এবছর আমাদের স্বাধীনতার আট দশক। ব্রিটিশ ভারতে বাংলাই ছিল সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রদেশ। কারণ ভারতে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি এবং অতঃপর ইংরেজের শাসনের সূচনা হয়েছিল বাংলা থেকেই। গোড়ার দিকে কলকাতাই ছিল ব্রিটিশ ভারতের রাজধানী। শিল্প, বাণিজ্য, শিক্ষা, সংস্কৃতির পীঠস্থান হয়ে উঠেছিল কলকাতা মহানগরী। ব্রিটিশ রাজশক্তির কেন্দ্র ছিল লন্ডন। কলকাতার গুরুত্ব ছিল ঠিক তারপরেই। কলকাতাকে কেন্দ্র করেই নানা ক্ষেত্রে অভূতপূর্ব বিকাশ ঘটেছিল বাংলার। সুজলা সুফলা বাংলাদেশের বিপুল সম্পদ সারা পৃথিবীর ভাগ্যান্বেষীদের আকৃষ্ট করেছে যুগে যুগে। ওই সূত্রেই ফরাসি, ইংরেজ, দিনেমার, আরবসহ নানা জাতি বণিকের বেশে বঙ্গদেশে অনুপ্রবেশ করেছিল। ক্লাইভের হাতে সিরাজের পতনের পর বাকি জাতিগুলি গুরুত্ব হারায় এবং বাংলার কর্তৃত্ব করায়ত্ত করে ইংরেজরা। সাম্রাজ্যবাদী শক্তির কাছে নাগরিক হিসাবে ভারতবাসীর কোনো গুরুত্ব ছিল না। তাদের কাছে অগ্রাধিকার ছিল নির্বিচারে লুটপাট। তাই স্বাধীনতাতেই মোক্ষ দেখেছিলেন বিপ্লবীরা। বাংলা থেকেই শুরু হয়েছিল ইংরেজ বিতাড়নের আন্দোলন।
ভাবা হয়েছিল স্বাধীন ভারতেও বাংলা নেতৃত্ব দেবে পূর্বের মতোই। কিন্তু দেশভাগের মর্মান্তিক পরিণতি বাংলার যাবতীয় স্বপ্ন চুরমার করে দেয়। লক্ষ লক্ষ শরণার্থীকে নিয়ে লাগাতার সমস্যা মোকাবিলা করতেই স্বাধীন ভারতে পশ্চিমবঙ্গের নেতৃত্বের কালঘাম ছুটেছিল। তার ফলে নেতৃস্থানীয় জায়গা থেকে বাংলা ক্রমে যেন আস্তাকুঁড়ে নিক্ষিপ্ত হয়েছে। ক্রমান্বয়ে কমেছে শিল্প ও বাণিজ্য ক্ষেত্রে পশ্চিমবঙ্গের অবদান। একদা বিখ্যাত শিল্পাঞ্চলগুলি শিল্পশ্মশানের চেহারা নেয়। গুরুত্ব হারায় কলকাতা বন্দর এবং কলকাতা বিমানবন্দর। অবহেলার শিকার হয় পাটচাষ ও চটশিল্প। বাংলা পিছিয়ে পড়েছে শিক্ষাক্ষেত্রে। বিধানচন্দ্র রায়ের আমলে একের পর এক জাতীয় মানের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছিল। মেডিকেল, ইঞ্জিনিয়ারিং ও ম্যানেজমেন্ট শিক্ষা এবং বিজ্ঞান গবেষণায় পথ প্রদর্শক হয়ে উঠেছিল বাংলা। সেসব আজ সুখস্মৃতি হয়েই যতটুকু আনন্দ দেয় আমাদের। আর আমরা তাকিয়ে তাকিয়ে দেখি—দক্ষিণ ভারত, পশ্চিম ও উত্তর ভারত, এমনকি ভুবনেশ্বরের সাফল্যের দিকে। এই দুর্দশার জন্য বামেরা কয়েকদশক যাবৎ কেন্দ্রের বঞ্চনার দোহাই পড়েছে। তৃণমূল কংগ্রেসও দেড় দশক যাবৎ পা গলিয়ে ছিল ওই ছেঁড়া জুতোতেই। ভ্রান্ত নীতি, দুর্বল নেতৃত্ব এবং পরতে পরতে দুর্নীতিই সব ঝাঁজরা করে দিয়েছে—এই চরম সত্য স্বীকার করার সৎ সাহস কেউ দেখায়নি। যাই হোক, প্রায় পাঁচ দশক পর ২০২৬ বিধানসভা নির্বাচনের মাধ্যমে রাজ্যে তৈরি হয়েছে ‘ডবল ইঞ্জিন’ সরকার। নির্বাচনি প্রচারে বিজেপি যে সংকল্পপত্র (ইস্তাহার) প্রকাশ করেছিল, তাতে এই আশাই জাগানো হয়েছিল যে নরেন্দ্র মোদি-অমিত শাহের দলের সরকার তৈরি হলে বাংলা আবার ভারতসভায় শ্রেষ্ঠ আসন ফিরে পাবে। সবচেয়ে গুরুত্ব পাবে শিল্পায়ন। আমরা জানি, বাংলায় শিক্ষিত, প্রশিক্ষিত এবং কর্মক্ষম যুবক-যুবতীর অভাব নেই। অভাব শুধু কাজের সুযোগের। কারণ শিল্প-বাণিজ্যের হাল কহতব্য নয়। বছর বছর গালভরা শিল্পসম্মেলনই হয়েছে কেবল। দৃশ্যত শিল্প তেমন কিছু আসেনি। স্বভাবতই বেকার হল বৃহত্তম বাহিনী এই বঙ্গদেশে। অতীতে বেকারদের নিয়ে ভয়াবহ ছিনিমিনি খেলা হয়েছে। তাদেরকে ঘিরে যে দুর্নীতি দানা বেঁধেছিল তাও নজিরবিহীন। নতুন সরকার এসব অনাচার শিকড় থেকেই উপড়ে ফেলার অঙ্গীকার করেছে।
সোমবার শুভেন্দু অধিকারীর সরকার তার প্রথম পূর্ণাঙ্গ বাজেট পেশ করেছে বিধানসভায়। বিজেপির নির্বাচনি সংকল্পপত্রের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখেই তৈরি হয়েছে এই বাজেট। প্রস্তাবগুলির মধ্যে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য হল—১ লক্ষ চাকরি। তার মধ্যে শিক্ষাক্ষেত্রেই ধরা হয়েছে ৫০ হাজার। নতুন নিয়োগে মহিলাদের বিশেষ অগ্রাধিকার দেওয়া হবে—তাঁদের জন্য সংরক্ষিত থাকবে ৩৩ শতাংশ পদ। বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে চিরকাল বঞ্চিত উত্তরবঙ্গকে। সেখানে আইআইটি, আইআইএম, এইমস প্রভৃতি গড়ে তোলা হবে। রাজ্যজুড়ে পরিকাঠামো উন্নয়নেরও দিশা দেখানো হয়েছে—তার মধ্যে রয়েছে সুন্দরবন থেকে শিল্পাঞ্চল থেকে পাহাড়। সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে সমাজের অবহেলিত প্রতিটি শ্রেণিকে। তার মধ্যে কৃষক থেকে শ্রমিক—আছেন সকলেই। তাঁদের কারো ভাতাবৃদ্ধি করা হয়েছে, কারো উদ্দেশে ঘোষিত হয়েছে অন্যভাবে বিশেষ আর্থিক সুবিধা। সব মিলিয়ে প্রায় ৪ লক্ষ ৩৯ হাজার কোটি টাকার বাজেট প্রস্তাব পেশ করা হয় সোমবার। এই বাজেট প্রস্তাবের যদি অর্ধেকও দ্রুত বাস্তবায়িত হয়, চোখ বুজে বলা যায় তা হবে স্বাধীনতার পর বাংলার বুকে এক অভূতপূর্ব সাফল্য অর্জন। স্বাধীনতা প্রাপ্তির আট দশক পরে হলেও এই সূচনা উদযাপনের মতোই আনন্দদায়ক। রাজ্যের প্রতিটি মানুষ এই বাজেটে নিঃসন্দেহে আশার আলো দেখছেন।