মৃণালকান্তি দাস: রামলালার প্রসাদ নিয়ে দুর্নীতিচক্রের হদিশ মিলেছিল গত বছর জুনে। আর তার ঠিক এক বছর পর এই জুনেই জানা গেল, অযোধ্যার রামমন্দিরে ভক্তদের দানের কোটি কোটি টাকা উধাও!
মৃণালকান্তি দাস: রামলালার প্রসাদ নিয়ে দুর্নীতিচক্রের হদিশ মিলেছিল গত বছর জুনে। আর তার ঠিক এক বছর পর এই জুনেই জানা গেল, অযোধ্যার রামমন্দিরে ভক্তদের দানের কোটি কোটি টাকা উধাও!
রামলালার প্রসাদ নিয়ে জালিয়াতি করে ১০ কোটি টাকারও বেশি আত্মসাৎ করেছিলেন যে ‘সনাতনী’, তাঁর নাম আশিস সিং। গাজিয়াবাদের এই বাসিন্দাকে গ্রেপ্তার করেছিল উত্তরপ্রদেশ পুলিশের সাইবার ক্রাইম বিভাগ। কিন্তু এবারের অভিযোগ আরও ভয়ঙ্কর। মন্দির ট্রাস্টের সদস্যদের বিরুদ্ধে প্রায় ২০০ কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগ এনে একটি অভিযোগপত্র দায়ের করেছেন ‘ধর্ম সেনা ভারত’-এর প্রধান ও প্রাক্তন করসেবক সন্তোষ দুবে। উধাও ৬০ কেজি রুপো, চরণপাদুকা। বিজেপির প্রবীণ নেতা এল কে আদবানির সঙ্গে দুবেও ছিলেন বাবরি মসজিদ ধ্বংস মামলার অন্যতম প্রধান আসামি। রাম মন্দিরকে ঘিরে তাঁর মতো এক হিন্দুত্ববাদী নেতার অভিযোগ বিতর্কে নতুন মাত্রা যোগ করেছে।
অভিযোগপত্রে সন্তোষ দুবে উল্লেখ করেছেন, আবেদনকারী (সন্তোষ দুবে নিজে) প্রায়ই দর্শনের জন্য রাম জন্মভূমি মন্দিরে যান। তিনি প্রায়ই দেখেছেন, ভক্তরা দানবাক্সে সোনা ও রুপোর গয়না, সোনা ও রুপোর মুদ্রা এবং নগদ অর্থ দান করছেন। ধারণা করা হচ্ছে, ভক্তদের কাছ থেকে প্রতিদিন দানবাক্সগুলিতে নগদ টাকা, মুদ্রা ও গয়না মিলিয়ে ১ কোটি টাকার বেশি মূল্যের অনুদান জমা পড়ছে। এই অনুদান সংরক্ষণ ও সুরক্ষার দায়িত্ব রাম জন্মভূমি ট্রাস্টের ট্রাস্টিদের উপর ন্যস্ত। কিন্তু তাঁরা এই অর্থ নিরাপদে রাখার বদলে আত্মসাৎ করেছেন। অভিযোগপত্রে সন্তোষ দুবে দাবি করেছেন, ‘ট্রাস্টের সাধারণ সম্পাদক চম্পত রাই বানসাল, অনিল মিশ্র, গোপাল রাও এবং রামশঙ্কর যাদব ওরফে টিন্নুসহ (চম্পত রাইয়ের গাড়িচালক হিসেবে পরিচিত) ট্রাস্টের কর্তা ও কর্মচারীদের যোগসাজশে বড়ো অঙ্কের অর্থ, সোনা ও রুপোর গয়না এবং মুদ্রা দানবাক্স থেকে সরিয়ে ফেলা হয়েছে। আত্মসাৎ করা এই অর্থ ও সম্পদের মূল্য ২০০ কোটি টাকার বেশি বলে ধারণা করা হচ্ছে।’ মন্দিরের তহবিল আত্মসাৎ করার জন্য ট্রাস্টের কর্তারা হিসাবের খাতায় ভুয়ো তথ্য ও জাল সংখ্যা বসিয়েছেন বলেও অভিযোগ। শুধু দানের টাকা-গয়না চুরিই নয়, ‘রাম মন্দির আন্দোলন’ চলাকালীন দানসামগ্রী হিসেবে যে ১২৫০ সোনা, রুপোর ইট, হিরে খচিত অষ্টধাতুর ইট এসেছিল, তাও আর পাওয়া যাচ্ছে না। একটি ইট মরিশাস পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছে, হিরেখচিত ইট মুম্বইয়ের এক ব্যবসায়ীর কাছে আছে বলে দাবি করেছেন সন্তোষ। প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক, ভগবানের দানপাত্রের অর্থ এভাবে চুরি করেছে কোন সনাতনীরা?
ট্রাস্ট, স্টেট ব্যাংক অব ইন্ডিয়া এবং কালেকশন এজেন্সির সঙ্গে যুক্ত মোট ৪০ জন কর্মী দু’টি শিফটে ভাগ হয়ে দানের নগদ টাকা গণনার কাজ করেন। এরপরও এত বড়ো দুর্নীতি হল কীভাবে? তদন্ত প্রসঙ্গে মুখ্যমন্ত্রী যোগী আদিত্যনাথ বলেছেন, ‘৫০০ বছর অপেক্ষা করেছেন রামচন্দ্রের জন্য, সিটকে ১৫টা দিন সময় দিন!’ অথচ, মন্দির নির্মাণ কমিটির প্রধান তথা অবসরপ্রাপ্ত আইএএস অফিসার নৃপেন্দ্র মিশ্র জানিয়েছেন, এই ঘটনার তদন্ত করা বিশেষ তদন্তকারী দল বা সিট-এর জন্য বেশ চ্যালেঞ্জিং। কারণ, ঘটনার সিসিটিভি ফুটেজ স্বয়ংক্রিয়ভাবে মুছে গিয়েছে। সিসিটিভি ফুটেজ সংরক্ষণের মেয়াদ মাত্র ৪৫ দিন। ৪৫ দিন পার হয়ে যাওয়ার পর এই ফুটেজ স্বয়ংক্রিয়ভাবে মুছে যায়। তবে মুছে যাওয়ার আগে এই ফুটেজ ডিজিটালভাবে আর্কাইভে সংরক্ষণ করা যেত। যা করা হয়নি। মন্দিরের রসিদ ব্যবস্থার ফাঁকফোকর নিয়ে ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে নৃপেন্দ্র মিশ্র বলেছেন, কেউ যদি সোনা-দানা বা গয়না দান করেন, তবে তিনি রসিদ পাবেন এবং সেখানে তা স্পষ্ট লেখা থাকবে। কিন্তু ঈশ্বরের সামনে সরাসরি যে দান রাখা হয়, যেখানে সাধারণ মানুষ নিজেদের আংটি, কানের দুল বা নগদ টাকা দেন, সেই ক্ষেত্রটিতে সঠিক হিসাব-নিকাশের ব্যবস্থা থাকা জরুরি। সঠিক হিসাব না থাকলে সন্দেহ তৈরি হওয়াই স্বাভাবিক। আর তাই এখন গাণিতিক সমীকরণের সাহায্য নিয়ে গত ৬ মাসের ট্রেন্ড খতিয়ে দেখতে হবে এবং মন্দিরে কতজন দর্শনার্থী এসেছিলেন, তার সঙ্গে এই দানের পরিমাণের যোগসূত্র মেলাতে হবে। প্রশ্ন হল, গত ১১ মাসে মন্দিরের নিরাপত্তা ব্যবস্থায় প্রায় ১০ কোটি টাকা খরচ করা সত্ত্বেও এমন চুরির ঘটনা কীভাবে ঘটল? তাহলে কি সর্ষের মধ্যেই ভূত লুকিয়ে?
ঘটনার প্রতিবাদে ইতিমধ্যে হিন্দুত্ববাদের পুরানো কণ্ঠস্বরগুলি সরব হতে শুরু করেছে। দুর্নীতির অভিযোগ সামনে আসার পর থেকে হিন্দুত্ববাদের পুরানো পুরোধা ব্যক্তিরা বর্তমান মন্দির কমিটির বিরুদ্ধে ক্ষোভ উগরে দিচ্ছেন। উত্তরপ্রদেশের রাজনীতি এবং ১৯৯২ সালে বাবরি মসজিদ ধ্বংসের ঘটনায় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও বিতর্কিত চরিত্র বিজেপি নেতা বিনয় কাটিয়ার। সাংবাদিকদের তিনি সরাসরি বলেছেন, ‘ইয়ে জিতনে হ্যায়, সব চোর হ্যায়’ (এখানে যারা আছে, সবাই চোর)। রাম মন্দির আন্দোলনের সঙ্গে বিজেপি এবং দলের অসংখ্য নেতাকর্মীর অবদানের কথা উল্লেখ করে কাটিয়ার বলেছেন, ‘রাম মন্দির আন্দোলনের জন্য হাজার হাজার মানুষ ত্যাগ স্বীকার করেছেন। এমনকি ১৯৯২ সালে তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী কল্যাণ সিংকেও তাঁর পদ থেকে ইস্তফা দিতে হয়েছিল।’ শুধু কাটিয়ারই বিক্ষুব্ধ নন, উত্তরপ্রদেশ বিজেপির সভাপতি পঙ্কজ চৌধুরী অযোধ্যার রাম মন্দিরের দানপাত্রে জমা হওয়া অর্থ তছরুপের অভিযোগকে গুরুতর বলে উল্লেখ করেছেন। অভিযোগ নিয়ে দলকে গুরুতর অস্বস্তিতে ফেলেছেন বিজেপির প্রাক্তন সাংসদ ব্রিজভূষণ শরণ সিং-ও। বলেছেন, ‘আমি যদি সত্যটা বলি তাহলে ভয়ঙ্কর রকমের সমস্যায় পড়ে যেতে পারি। কারণ, অভিযুক্তরা অত্যন্ত প্রভাবশালী ব্যক্তি। আমাদের এখনই প্রকাশ্যে মুখ খোলার সাহস নেই। আশা করি সত্য প্রকাশের জন্য উপযুক্ত সময় আসবে।’ অভিযোগ নিয়ে সরকার ও মন্দির ট্রাস্টের অস্বস্তি আরও বাড়িয়ে দিয়েছেন এক প্রাক্তন অ্যাকাউন্ট্যান্টও। তাঁর অভিযোগ, দানপাত্রের টাকা গণনার সময় ব্যাংক এবং ট্রাস্টের কিছু কর্মচারীর অর্থ আত্মসাতের বিষয়টি তাঁর নজরে এলে তিনি ট্রাস্ট কর্তাদের জানিয়েছিলেন। কিন্তু ব্যবস্থা নেওয়ার পরিবর্তে তাঁকেই অন্য বিভাগে বদলি করে দেওয়া হয়েছিল। ভাবুন, রামলালার প্রতি ভক্তির কী নমুনা!
প্রশ্ন হল, এই ট্রাস্ট আসলে কতটা স্বাধীন ছিল? ২০২০ সালে অযোধ্যায় রাম মন্দির নির্মাণের জন্য একটি ‘স্বাধীন ট্রাস্ট’ গঠনের কথা বলা হয়েছিল। সরকারের পক্ষ থেকে, বিশেষ করে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এই প্রক্রিয়ায় মোদির ভূমিকার কথা ফলাও করে প্রচার করা হয়েছিল। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে দেওয়া ৪০৪ শব্দের ওই সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে ‘প্রধানমন্ত্রী’ শব্দটি ৪ বার এবং ‘পিএম’ শব্দটি ৯ বার ব্যবহার করা হয়েছিল। ট্রাস্টের নিজস্ব ওয়েবসাইট অনুযায়ী, ট্রাস্টের চেয়ারম্যান তথা প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির একদা প্রিন্সিপাল সেক্রেটারি নৃপেন্দ্র মিশ্রসহ প্রায় সব সদস্যই কেন্দ্রীয় সরকারের মনোনীত। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ নিজেই এই ট্রাস্টের সদস্যদের নাম ও কাঠামো ঘোষণা করেছিলেন। প্রধানমন্ত্রীর ঘনিষ্ঠ বলে পরিচিত নৃপেন্দ্র মিশ্র এবং চম্পত রাইকে ট্রাস্টের মাথায় বসিয়ে নরেন্দ্র মোদি সরাসরি মন্দির নির্মাণের কাজ তদারক করতেন বলে নানামহলের অভিমত। স্বভাবতই সেই মন্দিরের দানপাত্রে জমা হওয়া ভক্তদের অর্থ তছরুপের অভিযোগ ঘিরে প্রধানমন্ত্রীর অফিসও অস্বস্তিতে। ক্ষীণতম প্রশ্ন তুললেও যে শাসকরা প্রশ্নকর্তার প্রতি অসন্তুষ্ট বা ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠেন, রামলালা নিয়ে কোনো সমালোচনা নিশ্চয়ই তাঁদের প্রীত করবে না। কিন্তু এই দুর্নীতির অভিযোগ এড়িয়ে যাওয়াও এখন প্রায় অসম্ভব। কারণ, বিজেপি কয়েক দশক ধরে এই রাম মন্দির প্রকল্প থেকে রাজনৈতিক ফায়দা লুটেছে। ফলে বিরোধীরাও এখন সোচ্চার।
সমালোচকরা বলছেন, আজ যে বিপুল অংশের মানুষ নিজেদের সনাতন ধর্মের প্রচারক হিসেবে তুলে ধরতে ব্যস্ত, তাদের অনেকেরই লক্ষ্য স্রেফ ক্ষমতাসীন বিজেপির আনুকূল্য পাওয়া। তাদের ভক্তি লোকদেখানো। হৃদয়ে তাদের দুর্নীতির-বাসা। রামমন্দিরে প্রণামী চুরির ঘটনা সেই সত্যকে
একেবারে নিরাবরণ করে দিয়েছে। সেই ‘সনাতনীদের’ দুর্নীতির বহর দেখে বজরংবলীও নিশ্চয় মনে মনে বলছেন: রাম রাম!