সমৃদ্ধ দত্ত: তৃণমূল কংগ্রেসের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করেছেন। কিন্তু বিদ্রোহী বিধায়কদের একাংশ মুখে এখনও বলছেন, আমাদের নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। আবার অন্য পক্ষ সরাসরি বলছেন, বিজেপিকে
সমৃদ্ধ দত্ত: তৃণমূল কংগ্রেসের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করেছেন। কিন্তু বিদ্রোহী বিধায়কদের একাংশ মুখে এখনও বলছেন, আমাদের নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। আবার অন্য পক্ষ সরাসরি বলছেন, বিজেপিকে
সমর্থন করব আমরা। এই অংশটি হঠাৎ একটি অচেনা দলের সদস্য হয়ে গেলেন! মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের তৃণমূল সংসদীয়ভাবে সম্পূর্ণ ছত্রভঙ্গ হয়ে গেলেও, তৃণমূলের বিদ্রোহী দুই শিবিরকে কিন্তু রাজনৈতিকভাবে দিশাহীন লাগছে।
একদিকে বিধায়কদের বিদ্রোহী শিবির। অন্যদিকে, এমপিদের বিদ্রোহী শিবির। এখন তৃণমূল ভেঙে দুটি পৃথক বিদ্রোহী শিবির বঙ্গরাজনীতিতে আত্মপ্রকাশ করেছে। এই দুই পক্ষই কি ঠিক করেছে, কিংবা ভুল করেছে, বা নীতিহীন অবস্থান নিয়েছে? নাকি সঠিক সিদ্ধান্তই নিয়েছে? এসব চর্চা, বিতর্ক প্রচুর হয়েছে এবং হচ্ছে। কিন্তু এখনও যেটা জানা যাচ্ছে না, সেটি হল, এই দুই শিবিরের রাজনৈতিক লক্ষ্য ঠিক কী? তারা কি হিন্দুত্ববাদী? নাকি বামপন্থী? নাকি জাতীয় সেকুলার মধ্যপন্থী? এসব জানা যাচ্ছে না। ‘আমরা তৃণমূলের বিদ্রোহী’ অথবা ‘আমরাই প্রকৃত তৃণমূল’— এটা তো পাঁচ বছর ধরে কোনো রাজনৈতিক পরিচয় ও অবস্থান হতে পারে না। একটা আইডেন্টিটি তৈরি হলে সাধারণ মানুষের পক্ষে বোঝা সম্ভব হতে পারে যে, কাদের রাজনৈতিক অবস্থান কী? সিপিএম বামপন্থী। বিজেপি হিন্দুত্ববাদী। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের তৃণমূল প্রথম থেকেই জাতীয় কংগ্রেসেরই ভাবধারার সম্প্রসারিত আইডেন্টিটি নিয়ে চলেছে। অর্থাৎ সেকুলার, মধ্যপন্থী, সাম্প্রদায়িকতা-বিরোধী ইত্যাদি। অন্তত ঘোষিতভাবে তারা সেরকম। তাদের বলা হয় মুসলিম তোষণকারী। সেটা কংগ্রেস সম্পর্কেও বলা হয়ে থাকে। সুতরাং একই কথা হল। কিন্তু বিদ্রোহীদের রাজনৈতিক পরিচয় কী?
তৃণমূলের বিদ্রোহী এমপিরা একটি অজানা অচেনা দলের সদস্য হয়েছেন। তবু অন্তত তাঁরা একটি প্ল্যাটফর্ম খুঁজে পেয়েছেন। নিশ্চয়ই বিজেপি তাঁদের স্পষ্ট বার্তা দিয়েছে যে, আমরা তোমাদের দলে নেব না। সেই কারণেই এই ২০ জন এমপি একটি অচেনা দলকে নিজেদের দল হিসেবে মনোনীত করতে বাধ্য হয়েছেন। তাঁরা বলেছেন, আমরা এনডিএ জোটে আছি। বিজেপিকে সমর্থন করব। নরেন্দ্র মোদির নেতৃত্বে দেশ গঠন করব। খুব ভালো কথা। কারণ স্পষ্ট কথা।
কিন্তু এই এমপিদের ন্যাশনাল সিটিজেনস পার্টির পরবর্তী লক্ষ্য কী? তাঁরা কি পরবর্তী কোনো ভোটে এনডিএ জোটশরিক হয়ে লড়াই করবেন? যদি করেন, তাহলে তাঁদের কি পশ্চিমবঙ্গে বিজেপি আসন ছেড়ে দেবে? অর্থাৎ একটি অথবা একঝাঁক আসনে, বিজেপি নিজেদের দলের নেতাকর্মীকে টিকিট না দিয়ে এই নব্য এনসিপিআইকে আসন ছেড়ে দেবে? এরকম কি হবে? তারপরও প্রশ্ন থেকে যাচ্ছে। সেটি হল, পশ্চিমবঙ্গে এই ২০ জন এমপির ভবিষ্যৎ কর্মসূচি কী? সংসদের অধিবেশনে তাঁরা মোদি সরকারের আনা কোনো বিলে সরকারের পক্ষে ভোট দেবেন এবং সরকারকে সাহায্য করবেন। এটা তো স্পষ্ট বোঝা গেল। কিন্তু এছাড়া রাজনৈতিক কর্মসূচি কী হবে এই ২০ জন এমপির?
তাঁরা এনসিপিআই দলের হয়ে সভা সমাবেশ মিটিং মিছিল করবেন? নাকি তাঁদের রাজনৈতিক সক্রিয়তা, বিবৃতি একমাত্র যখন সংসদ চলবে তখনই দেখা যাবে। আর বছরের বাকি সময়টা ইন্টারভিউ দেওয়া, সোশ্যাল মিডিয়ায় বিবৃতি প্রদানেই সীমাবদ্ধ থাকবেন তাঁরা? তাঁরা যেহেতু মোদি সরকারকে সমর্থন করার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, অতএব পশ্চিমবঙ্গে বিজেপি যখনই কোনো রাজনৈতিক কর্মসূচি নেবে, সেখানে তাঁদের হাজির হতে হবে। বিজেপির মিটিং, মিছিল, সভা-সমাবেশে তাঁদের দেখা যাবে আশা করা যায়। সেটা বিজেপি নেতাকর্মীদের কাছেও গ্রহণযোগ্য হতে হবে। প্রশ্ন, তাঁরা এই ২০ জন প্রাক্তন তৃণমূল সদস্যদের নিজেদের কর্মসূচিতে সাদরে গ্রহণ করবে কি না। সেটা এখনও অনিশ্চিত।
আবার উলটোদিকে তৃণমূলের হয়ে নির্বাচিত বিধায়কদের যে গোষ্ঠী এবার বিরোধী দলের মর্যাদা পেয়েছে, সেই দলেরও রাজনৈতিক দিশা অস্পষ্ট।
তাঁরা বলেছেন, আমরা গঠনমূলক বিরোধিতা করব নতুন বিজেপি সরকারের। এটা শুনতে ভালো। কিন্তু বিরোধিতা ঠিক কেমন হবে? প্রতীকী, বিধানসভায় সরকার বিরোধী কিছু বিবৃতি কিংবা নিছক ওয়াক আউট? নাকি সরকারকে নাজেহাল করার কোনো
তীব্র আন্দোলন, বিক্ষোভ, সভা, সমাবেশ? রাজনীতিতে দুটি পক্ষ। সরকার পক্ষ এবং বিরোধী পক্ষ। বিরোধী পক্ষের প্রধান লক্ষ্য হল, সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করে আমরা একদিন সরকারে বসব। আর সরকার পক্ষের লক্ষ্য হল, বিরোধীদের নানারকমভাবে পরাস্ত করা। সোজা কথায়, ভোটারদের কাছে টানা ও কাছে রাখার প্রতিযোগিতা।
বিদ্রোহী বিধায়কদের দল কি ঘোষণা করবে যে, তারা লাগাতার বিজেপি বিরোধী আন্দোলন করে একদিন ক্ষমতাসীন হতে চায়, ভোটে বিজেপিকে হারিয়ে? কারণ, প্রধান বিরোধী দলের তো সেটাই ঘোষিত লক্ষ্য হওয়ার কথা। দ্বিতীয়ত, ‘আমরা আসল তৃণমূল’ এরকম নামে কোনো দল হতে পারে না।
এই বিধায়করা নিশ্চয়ই এরপর সর্বভারতীয়
তৃণমূল কংগ্রেসে দলের নাম, প্রতীক দখল করার জন্য নির্বাচন কমিশনে যাবে। হয়তো মামলা মোকদ্দমা হবে। প্রথম থেকেই এই বিদ্রোহী বিধায়ক ও এমপিরা সারপ্রাইজ দেওয়ার আনন্দে মত্ত। কিন্তু সারপ্রাইজ কতদিন? একটা স্থিতিশীল জায়গায় তো পৌঁছাতে হবে। অর্থাৎ এরপর কী?
বিদ্রোহী বিধায়করা আবার বিদ্রোহী এমপিদের সঙ্গে প্রকাশ্য দূরত্ব বজায় রাখছেন। কারণ এমপিরা অন্য একটি দল। এই দুই শিবির ভবিষ্যতে মিশে যাবে কি না সেটা স্পষ্ট নয়। কারণ, সেক্ষেত্রে নেতৃত্ব নিয়ে প্রশ্ন উঠবে। এই দুই শিবিরের মধ্যেই একটি কথা শোনা যায় যে, আমাদের কেউ নেতা নয়। আমাদের হল কালেকটিভ লিডারশিপ। কালেকটিভ লিডারশিপ কনসেপ্ট ভারতীয় রাজনীতিতে ব্যর্থ। প্রায় সব ছোটোবড়ো দলেই একক নায়ক নায়িকা আছেন।
যাঁকে সকলে মান্য করে দলে। অতএব বিদ্রোহী তৃণমূল বিধায়ক, এমপিদের মধ্যে এই লিডারশিপ
সংকট অবধারিত। কোনো পক্ষই অন্য পক্ষকে নেতৃত্বে মানবে বলে মনে হয় না। যদিও এখনও পর্যন্ত এই দুই পক্ষেরই পরোক্ষ দিশানির্দেশকারী বিজেপি নেতৃত্ব। সেটা একটা সুবিধা। বিদ্রোহী এমপিদের বৈঠকই হয়েছে বিজেপি নেতৃত্বের সঙ্গে। সুতরাং তাঁদের চালিকাশক্তি কে সেটা স্পষ্ট।
রাজ্যে জনপ্রতিনিধিত্বমূলক নিরিখে সাতটি অবিজেপি দল আছে এখন। তৃণমূল কংগ্রেসের বিধানসভার বিদ্রোহী শিবির। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের আদি তৃণমূল। তৃণমূলের বিদ্রোহী এমপিদের ন্যাশনাল সিটিজেনস পার্টি। সিপিএম। কংগ্রেস। আইএসএফ এবং হুমায়ুন কবীরের দল। এদের মধ্যে সরাসরি বর্তমান বিজেপি সরকারের বিরুদ্ধে রাস্তায় নেমে আন্দোলন করছে ও করবে সিপিএম, কংগ্রেস এবং মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের তৃণমূল। এই তিনটি দলের নীচুতলার কর্মীরা আছে। বাকি তৃণমূলের বিদ্রোহীদের গোষ্ঠীদুটিতে এখনও পর্যন্ত নেতা আছে, কর্মী নেই। প্রকাশ্য সম্মেলন অথবা সমাবেশ কেউই করেনি। তাই কর্মী আছে কি না বোঝার উপায় নেই। বিধায়ক, এমপি, কাউন্সিলার ইত্যাদি পদাধিকারীরা আছেন। কিন্তু কর্মীরা কোনদিকে সেটার পরীক্ষা এখনও হয়নি।
সেই পরীক্ষা তখনই হবে, যখন বিদ্রোহী তৃণমূলের দুই শিবির রাস্তায় নামবে। প্রকাশ্যে তখন দেখা যাবে তৃণমূলের নীচুতলার নেতা-কর্মীরা কোনদিকে বেশি ভিড় করছেন। আগামীদিনে একঝাঁক ভোট। কলকাতা পুরসভায় ভোট। রাজ্যের পুরভোট। পঞ্চায়েত ভোট। লোকসভা ভোট। এই ভবিষ্যৎ ভোট অথবা রাজনৈতিক কর্মসূচিগুলিতে নিজেদের প্রমাণ করাই হতে চলেছে আদি এবং বিদ্রোহী তৃণমূলের তিন গোষ্ঠীর কাছে প্রধান চ্যালেঞ্জ।
বিদ্রোহীদের কাছে রাজনৈতিক দল হয়ে ওঠা
বিশেষ চ্যালেঞ্জ। কারণ, অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় খারাপ, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় খারাপ, দুর্নীতিগ্রস্ত তৃণমূল, শুধু এসব বলে তো পাঁচ বছর চলবে না। কিছুদিনের মধ্যেই এই কথাগুলি পুরানো হয়ে যাবে। আর বিজেপি তো আছেই তৃণমূলের তীব্র সমালোচনার জন্য। প্রচুর আইনি ব্যবস্থাও হচ্ছে ও হবে। কিন্তু বিদ্রোহীদের রাজনৈতিক এজেন্ডা কী হবে? বিজেপিকে প্রত্যক্ষ অথবা পরোক্ষ সমর্থন? শুধু এই কর্মসূচিতেই সীমাবদ্ধ থাকবেন বিদ্রোহীরা? নাকি ভবিষ্যতে ধীরে ধীরে সকলেই বিজেপি হয়ে যাবে? বঙ্গবাসীর কাছে আরও আকর্ষণীয় হয়ে উঠবে বঙ্গরাজনীতি। রাজ্যে ঘটনার ঘনঘটায় প্রধান চরিত্র একসঙ্গে ৭টি রাজনৈতিক দল ও গোষ্ঠী। ৮০ বছরে এরকম নাটকীয় ঘটনা বঙ্গবাসী দেখেনি!