শান্তনু দত্তগুপ্ত: আকাঙ্ক্ষা চতুর্বেদী রবিবার নিট দিতে পারেনি। সেই শক্তি তার ছিল না। লিখেছিল সে... সুইসাইড নোটে। প্রশ্ন ফাঁস তাকে ভেতর থেকে ভেঙে দিয়েছিল। জানত সে, কঠিন লড়াই এবার কঠিনতর হবে। বাবা চাষের কাজ করেন। কতটুকু আর আয়! তার মধ্যেও কিষান ক্রেডিট কার্ড ভাঙিয়ে ৩ লক্ষ টাকা লোন করেছিলেন। সেই টাকাতেই মেয়ে ভরতি হয়েছিল নাগপুরের কোচিং সেন্টারে। স্বপ্ন দেখেছিল সে... ডাক্তার হওয়ার। স্বপ্ন দেখেছিল তার বাবা-মাও। আকাঙ্ক্ষা বলেছিল, দেখো... ৬৫০ নম্বর পাব। কিন্তু তারপরই সে জানতে পারল, এই পরীক্ষা বাতিল। প্রশ্ন ফাঁস হয়ে গিয়েছে, তাই। আরও একবার ফর্ম ফিল আপ করতে হবে। আরও একবার যেতে হবে পরীক্ষার হলে। আরও একবার নিজেকে নিংড়ে দিতে হবে খাতায়। কিন্তু সেই সাহস বা শক্তি কিছুই তার ছিল না। শক্তি বেঁচে ছিল না দেরাদুনের রিয়া কুমারী থাপারও। বন্ধ ঘরে তাকে আর পাওয়া যায়নি। শুধু মিলেছিল ঝুলন্ত, নিথর দেহ। প্রশ্ন ফাঁসের পর যে নিট পরীক্ষার্থীরা ‘অস্বাভাবিক’ মৃত্যুর তালিকায় নাম লিখিয়েছে, তাদের সংখ্যা দশেরও বেশি। এমন মৃত্যু প্রাপ্য ছিল কি তাদের? উত্তর হল, ‘না’। আর এখানে কোনো বোধহয়-এর জায়গা নেই। হ্যাঁ, দায় নেওয়ার জন্য কাঁধ একটা প্রয়োজন। সেটা সরকারের। রাষ্ট্রের।
নিট, সিবিএসই-র বোর্ড পরীক্ষা, ইউপিএসসি, এসএসসি, আরআরবি... জীবনের স্বপ্নপূরণের এক একটি ধাপ। ছাত্রছাত্রীদের। তাদের পরিবারের। তারা ভাবছে, হোক না টাকা খরচ! আমার মেয়েটা ডাক্তার হবে। আমার ছেলেটা আইএএস অফিসার হবে। সেই খরচ কত? রাজস্থানের কোটায় সেদিন একটি সভা করেছেন রাহুল গান্ধী। রাজনৈতিক সভা নয়। বলে দিয়েছিলেন, বিজেপি নিয়ে কোনো কথা হবে না। তিনি শুধু ‘ইন্টার্যাকশন’ করবেন পড়ুয়াদের সঙ্গে। কথা বলবেন ‘সিস্টেম’ নিয়ে। একে একে নিট পরীক্ষার্থী বা ইউপিএসসি পরীক্ষায় বসতে যাওয়া ছেলেমেয়েরা মঞ্চে উঠেছে। তাদের বাবা-মাকে নিয়ে। বলেছে যন্ত্রণার কথা। যে মেয়েটি নিট-ইউজি দেবে, সে মধ্যপ্রদেশের গ্রামাঞ্চল থেকে ছুটেছে দিল্লিতে। সেখানে প্রাইভেট ইনস্টিটিউটে পড়বে। থাকবে হস্টেলে। সব মিলিয়ে খরচ? বছরে ৬ লক্ষ টাকার আশপাশে। সঙ্গে সরকারি ফর্ম ফিল আপের ‘ফি’ তো আছেই। ২২ লক্ষ পরীক্ষার্থীকে ধরে অঙ্ক কষলে এক বছরে নিট পড়ুয়াদের পরিবারই খরচ করেছে ১ লক্ষ ৩২ হাজার কোটি টাকা! আর শিক্ষা খাতে মোদি সরকারের এক বছরের বাজেট বরাদ্দ? ১ লক্ষ ৪০ হাজার কোটি। রাজস্থানের প্রোগ্রামে এই অঙ্কটাই দেখিয়েছেন রাহুল গান্ধী। যদিও সেই অনুষ্ঠান দেশজুড়ে কোনো মিডিয়া সম্প্রচার করেনি। চার লাইনের বেশি লেখেনি। বেশি প্রচার করলে পাছে রাষ্ট্রদ্রোহের কোপ পড়ে! বেরিয়ে আসে ঝুলি থেকে বেড়াল। কিংবা নতুন প্রজন্মের যন্ত্রণা। তাদের পরিবারের হাহাকার।
পাঁচটি পরিসংখ্যান দিয়েছেন রাহুল গান্ধী। ১) নিট: পরীক্ষার্থী ২২ লক্ষ। মোট খরচ ১ লক্ষ ৩২ হাজার কোটি। ২) ইউপিএসসি: পরীক্ষার্থী ৫ লক্ষ। তাঁদের মোট খরচ ২৫ হাজার কোটি টাকা। ৩) এসএসসি: ২ কোটি পরীক্ষার্থী। আর তাঁদের খরচ সব মিলিয়ে ২০ হাজার কোটি। ৪) আরআরবি: ৩ কোটি ৫৮ লক্ষ পড়ুয়া। আর তাঁদের প্রস্তুতি ও পরীক্ষা বাবদ খরচ মোট ৩৬ হাজার কোটি টাকা। ৫) জয়েন্ট এন্ট্রান্স: ১৫ লক্ষ পরীক্ষার্থীর মোট খরচ ১ লক্ষ ৩০ হাজার কোটি টাকা। সব মেলালে সাড়ে তিন লক্ষ কোটি টাকা। প্রতি বছর এই টাকা আমরা খরচ করি... আমাদের ছেলেমেয়েদের শিক্ষার জন্য। তারপরও প্রশ্নপত্র ফাঁস হয়। অপরীক্ষিত প্রযুক্তির মাধ্যমে খাতা দেখা হয়। এবং একের পর এক পড়ুয়া হয় প্রবল ডিপ্রেশনে চলে যান, না হলে আত্মহত্যা করেন। তারপরও অবশ্য শাসকের হুঁশ ফেরে না। বলা ভালো, কিছু আসে-যায় না। রাষ্ট্র তখনও ব্যর্থ এবং গলদে পরিপূর্ণ সিস্টেমকেই তোষামোদ করে। কেন? ওই সিস্টেম যারা চালায়, তারা শাসকেরই তাঁবেদার। কিংবা কোনো না কোনো প্রভাবশালীর সঙ্গে জড়িত। সরকারের প্রত্যেক পদক্ষেপ তার প্রমাণ বহন করে। জলজ্যান্ত উদাহরণ? সিবিএসই। এবার দ্বাদশে ওএসএম বা অন স্ক্রিন মার্কিং ব্যবস্থা চালু করেছিল কেন্দ্রীয় বোর্ড। অর্থাৎ, কোনো শিক্ষক হাতে খাতা দেখবেন না। দেখবে কম্পিউটার সফটওয়্যার। যে সংস্থাকে এর বরাত দেওয়া হয়েছিল, তার নাম ‘কোএম্পট এডু টেক’। এর নেপথ্যে কোনো ‘প্রভাবশালী’ আছেন কি না জানা নেই, কিন্তু অদ্ভুতভাবে তাদের জন্য টেন্ডারের শর্ত শিথিল করা হয়েছিল। প্রযুক্তিগত যোগ্যতামান ‘৫’ থেকে নামিয়ে আনা হয়েছিল ‘৩’-এ। এই সংস্থার ‘অতীত’ও নিষ্কলুশ নয় বলেই অভিযোগ রাহুল গান্ধীর। তাহলে কীসের ভিত্তিতে কোটি কোটি টাকার ডিল করা হল তাদের সঙ্গে? সরকার উত্তর দেয়নি। বরং বলেছে, সমস্যা মনে হলে স্ক্রুটিনি করাও! সেটাও করেছে পড়ুয়ারা। ৪ লক্ষাধিক ছাত্রছাত্রী আবেদন করেছে ডিজিটাল কপি দেখার জন্য। আর ১ লক্ষ ৬০ হাজার পরীক্ষার্থী স্ক্রুটিনির আরজি জানিয়েছে। পাঁচটি বিষয়ে শুধু ডিজিটাল কপি দেখার খরচ মাথাপিছু ৫০০ টাকা। আর স্ক্রুটিনি করলে হাজার থেকে ১২০০ টাকা লাগবেই। তারপর প্রতি প্রশ্নের স্ক্রুটিনির জন্য ২৫ টাকা। এক একজন পড়ুয়া তিন থেকে পাঁচটি প্রশ্নের জন্য আবেদন জানিয়েই থাকে। সেক্ষেত্রে সরকারের কোষাগারে বাড়তি এসেছে ৪০-৫০ কোটি টাকা! নিটের ক্ষেত্রেও কিন্তু যদি স্রেফ পরীক্ষা বাবদ ফি’র হিসাব ধরা হয়, তাহলে সরকারের ঘরে ঢুকেছে ৩০০ কোটি টাকার উপর। একটা বিষয় স্পষ্ট করে বুঝতে হবে—এই টাকা কিন্তু গিয়েছে আমার-আপনার পকেট থেকেই। ডায়াপার থেকে ধূপকাঠি, সর্বত্র আমরা কর গুনব। আবার ছেলেমেয়ের ভবিষ্যতের নামে চলতে থাকা সরকার পোষিত ব্যবসায় ‘লগ্নি’ও করব। এই টাকা কোনো কাটমানির নয়। রক্ত জল করে উপার্জনের। এদেশের অধিকাংশ মধ্যবিত্ত ঘরেও এখন সেই সংস্থান থাকে না যে, বললেই তারা লাখ দশেক টাকা বের করে দিতে পারে। তা সত্ত্বেও ছেলেমেয়ের ভবিষ্যতের কথা ভেবে আমরা করব। কখনো সোনা বা জমি বেচে, সম্পত্তি বন্ধক রেখে, কখনো বা চড়া সুদে ধার করে। কারণ, পরীক্ষার প্রস্তুতির জন্য কোনো ব্যাংক তাদের কম সুদের এডুকেশনাল লোন দেয় না। সেটা পাওয়া যায় ভরতির সময়। তাই ১৮-২০ শতাংশ সুদে তাঁরা ঋণ নিতে বাধ্য হন। এটাই ‘সিস্টেম’। রাষ্ট্রের। শাসকের। তারা কি এ কথা জানে না? জানে। এবং তাতে মদত দেয়। শিক্ষার বেসরকারিকরণ করতে গিয়ে শিক্ষাটাকেই ব্যবসায় বদলে দেওয়া হয়েছে আজকের ভারতে। মোদি জমানায় দেশজুড়ে প্রায় ১ লক্ষ সরকারি স্কুল বন্ধ হয়ে গিয়েছে। বেসরকারি স্কুলের বেতন গ্রীষ্মের পারদের মতো চড়ছে প্রতি বছর। তাও ভিড় বাড়ছে সেখানেই। ‘সিস্টেম’ বাধ্য করছে। বেসরকারি কলেজ বা বিশ্ববিদ্যালয়ে একটা ভালো বিষয় নিয়ে পড়তে গেলেও এখন ৫-৬ লক্ষ টাকা খরচ। আমরা সেটাও মেনে নিয়েছি। ছেলেমেয়ের মুখ চেয়ে। মেনে নিয়েছি এই ‘সিস্টেম’কে। আকাঙ্ক্ষা বা রিয়া এই প্রেশার কুকারে সেদ্ধ হতে না পেরে মাঝরাস্তায় লড়াই ছেড়ে দিলেও আমরা চুপ থাকি। তখন সাধারণ বুদ্ধিজীবী থেকে সেলেব... কারও মুখে এর নিন্দা শোনা যায় না। কেউ সিস্টেম পালটানোর ডাক দেয় না। অথচ, শিক্ষা এবং নতুন প্রজন্মের স্বপ্নপূরণ—যে কোনো রাষ্ট্রের দায়িত্বের মধ্যেই পড়ে। প্রস্তুতি থেকে ডিগ্রি লাভ, যে কোনো ভদ্রসভ্য দেশে একজন পড়ুয়ার সব মিলিয়ে খরচ তাদের অঙ্কে ৫০ হাজার থেকে আড়াই লক্ষের মধ্যে থাকে। সেই দায়িত্ব নেয় সরকারই। এই একই ‘সিস্টেম’ কেন ভারতে হবে না? কেন সরকার নতুন প্রজন্মের স্বপ্নপূরণের দায়িত্ব নেবে না। তারা তো ভবিষ্যতে দেশেরই নাম উজ্জ্বল করবে। উন্নততর ভারত হিসাবে গড়ে তুলবে। নাগরিকের অধিকার কেড়ে নিয়ে তাকেই কাঠগড়ায় তোলা যায় না। গণতন্ত্রের সংজ্ঞা সে কথা বলে না। আর আমাদের জেন-জি তা বিলক্ষণ জানে। বোঝে। তারা কিন্তু ফুঁসছে। হিসাব কষছে প্রত্যেক পাওয়া-না পাওয়ার। তারাই এখন ভারতের জনসংখ্যার প্রায় ৪০ শতাংশ। তারা ‘সিস্টেমে’র ক্রীতদাস হয়ে থাকতে রাজি নয়। এই প্রজন্ম চায় সিস্টেমের পরিবর্তন। তাদের লক্ষ্য একটাই—শাসক হবে নাগরিকের জন্য। নাগরিক শাসকের জন্য নয়। এই অধিকার প্রতিষ্ঠায় তারা যতদূর হোক যেতে প্রস্তুত। সাধু... সাবধান।