Bartaman Logo
২৯ জুন, ২০২৬
বর্তমান / সম্পাদকীয়

গীতার অন্তর্নিহিত অর্থ

গীতার অন্তর্নিহিত অর্থ ও কৃষ্ণের ব্যাখ্যা নিয়ে আলোচনা। বাঁচার আনন্দের গুরুত্ব এবং সৃষ্টির স্তর সম্পর্কে জানুন। বিস্তারিত পড়ুন।

গীতার অন্তর্নিহিত অর্থ
  • ২৯ জুন, ২০২৬ ০৪:০০
Prefer us on Google

গীতার অন্তর্নিহিত অর্থ সম্বন্ধে বলতে গিয়ে বাধ্য হয়ে গিয়ে কিছুটা মুখবন্ধ করতে হ’ল। গীতা সম্বন্ধে বলা হয়েছে, ‘যা ভগবতা গীতা সা গীতা’। এখানে কৃষ্ণ প্রসঙ্গ এসে গেল আর সেই ‘কৃষ্ণ’ শব্দের কয়েকটি ব্যাখ্যা দেওয়া হ’ল। ‘কৃষ্ণ’ শব্দের যে বিভিন্ন ধরণের ব্যাখ্যা রয়েছে, সেগুলো যে শেষে এক বিন্দুতে এসে মিলেছে তাও বলতে হবে। ‘কৃষ্ণ’ শব্দের আরও মানে আছে। যেমন ভগবান আর কৃষ্ণ অভিন্ন। এই ‘ভগবান’ শব্দের অর্থ কী? সংস্কৃতে এমন শব্দ আছে যেক্ষেত্রে শব্দটা আমরা সংক্ষেপে ব্যবহার করি, তবে মানেটা খুব বড়। ‘ভগবান’ শব্দের মুখ্যতঃ দুটো ব্যাখ্যা রয়েছে। তার একটা হ’লঃ ‘ভ’ শব্দের মানে ‘ভেতি ভাসয়তে সর্বাণ লোকান্‌’। এখানে ‘লোক’ মানে কী? বাংলা ভাষায় ‘লোক’ মানে মানুষ। যখন বলি একজন লোক যাচ্ছে, তার মানে একজন মানুষ যাচ্ছে। মারাঠীতেও ‘মানুষ’ বলি, অসমিয়াতে ‘মানু’ বলি। সংস্কৃতে ‘লোক’ মানে স্তর (layer/stratum)। সপ্ত লোক মানে বিকাশের সাতটি স্তর। এই যে সাতটি স্তর—এরা তৈরী হয়েছে ব্রহ্মা থেকে স্থূলতম জড় পর্যন্ত—আব্রহ্মস্তব। এখানে ‘ব্রহ্ম’ শব্দটা পরম ব্রহ্ম অর্থে নয়। এখানে শব্দটা ব্রহ্মা অর্থে ব্যবহার করা হয়েছে। ব্রহ্মা মানে সৃষ্টিকর্তা। অব্যয়ে ও বিশেষণে ‘আ’-কারের অবলুপ্তি ঘটে। যেমন যে গাছের অনেক শাখা তাকে ‘বহুশাখা’ বলি না, বলি ‘বহুশাখ’। ‘আ’-কারটা লুপ্ত আছে। বিশেষণ হলেও তেমনি ‘আ’-কারটা লুপ্ত হয়। ব্রহ্ম এখানে পরম ব্রহ্ম নয়।

Advertisement

‘আব্রহ্মস্তব ব্রহ্ম’। সৃষ্টিকর্তা ব্রহ্মা থেকে শুরু করে স্তব বা ঘাসের পাতা পর্যন্ত সবই ব্রহ্মময়। এই যে সৃষ্টিকর্ত্তা ব্রহ্মা (ব্রহ্ম+অ=ব্রহ্মা। ‘অ’ মানে সৃষ্টিকর্ত্তা। তুমি একতাল মাটি নিয়ে একটা পুতুল গড়ছ, তুমি সৃষ্টি কার্যে রত রয়েছ। এই যে সৃষ্টিকার্য, এর বীজমন্ত্র হ’ল ‘অ’। পরম ব্রহ্ম যখন সৃষ্টিকার্যে রত রয়েছেন তখন ‘ব্রহ্ম’ শপব্দের শেষে ‘অ’ যোগ করে ‘ব্রহ্মা’ হয়ে যাচ্ছে অর্থাৎ পরম ব্রহ্ম যখন সৃষ্টি করেন তখন তাঁর নাম ব্রহ্মা), ইনি কোন আলাদা সত্তা নন। পরম ব্রহ্ম যখন তৈরী করছেন তখন তাঁকে বলি ব্রহ্মা। যেমন রামবাবু। তিনি একজন স্কুলের শিক্ষক। রামবাবু ও শিক্ষক দু’টো আলাদা সত্তা নয়। ওই একই রামবাবু যখন বেত হাতে ক’রে স্কুলে বসেন তখন লোকে তাঁকে মাষ্টার বলে। তিনি আলাদা কেউ নন।
সৃষ্টির সূক্ষ্মতম স্ত্র থেকে স্থূলতম স্তর পর্যন্ত সবাই যে বেঁচে আছে, কেন বেঁচে আছে? বাঁচার আনন্দে বেঁচে আছে। বাঁচার আনন্দ না থাকলে কেউ থাকত না। যে ভাবেই হোক পৃথিবী ছেড়ে চলে যেত, থাকত না। তবে আছে কেন? থাকার আনন্দ পায় এই জন্যে; নচেৎ কেউ থাকত না। ‘ভাসয়তে সর্বাণ লোকানিতি’। অর্থাৎ এই সপ্ত স্তরকে তিনি উজ্জ্বল করছেন, ঝলমল করে তুলছেন, ঝকমকিয়ে তুলছেন আর সেই ঝলমলানির আনন্দে সবাইকার প্রাণ নেচে চলেছে। সবাই চাইছে—বাঁচব, নাচব, কাজ করব, দেখব পাব, আর পরম ব্রহ্মের কাছে যাব, গিয়ে আনন্দে মিশে থাকব। এই যে বাঁচা, এই বাঁচার নাম হ’ল আনন্দ। এই আনন্দটা আছে বলেই পৃথিবীটা আছে। আর এই আনন্দটা যদি না থাকত, তা হ’লে সৃষ্টি থাকত না।
“ন বা অরে পত্যুঃ কামায় পতিঃ প্রিয়ো ভবতি
আত্মনস্তু কামায় পতিঃ প্রিয়ো ভবতি”।
শ্রীশ্রীআনন্দমূর্ত্তির ‘কৃষ্ণতত্ত্ব ও গীতাসার’ থেকে

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ