Bartaman Logo
২৬ জুন, ২০২৬
বর্তমান / সম্পাদকীয়

বঙ্কিমকে ভুলে যাওয়া বাঙালির অপরাধ

বঙ্কিমচন্দ্রকে ভুলে যাওয়া বাঙালির অপরাধ নিয়ে আলোচনা। রবীন্দ্রনাথের স্মরণ ও বাংলা ভাষার মর্যাদা নিয়ে বিস্তারিত পড়ুন।

বঙ্কিমকে ভুলে যাওয়া বাঙালির অপরাধ
  • ২৬ জুন, ২০২৬ ০৪:০০
Prefer us on Google

স্বস্তিনাথ শাস্ত্রী: ‘আমাদের মধ্যে যাঁহারা সাহিত্যব্যবসায়ী তাঁহারা বঙ্কিমের কাছে যে কী চিরঋণে আবদ্ধ তাহা যেন কোনো কালে বিস্মৃত না হন।’ বক্তার নাম রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। অথচ কী আশ্চর্য! আমরা বিস্মৃতই হয়েছিলাম। চতুর্দিকে রবীন্দ্রনাথ, সত্যজিৎ রায়কে নিয়ে যে পরিমাণে মাতামাতি দেখি তার শতকরা এক শতাংশও বোধহয় বঙ্কিমচন্দ্রকে নিয়ে হতে চোখে পড়ে না। অথচ মহাত্মা গান্ধী, নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু ছাড়া ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাস যেরকম অসম্পূর্ণ হয়ে থাকবে, বঙ্কিমকে বিস্মৃত হলেও তেমনি আধুনিক বাংলা ভাষার ইতিহাসের প্রতি চরম অবজ্ঞা প্রদর্শন করা হবে। কিন্তু সকলে তো বাড়ির বাহ্যিক সৌন্দর্য দেখেই মোহিত হয়। ক’জন আর জানতে চায় যে, বাড়ির ভিতটা কার গড়া, কতটা মজবুত। তেমনি আমরাও বঙ্কিমকে প্রায় বিস্মৃত হয়েছি। কবিগুরুর পরামর্শ কানে তুলিনি। এ ক্ষেত্রে ‘সাহিত্যব্যবসায়ী’-দের দায়িত্বটা অনেকটাই বেশি। যাঁরা লিখে রোজগার করেন অর্থাৎ সাহিত্যিক, কবি, প্রাবন্ধিক, সাংবাদিক, মাস্টার মশাই এঁরাও কি ‘সাহিত্যব্যবসায়ী’-র তালিকায় পড়েন না! এঁদের অনেকের নিরাসক্তির কারণেই কিন্তু এই বঙ্গে বঙ্কিমকে নিয়ে, তাঁর সাহিত্য  নিয়ে, তাঁর কাজ নিয়ে চর্চা একসময় প্রায় স্তিমিত হয়ে গিয়েছিল। ধন্যবাদ রাজ্যে সদ্য ক্ষমতাপ্রাপ্ত বিজেপি সরকারকে। তারা প্রতিটি স্কুলে ‘বন্দে মাতরম্‌’-কে প্রার্থনা সঙ্গীত হিসাবে আবশ্যিক করে বঙ্কিমকে নিয়ে চর্চার সুযোগ ঘটিয়ে দিয়েছে। যদিও বন্দে মাতরম্‌ গানটি পুরোটাই ‘জাতীয় গান’ হিসাবে গাওয়ার উপযোগী কি না, তা নিয়ে দ্বিমত আছে। স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরই মনে করতেন যে, বন্দে মাতরমের কেবলমাত্র প্রথম দু’টি স্তবকই জাতীয় গান হওয়ার উপযুক্ত। বাকি অংশটি নয়। তো সে বিতর্কে পরে আসছি। তার আগে এই ২৬ জুনে বঙ্কিমের জন্মদিনে কেন রবীন্দ্রনাথ তাঁকে স্মরণীয় বলেছিলেন, তার কারণ একটু অনুসন্ধান করে দেখা যাক। 

Advertisement

ঋষি বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় না থাকলে, বাংলা ভাষায় যে ‘সিরিয়াস’ গদ্য সাহিত্য লেখা সম্ভব, তা জানাই যেত না। বঙ্কিমই প্রথম ব্যক্তি, যিনি বাংলা ভাষায় ‘সিরিয়াস’ গদ্য লেখায় হাত দেন। বঙ্কিমের আগে বাংলা ভাষায় যে ধরনের লেখালিখি হতো সে সম্পর্কে রবীন্দ্রনাথ বলেছিলেন, ‘সে সময়কার সাহিত্য অন্য যে-কোনো প্রকার শিক্ষা দিতে সমর্থ হউক, ঠিক সুরুচি শিক্ষার উপযুক্ত ছিল না।’ এমনকি যে ঈশ্বর গুপ্তকে বঙ্কিম নিজের সাহিত্যগুরুর স্থান দিয়েছিলেন, তাঁর রচনাও রবীন্দ্রনাথের মতে ওই ‘সুরুচি শিক্ষার উপযুক্ত ছিল না’ শ্রেণিতেই পড়ে। বঙ্কিমচন্দ্র তাঁর ‘আনন্দমঠ’, ‘দুর্গেশনন্দিনী’, ‘কপালকুণ্ডলা’, ‘বিষবৃক্ষ’, ‘দেবী চৌধুরাণী’, ‘কৃষ্ণকান্তের উইল’ প্রভৃতি উপন্যাসে বাঙালিকে এক স্বপ্নরাজ্যে নিয়ে যেতে সমর্থ হয়েছিলেন। তাঁর রচিত প্লট, চরিত্র নির্মাণ, নাটকীয়তার এমনই গুণ ছিল যে, আজও এই উপন্যাসগুলি পড়লে এতটুকুও একঘেয়েমিতে আক্রান্ত হতে হয় না পাঠককে। তাঁর উপন্যাস থেকে আজও চলচ্চিত্র নির্মাণে উৎসাহী হন পরিচালকরা। শুধু এটুকুই নয়, রবি ঠাকুর যেমন বলেছিলেন, সেই সুরুচির পরিচয়ও বহন করে বঙ্কিমের উপন্যাস। 
বঙ্কিমচন্দ্রের আগে বাংলা ভাষাকে প্রথম মর্যাদার আসনে বসিয়েছিলেন রাজা রামমোহন রায়। সে সময়ে সরকারি কাজের জন্য এবং অন্য গুরুত্বপূর্ণ প্রয়োজনে বাংলা ভাষা ব্যবহারের রেওয়াজ ছিল না। ব্যবহৃত হতো আরবি বা ফার্সি। পরে সেই স্থান নিয়েছিল ইংরেজি। রবীন্দ্রনাথের ভাষায়, বাংলাকে সংস্কৃত পণ্ডিতরা বলতেন ‘গ্রাম্য’ এবং ইংরেজি শিক্ষিতরা বলতেন ‘বর্বর’ ভাষা। বাংলা ভাষায় যে সিরিয়াস লেখালিখি করা সম্ভব, সে বিশ্বাস মনের গোপন কোণেও লালন করত না কেউই। বাংলা ভাষায় বালক ও মহিলাদের জন্য কৃপা করে কিছু সরল পাঠ্যপুস্তক লেখা হত। শিক্ষিত সমাজের কাছে ব্রাত্য থাকা সেই ভাষাকেই রামমোহন প্রথমে ‘গ্রানিট-স্তরের উপর স্থাপন করিয়া নিমজ্জমানদশা হইতে উন্নত করিয়া তুলিয়াছিলেন, ...’। তারপর বঙ্কিমচন্দ্র সেই ভিতের উপর একটু একটু করে সুদৃশ্য অট্টালিকা বানিয়ে তুলছিলেন। শুধু সাহিত্য রচনার মাধ্যমেই নয়, তৎকালীন কাব্য ও সাহিত্যের সমালোচনা করেও বঙ্কিম চেষ্টা করছিলেন বাংলা ভাষাকে মর্যাদার আসনে প্রতিষ্ঠিত করতে। এ জন্য বঙ্কিমের হাতিয়ার ছিল ‘বঙ্গদর্শন’ নামে পত্রিকাটি। সে পত্রিকা এতটাই জনপ্রিয় হয়েছিল যে বাড়িতে পত্রিকাটি এলে কাড়াকাড়ি পড়ে যেত পড়ার জন্য। এমন ঘটনার কথা লিখে গিয়েছেন স্বয়ং রবীন্দ্রনাথই। সেই বঙ্গদর্শনে একদিকে যেমন সাহিত্য, কাব্য প্রকাশিত হতো, অন্যদিকে তেমনই বঙ্কিম কলম ধরতেন সমালোচনার জন্য। রাজনারায়ণ বসু থেকে শুরু করে নবীনচন্দ্র সেন, বিদ্যাসাগর, কার না বইয়ের সমালোচনা লিখেছেন বঙ্কিম। শুধু সমালোচনা লিখেই দায়িত্ব শেষ করতেন না তিনি। একইসঙ্গে পাঠককে শিক্ষিত করার প্রয়াসও দেখা যায় সেইসব লেখায়। যেমন, ‘কিঞ্চিৎ জলযোগ’ নামে একটি প্রহসনের সমালোচনা করতে গিয়ে প্রহসন কেমন হওয়া উচিত, তা নিয়ে আলোচনা করেছেন বঙ্কিম। এতে পাঠকের যেমন উপকার হয়, তেমনি নবীন লেখকদেরও উপকার হয়।  একদিকে লেখক ও অপরদিকে সমালোচক, বঙ্কিমের এই দ্বৈত ভূমিকাকে রবীন্দ্রনাথ বর্ণনা করেছেন এইভাবে— ‘সেই সময়ে সব্যসাচী বঙ্কিম এক হস্ত গঠনকার্যে এক হস্ত নিবারণকার্যে নিযুক্ত রাখিয়েছিলেন। একদিকে অগ্নি জ্বালাইয়া রাখিতেছিলেন আর-এক দিকে ধূম এবং ভস্মরাশি দূর করিবার ভার নিজেই লইয়াছিলেন। রচনা এবং সমালোচনা এই উভয় কার্যের ভার বঙ্কিম একাকী গ্রহণ করাতেই বঙ্গসাহিত্য এত সত্বর এমন দ্রুত পরিণতি লাভ করিতে সক্ষম হইয়াছিল।’
রবীন্দ্রনাথ স্বয়ং বঙ্কিমের গুণগ্রাহী ছিলেন। তাঁর লেখনীর ধার, তাঁর রুচিশীলতা সবই রবীন্দ্রনাথকে আকৃষ্ট করত যখন তিনি নিতান্ত কিশোর তখন থেকেই। রবীন্দ্রনাথ লিখছেন, বাড়িতে তখন বঙ্গদর্শন এলে কাড়াকাড়ি পড়ে যেত কে আগে পড়বে তা নিয়ে। সেই বঙ্গদর্শনেই তো বঙ্কিমের সব মণিমুক্তোর ছড়াছড়ি। একদিকে বঙ্কিম সাহিত্য লিখছেন, অন্যদিকে সমালোচনা করছেন। এই বঙ্গদর্শনেই প্রথম প্রকাশিত হয়েছিল ‘বন্দে মাতরম্‌’। তখনও ‘আনন্দমঠ’ লেখা হয়নি। পরে যখন ‘আনন্দমঠ’ লিখলেন বঙ্কিম তখন বন্দে মাতরমকে তাতে এক মোক্ষম জায়গায় ঢুকিয়ে দিলেন। সেই গান বিপ্লবীদের বীজমন্ত্র হয়ে উঠেছিল। ‘বন্দে মাতরম্‌’ ধ্বনি দিয়ে তাঁরা ঝাঁপিয়ে পড়তেন বিপ্লবের কাজে। স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ এই গানে সুরারোপ করে বিভিন্ন অনুষ্ঠানে গেয়েছিলেন। প্রথম গেয়েছিলেন কলকাতায় কংগ্রেসের এক সভায়, ১৮৯৬ সালে। পরে ১৯০৫ সালে বঙ্গভঙ্গ আন্দোলনের সময়েও রবীন্দ্রনাথ এই গানটি গান। আরও পরে ১৯৩৭ সালে কংগ্রেসের সভায় ‘বন্দে মাতরম্‌’ গাওয়া নিয়ে কয়েকজন আপত্তি তোলেন। শোনা যায়, নেতাজি চেয়েছিলেন পুরো গানটাই গাওয়া হোক। তবে, কংগ্রেসের সভাপতি হিসাবে জওহরলাল নেহরু রবীন্দ্রনাথের কাছে এ বিষয়ে পরামর্শ চান। রবীন্দ্রনাথ তাঁকে লিখেছিলেন, বন্দে মাতরমের প্রথম দু’টি স্তবকই কংগ্রেসের সভায় গাওয়ার উপযুক্ত। গানের বাকি অংশ মুসলিমদের আঘাত করতে পারে। রবীন্দ্রনাথ বঙ্কিমের বিষয়ে অত্যন্ত শ্রদ্ধাশীল হওয়া সত্ত্বেও যুক্তির পথেই ছিলেন। সম্প্রতি পশ্চিমবঙ্গের বিজেপি সরকার গোটা গানটাই গাওয়ার নির্দেশ দিয়েছে স্কুলগুলিতে। তাদের এই সিদ্ধান্তে আর কিছু হোক না হোক, বঙ্কিমকে নিয়ে অন্তত আলোচনাটুকু করার পরিসর তৈরি হয়েছে, এটুকুই প্রাপ্তি বাঙালির।  

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ