গত ২১ নভেম্বর ছিল বিশ্ব টেলিভিশন দিবস। যোগাযোগ ও বিশ্বায়নে টেলিভিশনের ভূমিকা সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধির জন্য বিশ্ব টেলিভিশন দিবস পালিত হয়। টেলিভিশন বা টিভি আমাদের প্রত্যেকের জীবনের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। এটার মাধ্যমে আমরা খেলা দেখি, কার্টুন দেখি, সিনেমা দেখি, খবর দেখি। দেখি আরও অনেক কিছু। টেলিভিশন জনমানুষের মধ্যে তথ্য সরবরাহের ক্ষেত্রে খুব গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। জাতিসংঘ ১৯৯৬ সালের ২১ ও ২২ নভেম্বর প্রথম বিশ্ব টেলিভিশন ফোরামের আয়োজন করে। সেই ঘটনাটিকে স্মরণ করার জন্য ২১ নভেম্বর তারিখটিকে বিশ্ব টেলিভিশন দিবস হিসেবে ঘোষণা করা হয়।
ছোট্ট বন্ধুরা, তোমরা কি জানো টেলিভিশন বা টিভি কে আবিষ্কার করেছিলেন? আর প্রথম যুগে এটা কেমন দেখতে ছিল? মোটেই এখনকার মতো সুন্দর ছিল না। আজকে বলব সেই গল্পই।
১৮৬২ সালে তারের মাধ্যমে প্রথম স্থির ছবি পাঠানো সম্ভব হয়। এরপর বিজ্ঞানী মে ও স্মিথ ১৮৭৩ সালে প্রথম ইলেকট্রনিক সিগন্যালের মাধ্যমে ছবি পাঠানোর পদ্ধতি আবিষ্কার করেন। তবে প্রথম টেলিভিশন আবিষ্কার করেন বিজ্ঞানী জন লগি বেয়ার্ড। একসময় লন্ডন শহরের সোহো অঞ্চলে ভাড়া বাড়িতে থাকতেন স্কটিশ বিজ্ঞানী বেয়ার্ড। সেই সময়ই ১৯২৫ সালের ২ অক্টোবর টেলিভিশনের জন্ম। তিনি প্রথমে একজন ভেন্ট্রিলোকুইস্টের ডামির মুখের একটি প্রতিচ্ছবি তৈরি করেছিলেন, যার নাম দিয়েছিলেন স্টুকি বিল।
জন লগি বেয়ার্ডের জন্ম ১৮৮৮ সালের ১৩ আগস্ট। তিনি কলেজে পড়ার সময় প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শুরু হয়। সেই সময় ব্রিটিশ সেনাবাহিনীতে স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে যোগ দিয়েছিলেন। অসুস্থতার কারণে তাঁকে সেনাবাহিনী থেকে অযোগ্য মনে করে বাদ দেওয়া হয়। এরপর তিনি ক্লাইড ভ্যালি ইলেকট্রিক্যাল পাওয়ার কোম্পানিতে যোগ দেন। এই কোম্পানি যুদ্ধাস্ত্র তৈরি করত।
১৯২৩ সালের গোড়ার দিকে বেয়ার্ড অসুস্থতার কারণে ইংল্যান্ডের দক্ষিণ উপকূলে অবস্থিত হেস্টিংসের ২১ লিন্টন ক্রিসেন্টে চলে আসেন। সেই সময় তিনি একটি পুরনো টুপি, একটি ছিদ্রযুক্ত স্পিনিং কার্ডবোর্ড ডিস্ক, এক জোড়া কাঁচি, কিছু সুচ, কয়েকটি সাইকেলের আলোর লেন্স, একটি চায়ের বাক্স, মোম এবং আঠা দিয়ে বিশ্বের প্রথম কার্যকর টেলিভিশন সেট তৈরি করেন।
বেয়ার্ড ১৯২৪ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে রেডিও টাইমসকে দেখিয়েছিলেন যে, একটি আধা-যান্ত্রিক অ্যানালগ টেলিভিশনের মাধ্যমে চলমান শিল্যুয়েট ছবি প্রেরণ করা সম্ভব। সেই বছরেই জুলাই মাসে তিনি বিদ্যুৎপৃষ্ঠ হন। তাঁর একটি হাত পুড়ে যায়। এই ঘটনার জন্য তাঁর বাড়িওয়ালা বেয়ার্ডকে ঘর খালি করে দিতে বলেন।
এরপর বেয়ার্ড লন্ডনের সোহোতে একটি চিলেকোঠা ভাড়া করে চলে আসেন। তারপরই তিনি প্রথম সফলভাবে টেলিভিশনে স্টুকি বিলের ছবি সম্প্রচার করেন। প্রতি সেকেন্ডে পাঁচটি স্ক্যান করা সাদা-কালো ছবি লম্বালম্বি ভাবে টেলিভিশনের পর্দায় ফুটে ওঠে। বেয়ার্ড নীচে দৌড়ে গিয়ে কুড়ি বছর বয়সি উইলিয়াম এডওয়ার্ড টেইনটনকে নিয়ে আসেন একজন মানুষের মুখ টেলিভিশনের পর্দায় কেমন হবে তা দেখার জন্য। টেইনটন প্রথম ব্যক্তি, যাঁকে প্রথম টেলিভিশনে দেখানো হয়।
বৈজ্ঞানিক স্বীকৃতির জন্য বেয়ার্ড ১৯২৬ সালের ২৬ জানুয়ারি ফ্রিথ স্ট্রিটে টেলিভিশনের প্রথম আনুষ্ঠানিক প্রদর্শনী করেন, যাতে প্রমাণ করা যায় যে, তাঁর সিস্টেম সফলভাবে ছবি প্রেরণ এবং
গ্রহণ করে।
রয়েল ইনস্টিটিউশনের বিশিষ্ট সদস্যদের স্টুকি বিলের ছবিটির সম্প্রচার দেখানো হয়েছিল। এইভাবেই তৈরি হয় টেলিভিশন।
তবে জন লগি বেয়ার্ড টেলিভিশন আবিষ্কার করলেও টেলিভিশনের জনক হিসেবে আরও একজনের নাম উল্লেখ করতে হয়। তাঁর নাম ফিলো ফার্নসওয়ার্থ। তিনি হলেন প্রথম ইলেকট্রনিক টেলিভিশনের উদ্ভাবক।
আর রুশ বংশোদ্ভূত আইজ্যাক শোয়েনবারগের কৃতিত্বে ১৯৩৬ সালে প্রথম টিভি সম্প্রচার শুরু করে বিবিসি। টেলিভিশন বাণিজ্যিক ভিত্তিতে চালু হয় ১৯৪০ সালে।
প্রথম টেলিভিশন সম্প্রচার অনুষ্ঠানে কমেডি ও গানের সংক্ষিপ্ত অংশ ১৯২৯ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর সম্প্রচারিত হয়েছিল। দুই মিনিটের ব্যবধানে শব্দ এবং ছবি পৃথকভাবে সম্প্রচারিত হয়েছিল। যেহেতু শব্দের তুলনায় আলোর গতি বেশি, তাই একসঙ্গে শব্দ আর ছবি আসছিল না। রেজিলিউশনও খুব কম ছিল। প্রথমদিকের টেলিভিশনের পর্দায় লম্বা লম্বা লাইনের মাধ্যমে দেখানো হতো। যত বেশি লাইন তত ভালো রেজিলিউশন। বেয়ার্ডের তৈরি টেলিভিশনে ৩০টি লাইন ছিল। পরবর্তীকালে অ্যানালগ টেলিভিশনের ক্ষেত্রে যা গিয়ে দাঁড়ায় ৪০৫ থেকে ৬২৫টি লাইনে।
অবশেষে ১৯৩০ সালের ১৪ জুলাই তিনি ছবি এবং শব্দ একসঙ্গে সম্প্রচার করতে সক্ষম হন। সেটি ছিল ‘দ্য ম্যান উইথ আ ফ্লাওয়ার ইন হিজ মাউথ’ নামের একটি স্বল্পদৈর্ঘ্যের নাটক। যার বিষয়বস্তু ছিল একটি কাফেতে বসা একজন ক্যান্সার আক্রান্ত ব্যক্তি এবং ট্রেন মিস করা একজন ব্যবসায়ীর মধ্যে কথোপকথন। এই নাটকটি অভিনেতারা সরাসরি টেলিভিশনের জন্য অভিনয় করেছিলেন। এটি কোনও রেকর্ড করা নাটক ছিল না। তখন সব সরাসরি করতে হতো। এই নাটকের পরিচালনা করেছিলেন বিবিসির তৎকালীন রেডিও নাটকের প্রধান ভ্যাল গিলগুড এবং প্রযোজনা করেছিলেন ল্যান্স সিভেকিং। এই নাটকের সময়সীমা ছিল ৩০ মিনিটেরও কম। আর অভিনেতার সংখ্যা ছিল মাত্র তিনজন।
প্রথমদিকের টেলিভিশনের দাম ছিল ৬০ পাউন্ড, যা এখনকার হিসেবে ৪ হাজার পাউন্ডেরও বেশি। তাহলে বুঝতেই পারছ, সেই সময় টেলিভিশন খুব দামি একটি যন্ত্র ছিল।