Bartaman Logo
২৫ জুন, ২০২৬
বর্তমান / সম্পাদকীয়

সবকা হিসাব যেন হয়

মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের দুর্নীতির বিরুদ্ধে হুঁশিয়ারি। লক্ষ্মীর ভাণ্ডার প্রকল্পের ৩০ লক্ষ ভুয়ো উপভোক্তা। বিস্তারিত পড়ুন।

সবকা হিসাব যেন হয়
  • ২৫ জুন, ২০২৬ ০৪:০০
Prefer us on Google

যেকোনো সমাজের প্রধান সমস্যা হল বৈষম্য। কারণ বৈষম্যের সৌজন্যেই সাধারণ মানুষের দুর্দশার দুষ্টচক্র গড়ে ওঠে। যে-সমাজে বৈষম্য যত বেশি সেখানে অশিক্ষা, ভগ্নস্বাস্থ্য, বেকারত্ব, বঞ্চনা, মানবাধিকার লঙ্ঘন প্রভৃতি মারাত্মক সমস্যাগুলি তত বেশি। এই সমস্যাগুলিই সমাজের বেশিরভাগ মানুষকে দরিদ্র করে রাখে। গরিব মানুষ আরো গরিব হয়, মধ্যবিত্ত শ্রেণি নেমে আসে দরিদ্রের স্তরে। অন্যদিকে, সহায়-সম্পদের বেশিরভাগটাই কুক্ষিগত হয়ে যায় মুষ্টিমেয় কিছু পরিবার বা ব্যক্তির। কল্যাণকামী রাষ্ট্র এই জিনিস চায় না। বৈষম্য ক্রমান্বয়ে কমাবার নিদান দেয় কল্যাণকামী অর্থনীতি। বৈষম্য হ্রাসের উপায় হল—উচ্চ আয়ের পরিবার, সংস্থা, ব্যক্তি প্রভৃতির কাছ থেকে বেশি হারে কর আদায় করে সেই টাকায় নানা ধরনের সামাজিক সহায়তামূলক প্রকল্প ও কর্মসূচি চালু করা। এই উদ্যোগের অগ্রাধিকার হল—অবহেলিত শ্রেণি। আমাদের যুক্তরাষ্ট্রীয় ব্যবস্থায় কেন্দ্র এবং রাজ্যগুলি পৃথকভাবে, কিংবা যৌথ উদ্যোগেও এই ধরনের কর্মসূচিগুলি নিতে পারে। যেমন—মনরেগা, বিনামূল্যে কিংবা ভরতুকি মূল্যে গৃহ, ন্যায্যমূল্যে খাদ্য, বিদ্যুৎ, কেরোসিন ও গ্যাস বণ্টনের প্রকল্প। বিনামূল্যে স্কুলশিক্ষা। উচ্চশিক্ষার জন্য ছাত্রবৃত্তি কিংবা নামমাত্র সুদে শিক্ষাঋণ। বিনামূল্যে চিকিৎসা পরিষেবা। বিনামূল্যে স্বাস্থ্যবিমার সুবিধা। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের জমানায় পশ্চিমবঙ্গে নারী ক্ষমতায়নে বিশেষ জোর দেওয়া হয়। এই উপলক্ষ্যে চালু করা হয়েছিল—কন্যাশ্রী, রূপশ্রী, লক্ষ্মীর ভাণ্ডার প্রভৃতি। উদ্দেশ্য ছিল বাল্যবিবাহে দাঁড়ি টানা এবং মহিলাদের হাতে নগদ জোগান বৃদ্ধি। প্রবাদ আছে যে, একজন মা শিক্ষিত হলে একটি আস্ত পরিবার শিক্ষার আলোয় উঠে আসে। মহিলাদের হাতে নগদ অর্থ থাকলে তার সদ্ব্যবহার হয় সংসারের নানা ক্ষেত্রে। একজন মহিলা সেই পয়সা জমিয়ে ছোটোখাটো ব্যবসা করতে পারেন কিংবা ছেলেমেয়েদের শিক্ষার প্রয়োজনে খরচ করতে পারেন। একজন পুরুষের অর্থনৈতিক চিন্তা এরকম ইতিবাচক নাও হতে পারে। অন্তত সমাজের অভিজ্ঞতা সেরকমই।

Advertisement

ক্ষমতায়িত নারী সমাজগঠনে বড়ো ভূমিকা নিয়ে থাকেন। তাই কল্যাণকামী রাষ্ট্র বৈষম্য কমানোর উদ্দেশ্যে মহিলাদের দায়িত্ববৃদ্ধির উপর গুরুত্ব আরোপ করে। এই পোড়ার দেশে অবশ্য এই তত্ত্ব বেশি দূর এগোতে পারে না। শুরুটা সুন্দর হলেও কিছু দূর গিয়েই মুখ থুবড়ে পড়ে। তার নেপথ্যে কাজ করে দুর্নীতি। দুর্নীতিবাজ লোকজন ক্ষুধার্তের অন্ন থেকে রোগীর ওষুধ, শিশুর বইপত্র, দুর্গত মানুষের ত্রাণসামগ্রী প্রভৃতি কোনো কিছুকেই রেয়াত করে না। তাদের কালো লোভী হাত প্রসারিত হয় সর্বত্র। তার ফলে সরকারি কোষাগারের অর্থ নিয়ে যথেচ্ছাচার ঘটে যায়। সরকারি অর্থের নয়ছয় তখনই বেশি হয় যখন সিস্টেমের মধ্যে জবাবদিহিতার পাট চুকে যায়, বেড়ে যায় স্বজনপোষণ এবং জনকল্যাণের লক্ষ্য গৌণ হয়ে পড়ে। যেমন রাজ্যের নতুন জমানায় সামনে আসছে অতীতের একের পর এক দুর্নীতির অভিযোগ। গরিবের গৃহ প্রকল্প থেকে সরকারি চাকরি প্রদান—নানা ক্ষেত্রে কাটমানির ছড়াছড়ি হয়েছে। বাদ যায়নি দুর্গত মানুষের ত্রাণসামগ্রী পাচারের কারবারও। এমনকি ব্যাপক দুর্নীতি হয়েছে তৃণমূল সরকারের ফ্ল্যাগশিপ প্রকল্প লক্ষ্মীর ভাণ্ডারেও। মঙ্গলবার বিধানসভায় স্বয়ং মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীই এই ব্যাপারে মুখ খুলেছেন। পূর্বতন তৃণমূল সরকারের দেড় দশকের জমানার দুর্নীতি সংক্রান্ত কিছু তথ্য মুখ্যমন্ত্রী পেশ করেছেন। রীতিমতো জেলা-ব্লকের নামোল্লেখসহ তিনি জানিয়েছেন, বিভিন্ন প্রকল্পকে ঢাল করে ছত্রে ছত্রে কারচুপি হয়েছে আর সরকারি টাকা আত্মসাৎ করেছেন কিছু তৃণমূল নেতা। এর মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হল ‘লক্ষ্মীর ভাণ্ডার দুর্নীতি’। মুখ্যমন্ত্রীর বিস্ফোরক অভিযোগ, ইতিমধ্যেই এমন ৩০ লক্ষ নাম পাওয়া গিয়েছে, যাদের ‘লক্ষ্মীর ভাণ্ডার’ পাওয়ার কথাই নয়। অর্থাৎ, ভুয়ো উপভোক্তা। আর সেই দুর্নীতির বার্ষিক অঙ্কটা মাথা ঘুরিয়ে দেওয়ার মতো—প্রায় সাড়ে পাঁচ হাজার কোটি টাকা! মুর্শিদাবাদ জেলার ডোমকল, জঙ্গিপুর, বহরমপুর ব্লকে বিভিন্ন প্রকল্পের টাকা কীভাবে ভুয়ো ব্যক্তির অ্যাকাউন্টে ঢুকেছে, সেই তথ্যও মুখ্যমন্ত্রী বিধানসভায় উপস্থাপন করেন। তাঁর অভিযোগ, মাইনরিটি স্কলারশিপ, এলপিজি বেনিফিট, বার্ধক্য ভাতাসহ বিভিন্ন প্রকল্পের টাকা ভুয়ো অ্যাকাউন্টে ক্রেডিট হয়েছে। 
এই অভিযোগের কিছুটাও সত্য হলে তা মারাত্মক। ১৯৮৫ সালে, তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী রাজীব গান্ধী সারা দেশের দৃষ্টি আকর্ষণ করে বলেছিলেন, সরকারের দেওয়া প্রতিটি টাকার মাত্র ১৫ পয়সা প্রকৃত বেনিফিসিয়ারির কাছে পৌঁছায়। মাঝপথেই নয়ছয় হয়ে যায় বাকি অর্থ! তারপর চার দশক অতিবাহিত হলেও পরিস্থিতি যে একচুলও বদলায়নি, তা জলের মতোই পরিষ্কার। মুখ্যমন্ত্রীর সাফ হুঁশিয়ারি: সবকা সাথ, সবকা বিকাশ, সবকা হিসাব... হবেই। তাঁর এই হুংকার যেন কথার কথা রয়ে না যায়। তবেই প্রকৃত পরিবর্তন পাবে রাজ্যবাসী। বৈষম্য হ্রাসের পথেও এককদম এগোতে পারব আমরা। নতুবা বরাবরের মতো বিলাপই সার হবে এই হতভাগ্য সমাজের।

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ