Bartaman Logo
২৭ জুন, ২০২৬
বর্তমান / সম্পাদকীয়

বিপুল জয় সত্ত্বেও কেন ঘুরপথে এই দখলদারি?

বিপুল জয় সত্ত্বেও কেন বিজেপি ঘুরপথে পঞ্চায়েত দখলে মরিয়া? তৃণমূলের দুর্নীতি ও বিজেপির পরিকল্পনা নিয়ে বিস্তারিত জানুন।

বিপুল জয় সত্ত্বেও কেন ঘুরপথে এই দখলদারি?
  • ২৭ জুন, ২০২৬ ০৪:০০
Prefer us on Google

তন্ময় মল্লিক: বাংলায় বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে ক্ষমতায় এসেছে বিজেপি। তারপরেও বিজেপি বিভিন্ন পঞ্চায়েত ও জেলা পরিষদের দখল নিতে মরিয়া হয়ে উঠেছে। কলকাতা, বিধাননগর কর্পোরেশন ছাড়াও বহু তৃণমূল কংগ্রেস পরিচালিত পুরসভার কর্তারা পদত্যাগ করেছেন। এঁদের কারোর বিরুদ্ধেই অনাস্থা আনা হয়নি। তবে, সরকার পরিবর্তনের পর কারো কারো বিরুদ্ধে থানায় অভিযোগ জমা পড়েছে। ইঙ্গিত স্পষ্ট, ছাড়তে হবে চেয়ার। অবশ্য যেসব পুরসভার চেয়ারম্যান ‘কাঠের পুতুল’হতে পেরেছেন তাঁরা এখনও আছেন। তবে, কতদিন, বলা কঠিন। পুরসভার পাশাপাশি পঞ্চায়েত, পঞ্চায়েত সমিতি এবং জেলা পরিষদের নিয়ন্ত্রণও নিতে চাইছে বিজেপি। উদ্দেশ্য ‘মধুভাণ্ড’ঝুলিয়ে মৌমাছির ভিড় জমানো।

Advertisement

৪ মে নির্বাচনের ফল প্রকাশের পর তৃণমূলের অধিকাংশ জনপ্রতিনিধিই হয় এলাকা ছেড়ে পালিয়েছেন অথবা গৃহবন্দি। এই পরিস্থিতিতে কর্মীদের সামনে রেখে পঞ্চায়েত চালাচ্ছেন বিজেপি নেতারা। বেশ কিছু পঞ্চায়েতে অনাস্থা আনা হয়েছে। অধিকাংশ বোর্ডই পূর্বতন শাসক দল তৃণমূলের দখলে। বহু পঞ্চায়েত, পঞ্চায়েত সমিতি, এমনকি জেলা পরিষদ বিরোধীশূন্য। যেখানে বিজেপির সদস্য নেই সেখানে তৃণমূলের একটা অংশকে নিজেদের দিকে টেনে নিচ্ছে। তারপর প্রধানের বিরুদ্ধে অনাস্থা আনছে। আর যেখানে বিজেপি সদস্য আছে সেখানে তিনিই হয়ে যাচ্ছেন পঞ্চায়েতের হত্তাকত্তা। 
ইতিমধ্যেই পূর্ব মেদিনীপুর জেলা পরিষদের ক্ষমতা দখল করে নিয়েছে বিজেপি। জেলা পরিষদের ৭০টি আসনের মধ্যে তৃণমূল জিতেছিল ৫৬টি, বিজেপি পেয়েছিল ১৪টি। তৃণমূলের সভাধিপতি এবং সহকারী সভাধিপতি ইস্তফা দিয়েছেন। বিজেপি ১৪টি আসনকে সম্বল করে জেলা পরিষদের ক্ষমতা দখল করেছে। যিনি বিরোধী দলনেতা ছিলেন তিনিই এখন সভাধিপতি। কিন্তু, এটাকে ‘সংখ্যালঘু বোর্ড’বলা যাবে না। বরং বলা ভালো, সর্বসম্মতিক্রমে সভাপতি নির্বাচিত হয়েছেন। সভাধিপতি নির্বাচনের সময় উপস্থিত তৃণমূল এবং বিজেপির সকল সদস্যই তাঁকে দু’হাত তুলে সমর্থন করেছেন। 
শুধু পূর্ব মেদিনীপুর নয়, ঝাড়গ্রাম, নদীয়া, পশ্চিম মেদিনীপুর জেলাতেও সভাধিপতি বদলের তোড়জোড় শুরু হয়ে গিয়েছে। অনাস্থা আনা নিয়ে নদীয়া জেলায় তৃণমূলের মধ্যে প্রবল গোষ্ঠীদ্বন্দ্ব বেঁধে গিয়েছে। ঘুরপথে ক্ষমতা দখলের প্রবণতা ছোঁয়াচে রোগের মতো ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা প্রবল।
এখন প্রশ্ন হচ্ছে, বিধানসভা ভোটে বিপুল সাফল্য পাওয়ার পরেও বিজেপি কেন ‘ব্যাক ডোর’দিয়ে পঞ্চায়েত ও পুরসভা কব্জা করতে উঠেপড়ে লেগেছে! প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি তো নির্বাচনি প্রচারে এসে বারবার বলেছেন, ‘ডবল ইঞ্জিন সরকার’প্রতিষ্ঠিত হলেই বাংলায় ব্যাপক উন্নয়ন হবে। রাজ্যের মানুষ তো তাঁর ডাকে সাড়া দিয়েছে। প্রায় ৫০ বছর পর বাংলায় প্রতিষ্ঠিত হয়েছে ‘ডবল ইঞ্জিন’সরকার। এই পরিস্থিতিতে বিজেপির এবং সরকারের অগ্রাধিকার হওয়ার কথা উন্নয়ন। তার বদলে কেন ঘুরপথে পঞ্চায়েত দখলের এই চেষ্টা? 
পঞ্চায়েতি আইন কংগ্রেস আমলে পাশ হলেও তা বাস্তবায়িত করেছিল বামফ্রন্ট সরকার। বামেদের সৌজন্যেই গ্রামের মানুষ ক্ষমতার স্বাদ পেয়েছিল। সিপিএম পঞ্চায়েত ব্যবস্থাকে শুধু বাস্তবায়িত করেছিল বললে ভুল হবে, পঞ্চায়েতই হয়ে উঠেছিল বাম সরকারের মূল চালিকা শক্তি। বামফ্রন্ট সরকার ক্ষমতায় বসার পর জ্যোতি বসু প্রথম সাংবাদিক সম্মেলনে বলেছিলেন, ‘শুধু রাইটার্স বিল্ডিং থেকে সরকার পরিচালিত হবে না।’ একথা বলে তিনি বোঝাতে চেয়েছিলেন, তাঁরা ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ করতে চান। সেই লক্ষ্যেই পঞ্চায়েত ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করা হয়েছিল। তখন জেলা পরিষদগুলিকে বলা হত ‘মিনি রাইটার্স বিল্ডিং’। 
বিজেপিও কি বামেদের মতো ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণের লক্ষ্যেই পঞ্চায়েত ব্যবস্থাকে নিজেদের নিয়ন্ত্রণে আনতে চাইছে? মোটেই না। বিজেপি এরাজ্যে ক্ষমতায় এসেছে মূলত তৃণমূল কংগ্রেসের দুর্নীতি, স্বজনপোষণ ও অত্যাচারে বীতশ্রদ্ধ মানুষের ভোটে। তার পাশাপাশি ছিল নরেন্দ্র মোদির বেকারদের চাকরি ও বাংলার উন্নয়নের প্রতিশ্রুতি। সেটাই এবার টনিকের কাজ করেছে। তাতেই ক্ষমতায় এসেছে বিজেপি। কিন্তু, তাদের সাংগঠনিক শক্তি এখনও তেমন তৈরি হয়নি। বেশিরভাগ বিজেপি বিধায়কই প্রথমবার নির্বাচিত হয়েছেন। হাতেগোনা কয়েকজনকে বাদ দিলে অধিকাংশেরই অভিজ্ঞতা নেই। ফলে তাঁদের পক্ষে সংগঠন গড়ে তোলা কতটা সম্ভব হবে, তা নিয়ে দলীয় নেতৃত্বের মধ্যেই সংশয় আছে। তাই হয়তো পঞ্চায়েতকে সামনে রেখে গ্রামীণ এলাকায় সংগঠন তৈরি করতে চাইছে বিজেপি। সেই লক্ষ্যেই কি ঘুরপথে পঞ্চায়েতের দখল নিতে চাইছে?
বড়ো বড়ো প্রকল্প রূপায়ণ করে কেন্দ্রের ও রাজ্যের সরকার। কিন্তু, গ্রামের ও শহরের সাধারণ মানুষের চাহিদা পূরণ এবং এলাকার উন্নয়নের দায়িত্ব ‘স্থানীয় সরকারে’র অর্থাৎ পঞ্চায়েত বা পুরসভার। কাজ করার জন্য পঞ্চায়েত ও পুরসভাগুলি বিপুল টাকা পায়। কাজের ঠিকাদারি নিয়েই অশান্তির সূত্রপাত। সরকারি নিয়মে টেন্ডারে যিনি সবচেয়ে কম দরপত্র দেবেন তিনিই কাজ পাওয়ার অধিকারী। কিন্তু, কাজ পান কর্তাভজা লোকজন। তাতে ‘কাটমানি’পাওয়া নিয়ে কোনো চিন্তা করতে হয় না। পঞ্চায়েতের মধুভাণ্ডের উপর একচ্ছত্র অধিকার কায়েম করতেই তৈরি করে মস্তানবাহিনী। সেটাই হয়ে যায় শাসক দলের সংগঠন। 
নিয়ম মেনে পঞ্চায়েতের দখল নিতে গেলে বিজেপিকে আরও প্রায় দু’ বছর অপেক্ষা করতে হবে। ২০২৮ সালে পঞ্চায়েত ভোট হওয়ার কথা। তার পরের বছরই লোকসভার নির্বাচন। রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা মনে করছেন, চব্বিশে নির্বাচনি প্রচারে এসে বঙ্গ বিজেপিকে দেওয়া অমিত শাহের ৩৫টি আসনের টার্গেট ২০২৯ সালে পূরণ করতে চায়। দলের সংগঠন মজবুত করার উদ্দেশ্যেই বিজেপি ঘুরপথে এক এক করে পঞ্চায়েত ও জেলা পরিষদের দখল নিতে চাইছে। 
কোনো রকম মারামারি, রক্তক্ষয় ছাড়াই বদলে যাচ্ছে পুরসভা, পঞ্চায়েত ও জেলা পরিষদের রং। তৃণমূলের লাগামছাড়া দুর্নীতির কারণে বিজেপির পক্ষে এই কাজটা অনেক সোজা হয়ে গিয়েছে। পঞ্চায়েত, পঞ্চায়েত সমিতি বা জেলা পরিষদের দুর্নীতি নিয়ে আঙুল তোলা যাবে না, এমন বোর্ড রাজ্যে নেই। ফলে একটু চাপ দিলেই তৃণমূলের পদাধিকারীরা হয় পদত্যাগ করছেন, না হলে বিজেপির পছন্দের প্রার্থীকে সমর্থন করছেন। আবার বহু ক্ষেত্রে মেঘ না চাইতেই বৃষ্টি নামছে। তৃণমূলের বিক্ষুব্ধরা আগ বাড়িয়ে বিজেপি নেতৃত্বের সঙ্গে যোগাযোগ করে প্রধান ও চেয়ারম্যান বদলের প্রস্তাব দিচ্ছেন। তবে, সবচেয়ে বেশি মাথা নত করছেন বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় জেতা পঞ্চায়েতের প্রধানরা।
রাজ্য পুলিশ এবং রাজ্য নির্বাচন কমিশনের তত্ত্বাবধানে পঞ্চায়েত ও পুরসভা ভোট হয়। ফলে এই নির্বাচনকে প্রহসনে পরিণত করাটাই শাসক দলের রীতি হয়ে দাঁড়িয়েছে। এ ব্যাপারে সিপিএম, তৃণমূল, বিজেপি কেউ কারোর চেয়ে কম যায় না। সিপিএম পঞ্চায়েত ভোটে বাংলায় বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় জেতার যে রেকর্ড রেখে গিয়েছিল, তাকে সযত্নে লালন পালন করেছিল তৃণমূল কংগ্রেস। বিজেপি প্রথমবার  বাংলার ক্ষমতা দখল করেছে। তাই তারা কীভাবে পঞ্চায়েত ও পুরসভার ভোট করাবে, সেটা সময় বলবে। তবে, অন্য রাজ্যে বিজেপির রেকর্ড খুব একটা ভালো নয়। বিশেষ করে ত্রিপুরায়। তাই প্রধানমন্ত্রী ‘ভয় আউট ভরসা ইন’আশ্বাস দিলেও ভয় কিন্তু যাচ্ছে না। 
এবারের নির্বাচনে তৃণমূলের দিক থেকে মানুষের মুখ ফিরিয়ে নেওয়ার অন্যতম কারণ নেতাদের দুর্নীতি। যতক্ষণ না বান্ধবীর কাছ থেকে কোটি কোটি টাকা, কেজি কেজি সোনা উদ্ধার হয় ততক্ষণ শহরের নেতাদের ফুলেফেঁপে ওঠাটা চোখে পড়ে না। কিন্তু, গ্রামের নেতাদের বাড়বাড়ন্তটা মানুষের চোখ এড়ায় না। যদি মাটির ঘরে বাস করা নেতা দোতলা বাড়ি হাঁকায় কিংবা সাইলেন্সার ফুটো বাইকে চাপা নেতা যখন চারচাকা চেপে ঘুরে বেড়ায় তখন মানুষ আড়চোখে তাকায়। তার উপর আবাসের তালিকায় গরিবের বদলে যখন নেতার বাড়ির ছ’জনের নাম থাকে তখন রাগ তো হবেই। নেতাদের এই বাড়বাড়ন্ত আটকাতেই মানুষ ভোট দিয়েছে বিজেপিকে। কিন্তু, ক্ষমতায় বসতে না বসতেই বিজেপির নাম ভাঙিয়ে শুরু হয়েছে তোলাবাজি। বিজেপির মাতব্বরদের দাবিমতো ২৩ লক্ষ টাকা দিতে না পেরে বর্ধমানে আত্মঘাতী হয়েছেন এক তৃণমূল নেতা। 
একথা ঠিক, বিজেপি পঞ্চায়েত ও জেলা পরিষদের দখল নিলে তাদের সংগঠন দানা বাঁধবে। মিছিল-মিটিংয়ে, নির্বাচনি বুথে ভিড় করার লোক পাবে। কিন্তু, ঘুরপথে পঞ্চায়েত দখল বিনাপ্রতিদ্বন্দ্বিতায় জয়ের মতোই বিপজ্জনক। এটাই ইতিহাসের শিক্ষা।

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ