Bartaman Logo
২৮ জুন, ২০২৬
বর্তমান / সম্পাদকীয়

পেট্রলের দাম কমানো কেন জরুরি?

পেট্রলের দাম কমানো জরুরি, নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বাড়ছে। সরকারের উদাসীনতা সাধারণ মানুষের জীবনকে দুর্বিষহ করছে। বিস্তারিত পড়ুন।

পেট্রলের দাম কমানো কেন জরুরি?
  • ২৮ জুন, ২০২৬ ০৪:০০
Prefer us on Google

রাজনীতির ওঠাপড়া

Advertisement

হিমাংশু সিংহ: বদলের জমানায় সবাই স্বপ্ন দেখাচ্ছে। প্রতিশ্রুতির বন্যা ছোটাচ্ছে দিনভর। দুর্গাপুর, শিলিগুড়ির জোড়া মেট্রোরেল, উত্তরবঙ্গে এইমস, আইআইএমের মতো ষোলোআনা কেন্দ্রীয় প্রকল্পের ঘোষণাও রাজ্য বাজেটে স্থান পাচ্ছে গৌরবে বহুবচনের অনিবার্য মৌতাতে। কিন্তু এসবের মাঝেই খাদ্যদ্রব্য থেকে শুরু করে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম যেভাবে লাফিয়ে বাড়ছে, তা নিয়ে কারও কোনো মাথাব্যথা আছে বলে মনে হচ্ছে না। রিজার্ভ ব্যাংকের গভর্নর সঞ্জয় মালহোত্রা দু’দিন আগেই স্পষ্ট করেছেন, এখনই দামবৃদ্ধির নাগপাশ থেকে মুক্তি নেই। এল নিনোর প্রভাবে জুন মাসে যেভাবে বৃষ্টির ঘাটতি রয়েছে তাতে ফসল উৎপাদন মার খেলে পরিস্থিতি আরও শোচনীয় হবে। তাঁর কথায় বিপদের ইঙ্গিত। দেশের গড় বৃষ্টিপাতে ৪২ শতাংশ ঘাটতি। জুলাই-আগস্টে বর্ষার পরিমাণ না বাড়লে বিপদ বাড়তে বাধ্য। যেকোনো সমাজেই সবার হাতে কাজ থাকলে, রোজগার বাড়লে মূল্যবৃদ্ধির ধাক্কা মানুষ সহজেই সামলে ওঠে। কিন্তু যে-সমাজে বেকার সংখ্যা লাফ দিয়ে বাড়ছে, কর্মসংস্থান থমকে, সেখানে দাম বৃদ্ধির অর্থ সাধারণের সর্বনাশ! শুধু দল ভেঙে আর আইন পাশ করে ওই সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়। 
আজ দেশের স্নাতকদের মাত্র ৭ শতাংশ 
স্থায়ী চাকরি করে। কৃষক আত্মহত্যা বন্ধ হয়নি। এর উপর দ্রব্যমূল্যবৃদ্ধি গরিবের জীবনকে দুর্বিষহ করে তুলেছে। মোদিজির ১২ বছরের শাসনে পেট্রল ও ডিজেলের দাম বেড়েছে যথাক্রমে ৪৪ ও ৭৩ শতাংশ। গত একমাসে দফায় দফায় জ্বালানির দামবৃদ্ধি অর্থনীতিকে বিরাট চ্যালেঞ্জের মুখে দাঁড় করিয়েছে। এক ডলারের মূল্য ১২ বছরে ৬০ টাকা থেকে বেড়ে আজ ৯৫ টাকার আশপাশে ঘুরপাক খাচ্ছে। আশঙ্কা শীঘ্রই তা ১০০ ছাড়াবে। 
ইরান যুদ্ধ এবং হরমুজ প্রণালী বন্ধ হওয়ার ফলে একমাসের মধ্যে চারবার তেলের দাম বেড়েছে। যুদ্ধের তীব্রতা কমে পরিস্থিতি যখন স্বাভাবিক হওয়ার পথে, লাফিয়ে পেট্রপণ্যের দাম বাড়ল তখনই। দেরি করে দামবৃদ্ধির কারণ বাংলা সহ পাঁচ রাজ্যের ভোট। ৪ মে ফল বেরনোর অব্যবহিত পরেই মাত্র  দশদিনে ১০৫ টাকা থেকে বেড়ে এক লিটার পেট্রল আজ ১১৩ টাকা ছাড়িয়েছে। ডিজেলের দামও পাল্লা দিয়ে ঊর্ধ্বমুখী। বেড়েছে লিটারে সাড়ে ৭ টাকা। বাদ যায়নি প্রতিটি গৃহস্থের রোজ সকালে প্রথম যেটা দরকার সেই রান্নার গ্যাসও। ৮২৯ টাকা থেকে বেড়ে এলপিজি সিলিন্ডারের দাম ৯৬৮ টাকা। তেল ও গ্যাসের এই জোড়া ধাক্কায় সর্বপ্রকার নিত্যপণ্যের মূল্যবৃদ্ধি অনিবার্য। ধনীরা ধাক্কাটা সহজে মানিয়ে নিলেও দিনমজুর গরিবের পেটে টান পড়তে বাধ্য। মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ পরিস্থিতি অনেকটা স্বাভাবিক হয়ে অশোধিত তেল আন্তর্জাতিক বাজারে যুদ্ধের আগের দরে ঘোরাফেরা করলেও পেট্রলিয়াম মন্ত্রক, সরকারের শীর্ষ মহল এবং তেল সংস্থাগুলি বিস্ময়করভাবে নীরব। দাম কমানোর ব্যাপারে উদ্যোগী নয় কেউ। সংকট সেই কারণেই তীব্র।
দামবৃদ্ধির আগে ভারপ্রাপ্ত মন্ত্রী হরদীপ সিং পুরী বলেছিলেন, তেল কোম্পানিগুলির দৈনিক ক্ষতি নাকি হাজার কোটি ছাড়িয়েছে। সেই কারণেই মূল্যবৃদ্ধি অনিবার্য। এখন আবার ব্রেন্ট ক্রুডের দর ১১০ থেকে কমে ৭২ ডলারের নীচে নেমে গিয়েছে। মাননীয় মন্ত্রী কিন্তু এই মুহূর্তে বিভিন্ন তেল সংস্থার দৈনিক মুনাফার পরিমাণ নিয়ে কোনো কথা বলেননি। বলা বাহুল্য, যুদ্ধের আগে দেশের তেল সংস্থাগুলির সম্মিলিত লাভের পরিমাণ বেড়ে রেকর্ড প্রায় ৭৮ হাজার কোটি টাকা দাঁড়িয়েছিল। তখনও সরকার এই বিপুল মুনাফা নিয়ে মুখ খোলেনি। মানুষ হিমশিম খাবে আর তেল কোম্পানিগুলি লক্ষ কোটি টাকার মুনাফা করবে এই ব্যবস্থা কতদিন চলতে পারে ভারতের মতো গরিব দেশে? সম্ভবত সামনে আর কোনো বড়ো ভোট নেই বলেই পেট্রল ও ডিজেলের দাম কমানো নিয়ে আপাতত সব পক্ষই উদাসীন। পাঞ্জাবের ভোটের এখন ঢের দেরি। হতে পারে আগামী সাতাশ সালে ফের বিভিন্ন রাজ্যের বিধানসভা নির্বাচনের মুখে দাম কমিয়ে মাস্টার স্ট্রোক দেওয়ার কৌশল নিয়েই এগচ্ছে গেরুয়া শিবিরের নেতারা। কিন্তু এই মূল্যবৃদ্ধির সঙ্গে অনাবৃষ্টি যোগ হলে গরিবের অবস্থা শোচনীয় হবে।
পেট্রল-ডিজেলের হিসাব কষা হয় ব্যারেলে। ১ ব্যারেল মানে ১৫৯ লিটার বা ৪২ ইউএস গ্যালন।  বিশ্ব বাজারে তেলের দাম শেয়ার বাজারের মতো প্রতিদিন ওঠে-নামে। বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ কারণের উপর ভিত্তি করেই এই ওঠাপড়া। যুদ্ধ, প্রাকৃতিক দুর্যোগ, বিশ্বজুড়ে রাজনৈতিক উত্তেজনা এবং অর্থনৈতিক সংকট—এগুলো সবই খুব দ্রুত তেলের দাম পরিবর্তন করে দিতে পারে। উদাহরণস্বরূপ, ২০২০ সালে কোভিড-১৯ মহামারীর সময় তেলের চাহিদা একদম কমে গিয়েছিল। তেলের দাম তখন সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে এসেছিল। ওপেক (পেট্রলিয়াম রপ্তানিকারক দেশগুলোর সংগঠন) হল—সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরশাহি এবং ইরাকের মতো প্রধান তেল উৎপাদনকারী দেশগুলির একটি গোষ্ঠী। কী পরিমাণ তেল উৎপাদন করা হবে, তা নির্ধারণ করতে তারা নিয়মিত বৈঠক করে। যদি তারা উৎপাদন কমায়, তেলের দাম বাড়ে। আর যদি উৎপাদন বাড়ায়, দাম কমে যায়। গত ফেব্রুয়ারির পর থেকে মধ্যপ্রাচ্য অগ্নিগর্ভ হয়ে উঠতেই লাফিয়ে দাম বাড়ে। এখন আবার তা আগের অবস্থায়।
রাজনীতির কুশীলবরা সবাই দল ভাঙতে ব্যস্ত। সাধারণের হিমশিম অবস্থার খোঁজ নেয় কে? এক লিটার ভোজ্য তেলের দাম ছুটছে দুশো টাকার দিকে। বোকা বানাতে তেল কোম্পানিগুলি প্যাকেটে পরিমাণ কমিয়ে চোখে ধুলো দিচ্ছে। ১ লিটারের বদলে ৮০০/৮২৫ মিলিলিটারের প্যাকেট বেচছে। সাধারণ ক্রেতা কৌশলটা বুঝতেই পারছে না, মধ্যবিত্ত তাই ১ লিটার বলে কিনে আনছে। চাল, ডাল কোনোটাই সাধ্যের মধ্যে নেই। সবজির বাজারেও বেজায় আগুন। ডিম থেরাপির ঠেলায় ৬ টাকার ডিম আজ বহু জায়গাতেই ৮ টাকা। ডিম কিন্তু ইলিশ কিংবা চিতল মাছ নয়। গরিব মানুষ ডিমটুকুও ছুঁতে পারছেন না। ডিম ছুড়ে কোনোদিন কোনো সমাজে দুর্নীতি কমে না, অপচয়ে শুধু দামই বাড়ে। এই সহজ কথাটাও নেতারা মনে করিয়ে দেওয়ার সময় পাচ্ছেন না।
বয়স বাড়লেই প্রেশার, সুগার, কোলেস্টেরল, হাঁচি-কাশি থেকে কারো পরিত্রাণ নেই। ওষুধের দামবৃদ্ধিও হয়ে চলেছে সবার অলক্ষ্যেই। কোভিডের পর থেকে ওষুধের দাম বেড়েছে কয়েক গুণ। কার্ভল প্লাস এই সেদিনও একটার দাম ছিল ২ টাকা, আজ ১০ টাকা! সাধারণ অ্যান্টিবায়োটিক ক্যাপসুল গড়ে ১৫ থেকে ২০ টাকার নীচে নেই। সাধারণ অ্যালার্জির ওষুধও এক পাতা দুশো টাকা। সুদের টাকায় নুন আনতে পানতা ফুরানো প্রবীণরা এই ঠেলাতেই আরও অন্ধকারে তলিয়ে যাচ্ছেন। একদিকে খরচের চাপ, অন্যদিকে অধিকাংশ রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের সুদ সেই ৬ থেকে ৭ শতাংশের মধ্যে ঘোরাফেরা করছে। আমাদের দেশে সামাজিক নিরাপত্তা কাঠামো যথেষ্ট ভঙ্গুর। স্বভাবতই নিউক্লিয়ার সমাজে প্রবীণ মানুষদের উপর মূল্যবৃদ্ধির চাপ বেশি পড়ে। 
দেশের সরকারের এদিকে খুব নজর আছে বলে কি মনে হয়? বরং সম্পূর্ণ ক্ষমতা ভোগ করতে সবাই চায় বিরোধীদের খতম করতে। ওটাই অগ্রাধিকার। এই অপারেশনে সব দলই প্রায় দু-টুকরো, তিন-টুকরো হয়ে বিপর্যস্ত। বিরোধীরা ছত্রভঙ্গ হলে লাভ শাসকের। পাঞ্জাব, মণিপুর ও গোয়ার বিধানসভা ভোট আগামী মার্চে। তারপর গুজরাত ও উত্তরপ্রদেশ। তাই আন্তর্জাতিক বাজারের তুলনায় দেশি তেল কোম্পানিগুলি দাম বাড়িয়ে রেখে চড়া মুনাফা লুটলেও সরকারের বিশেষ হেলদোল দেখা যাবে না। রিজার্ভ ব্যাংক সতর্ক করেছে এবার বৃষ্টি কম হলে ফসলের উৎপাদন মার খাবে। যার প্রভাব গিয়ে পড়বে খাদ্যদ্রব্যের দামে। আসন্ন উৎসব মরশুমের কেনাকাটায়। বিরোধীদের ভাঙা আর সংসদে বিল পাশের সংখ্যা জোগাড়ের অপারেশনই যদি একটি সরকারের সাফল্যের মাপকাঠি হয়, তাহলে মানতেই হবে মোদিজির কোনো জুড়ি নেই। কিন্তু সেটাই কি দেশের অগ্রগতির একমাত্র সূচক! বাস্তবটা অস্বীকার করে কার সাধ্য? ক্ষমতাই গণতন্ত্রে শেষ কথা বলে না। 
আর দুর্নীতি? রামমন্দির ট্রাস্টে তো একজনও কংগ্রেসি ছিলেন না। ডিএমকে, আপ, আখিলেশের সমাজবাদী পার্টির কেউ ট্রাস্টের সদস্য হয়েছিলেন বলে জানা নেই। ভক্তদের দানের পয়সায় আঙুল ফুলে কলাগাছ হল কাদের? সিসি ক্যামেরা ঢেকে টয়লেট দিয়ে বস্তা বস্তা নগদ টাকা পাচার হয়েছে বলে চাঞ্চল্যকর রিপোর্ট দিয়েছে সিট। সেই অর্থে যাঁরা রিসর্ট, জমি কিনেছেন তাঁদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দিকে তাকিয়ে সমগ্র দেশবাসী। সেখানে বুলডোজার চলবে না কেন? যদি তা না-হয় সাতাশ সালে উত্তরপ্রদেশের বিধানসভা ভোটে মানুষ কিন্তু প্রশ্ন তুলবেই।
আর এক ডবল ইঞ্জিন রাজ্য মধ্যপ্রদেশে জমি কেলেঙ্কারিতে কোনো বিরোধীর নাম কিন্তু জড়ায়নি। আঙুল উঠেছে গেরুয়া পরা তিলক কাটাদের দিকেই। সব দেখেশুনে মনে হয়, দুর্নীতি শব্দটা এদেশে ক্ষমতার অনিবার্য অসুখ। কোথাও কম কোথাও-বা বেশি। দুর্নীতির বিরুদ্ধে লড়তে গিয়ে মূল্যবৃদ্ধির সংকটকে ছোটো করে দেখালে মার খাবে সাধারণ শ্রমজীবী মানুষজনই।  কে না জানে রাজনীতির খেলায় চিরদিনই প্রাণ যায় উলুখাগড়া গরিবের।

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ