি যখন মানুষের চিন্তা, নিঃসঙ্গতা, বিশ্বাসের সঙ্গে এত ঘনিষ্ঠভাবে জড়িয়ে যাচ্ছে, তখন তার প্রভাব নিয়ে গবেষণা হওয়া জরুরি। ২০২৬ সালের একটি পর্যালোচনাতেও গবেষকেরা সম্ভাব্য একটি চক্রর কথা আলোচনা করেছেন— ব্যবহারকারীর একটি বিশ্বাস, সেই বিশ্বাসকে কেন্দ্র করে যন্ত্রের সঙ্গে কথোপকথন, যন্ত্রের অতিরিক্ত সম্মতি বা ভুল তথ্য, তারপর সেই বিশ্বাসের আরও দৃঢ়তা, এবং শেষে আরও বেশি কথোপকথন। তবে ওই গবেষকরা সতর্ক করেছেন, যন্ত্রের এমন আচরণকে কোনো ‘ইচ্ছা’ বা ‘চেতনা’ হিসাবে দেখা উচিত নয়। যন্ত্র কোনো ষড়যন্ত্রে অংশ নিচ্ছে না, আপনাকে পছন্দও করছে না, ঘৃণাও করছে না, সে ভাষার পরিসংখ্যানগত কাঠামো থেকে উত্তর তৈরি করছে। অথচ মানুষের মস্তিষ্ক সেই উত্তরের ভিতরের উদ্দেশ্য খুঁজে নেয়। এখানেই প্রযুক্তি ও মনস্তত্ত্বের সংঘর্ষ।
আমাদের সময়ের সবচেয়ে অদ্ভুত নিঃসঙ্গতাটি হয়তো এই যে, মানুষ এখন একা থেকেও একা নয়। তার পাশে কেউ নেই, অথচ ফোনের পর্দায় সারাক্ষণ একটি কণ্ঠ আছে। সে শুভরাত্রি বলতে পারে। প্রেমের চিঠি লিখে দিতে পারে। চাকরির সাক্ষাৎকারের আগে সাহস জোগাতে পারে। কোনো বন্ধুর সঙ্গে ঝগড়া হলে কে ঠিক, কে ভুল, তা বিশ্লেষণ করতে পারে। এই সমস্ত ক্ষমতার মধ্যে কোনোটিই বিপজ্জনক নয়। বরং এগুলির অনেকগুলি মানুষের জীবনকে সহজ, সঙ্গত এবং কখনো কখনো সহনীয় করতে পারে। বিপদ শুরু হয় অন্য জায়গায়। যখন সহায়ক প্রযুক্তি ধীরে ধীরে সম্পর্কের বিকল্প হয়ে ওঠে। কারণ মানুষের সম্পর্কের একটি মৌলিক বৈশিষ্ট্য হল অসম্মতি। বন্ধু আপনাকে থামায়। মা বলেন, ‘তুই ভুল করছিস।’ আমরা রেগে যাই। মানুষের সম্পর্কের এই ঘর্ষণ কখনো কখনো অসহ্য। অথচ সেই ঘর্ষণই আমাদের বাস্তবতার সঙ্গে বেধে রাখে।
একটি যন্ত্রের কাছে আমরা চাই অনন্ত ধৈর্য, নিখুঁত সহানুভূতি এবং ব্যক্তিগত মনোযোগ। কিন্তু সুস্থ মানসিকতার জন্য হয়তো আমাদের মাঝে মাঝে একটি অস্বস্তিকর প্রশ্নও দরকার— যেমন, ‘তুমি কি নিশ্চিত?’ এই প্রশ্নটি এআই-এর ভবিষ্যৎ নকশার অন্যতম বড়ো পরীক্ষা হতে পারে। একজন ব্যবহারকারী যদি বলেন, ‘আমি নিশ্চিত সবাই আমার বিরুদ্ধে’, তখন যন্ত্রের কাজ কি তাকে সান্ত্বনা দেওয়া, নাকি তার বিশ্বাসকে বিনয়ের সঙ্গে প্রশ্ন করা? যদি কেউ বলেন, ‘শুধু তুমিই আমাকে বোঝো’, তখন যন্ত্রের উত্তর কি হবে? ‘আমি সবসময় আছি’, নাকি ‘আপনার পরিচিতদের সঙ্গে এনিয়ে কথা বলা গুরুত্বপূর্ণ?’
এই প্রশ্নগুলির উত্তর শুধু প্রযুক্তিবিদদের হাতে ছেড়ে দেওয়া যায় না। মনোরোগ চিকিৎসক, মনোবিজ্ঞানী, দার্শনিক, সমাজবিজ্ঞানী, আইনজ্ঞ, শিক্ষক, সবাইকে এই আলোচনায় আসতে হবে। কারণ এআই শুধু কম্পিউটারের বিষয় নয়। এটি মানুষের আত্মকথনের অংশ হয়ে উঠছে। আজ যে তরুণ রাতে নিজের সবচেয়ে গোপন কথাটি বন্ধুকে না বলে যন্ত্রকে বলছে, সে আগামী দশ বছরে নিজের আত্মপরিচয় কীভাবে তৈরি করবে? যে বৃদ্ধ একাকিত্বে যন্ত্রের সঙ্গে প্রতিদিন ঘণ্টাখানেক কথা বলছেন, তার জন্য এই সম্পর্ক কি সঙ্গ, না নির্ভরতা? আর যে মানুষ ইতিমধ্যেই বাস্তবতা নিয়ে টলমল করছেন, তার সামনে যদি এমন এক কথোপকথন-সঙ্গী থাকে যে কখনো ঘুমোয় না, ক্লান্ত হয় না ও প্রায় সব বিষয়েই উত্তর দিতে পারে, তার প্রভাব কত দূর যেতে পারে?
ভারতের জন্য প্রশ্নটি আরও গভীর। আমাদের দেশে মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে সামাজিক সংকোচ এখনও বাস্তব, আর চিকিৎসা-পরামর্শের নাগাল সবার সমান নয়। ফলে নিজের সমস্যার কথা একটি যন্ত্রের কাছে বলা অনেকের কাছেই সহজ হতে পারে। বিভিন্ন ভারতীয় ভাষায় এআই-এর সঙ্গে মানুষের কথোপকথন যত বাড়বে, এই সম্ভাবনাও বাড়বে। কলকাতার একটি পুরানো বাড়ির ছোটো ঘরে বসে থাকা একজন মানুষ এবং ক্যালিফোর্নিয়ার একটি প্রতিষ্ঠানের তৈরি যন্ত্রের মধ্যে তখন দূরত্ব থাকবে না। থাকবে একটি পর্দা। সেই পর্দার ওপারে কোনো মানুষ নেই— কিন্তু মানুষের ভাষা আছে। আর মানুষের ভাষাই তো মনের সবচেয়ে গভীর দরজাগুলির একটি।
তাই ভবিষ্যতের এআইকে শুধু আরও বুদ্ধিমান করলেই চলবে না। আরও দায়িত্বশীল করতে হবে। তাকে জানতে হবে কখন উত্তর দিতে হয়, কখন প্রশ্ন করতে হয়, কখন অনিশ্চয়তা স্বীকার করতে হয়এবং কখন বলতে হয়—‘এই মুহূর্তে একজন মানুষের সঙ্গে কথা বলা আপনার জন্য বেশি জরুরি।’ মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য তৈরি বিশেষ ব্যবস্থাগুলির ক্ষেত্রে নিরাপত্তা, চিকিৎসাবিদ্যার তত্ত্বাবধান এবং যথাযথ সীমারেখা প্রয়োজন। সাধারণ কথোপকথন-যন্ত্রকে চিকিৎসক ভাবা যেমন ভুল, তেমনই তাকে শয়তান ভাবাও ভুল। সে একটি শক্তিশালী নতুন মাধ্যম। ছুরি দিয়ে ফল কাটা যায়, আবার আঘাতও করা যায়। কিন্তু এআই-এর সমস্যা আরও সূক্ষ্ম, কারণ তার ধারটি দৃশ্যমান নয়। তার ধার ভাষার ভিতরে। শেষ পর্যন্ত এই গল্পটি এআই-এর যতটা, মানুষেরও ততটাই। বরং হয়তো বেশি। কারণ যন্ত্র আমাদের নতুন কোনো দুর্বলতা শেখায়নি। সে আমাদের পুরানো দুর্বলতাগুলির সামনে একটি অত্যন্ত পালিশ করা আয়না ধরেছে। আমরা প্রশংসা পেতে ভালোবাসি। নিজের বিশ্বাসের সমর্থন খুঁজি। আমরা নিজের সঙ্গে কথা বলি। আমরা কাকতালীয় ঘটনার মধ্যে অর্থ খুঁজি। আমরা চাই কেউ আমাদের বুঝুক। এআই সেই আকাঙ্ক্ষাগুলিকে অত্যন্ত দ্রুততায়, ব্যক্তিগত পরিসরে ফিরিয়ে দিতে পারে।
এর পরেও কেউ কোনো শহরে, কোনো অচেনা ঘরে, হয়তো পর্দার দিকে তাকিয়ে লিখবে— ‘তুমি কি মনে করো, আমি ঠিক ভাবছি?’ এই প্রশ্নটির উত্তর দেওয়ার ক্ষমতা হয়তো ভবিষ্যতের যন্ত্রের সবচেয়ে বড়ো বুদ্ধিমত্তার পরীক্ষা হবে না। বড়ো পরীক্ষা হবে, সে কি প্রয়োজনমতো বলতে পারবে—‘আমি জানি না’ বা ‘তুমি হয়তো ভুলও হতে পারো।’ আর সবচেয়ে মানবিক পরীক্ষা— সে কি এমন এক মুহূর্তে মানুষটিকে পর্দা থেকে মুখ তুলে জানলার বাইরে তাকাতে বলবে, যেখানে রাতের অন্ধকারে এখনও একটি গাছ আছে, একটি পাখি আছে, কোনো দূরের বাড়িতে আলো জ্বলছে, কোনো মানুষ হয়তো অন্য একটি মানুষের হাত ধরে আছে? কারণ পৃথিবী এখনও আমাদের সঙ্গে সবসময় একমত নয়। সত্যের সবচেয়ে অস্বস্তিকর সৌন্দর্য সম্ভবত এই যে, সে আমাদের মনমতো হওয়ার জন্য বাধ্য নয়। আর হয়তো সেই অসম্মতির ভিতরেই রয়েছে মানুষের সুস্থ থাকার শেষ আশ্রয়।
• গ্রাফিক্স : সোমনাথ পাল
• সহযোগিতায় : উজ্জ্বল দাস