পি চিদম্বরম: ২০২৬ সালের ৯ জুন বা তার কাছাকাছি সময়ে বেশকিছু ইংরেজি ও তামিল সংবাদপত্রে—এবং সম্ভবত ভারতের সমস্ত সংবাদপত্রে—নরেন্দ্র মোদি সরকারের গত ১২ বছরের সাফল্যের তালিকা সংবলিত একটি পাতাজোড়া বিজ্ঞাপন প্রকাশিত হয়।
পি চিদম্বরম: ২০২৬ সালের ৯ জুন বা তার কাছাকাছি সময়ে বেশকিছু ইংরেজি ও তামিল সংবাদপত্রে—এবং সম্ভবত ভারতের সমস্ত সংবাদপত্রে—নরেন্দ্র মোদি সরকারের গত ১২ বছরের সাফল্যের তালিকা সংবলিত একটি পাতাজোড়া বিজ্ঞাপন প্রকাশিত হয়।
তাৎপর্যপূর্ণ মাইলফলক
বারো বছর একটি তাৎপর্যপূর্ণ মাইলফলক। মোদি সরকার ২০১৪ সালে প্রথমবার, ২০১৯ সালে দ্বিতীয়বার এবং ২০২৪ সালে তৃতীয়বার নির্বাচিত হয়েছে। তবে উল্লেখযোগ্যভাবে কম সংখ্যক আসন পেয়েছে চব্বিশে। নরেন্দ্র মোদির এই কার্যকালকে কোনো ‘নির্বাচিত’ প্রধানমন্ত্রীর ‘দীর্ঘতম মেয়াদ’ হিসাবে তুলে ধরেছে বিজেপি। সম্পূর্ণ অপ্রয়োজনীয়ভাবে, তারা তাঁর এই মেয়াদকে জওহরলাল নেহরুর মেয়াদের সঙ্গে তুলনা করেছে। কোনো তুলনা ছাড়াই বলা যায়, ১২ বছরের কার্যকাল নিঃসন্দেহে ঈর্ষণীয়। সকলেই জানেন যে নেহরু ছিলেন স্বাধীন ভারতের প্রথম প্রধানমন্ত্রী। তিনি ১৯৫২, ১৯৫৭ ও ১৯৬২ সালের নির্বাচনে জয়ী হন এবং ১৭ বছর ধরে প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন। এখনো পর্যন্ত দীর্ঘতম সময়ের জন্য প্রধানমন্ত্রী পদে আসীন থাকার কৃতিত্ব তাঁরই।
যেকোনো সরকারেরই নিজেদের সাফল্য দাবি করার অধিকার রয়েছে এবং অতিরঞ্জিত প্রচার বা বাগাড়ম্বর অল্পস্বল্প হলে মেনে নেওয়া হয়। কিন্তু এই সংক্রান্ত বিজ্ঞাপনগুলি সেই অতিরঞ্জনের মাত্রাও ছাড়িয়ে গিয়েছিল। মোদির অতিরঞ্জিত দাবিগুলির অসারতা দেশবাসী বুঝে গিয়েছিল দু-বছর আগেই। সেইমতো লোকসভায় বিজেপিকে আটকে দিয়েছিল ২৪০ আসনে। এজন্য শাসক দল একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা প্রাপ্তি থেকে বঞ্চিত হয়েছিল। তার দু-বছর পরেও সেই একই ধরনের দাবি করা হচ্ছে!
কোনো বিদ্বেষ ছাড়াই
কোনো বিদ্বেষ ছাড়াই, দাবিগুলির মধ্য থেকে কয়েকটি উদাহরণ তুলে ধরে আমি দেখাতে চাই যে বিষয়গুলি আসলে কী:
৩ কোটি ‘লাখপতি দিদি’!
সরকারি সংজ্ঞা অনুযায়ী, ‘লাখপতি দিদি’ হলেন কোনো স্বনির্ভর গোষ্ঠীর (এসএইচজি) একজন নারী সদস্য। ২০২৫ সালের আগস্ট মাসে জানানো হয়েছিল যে—১ কোটি ৪৮ লক্ষ স্বনির্ভর গোষ্ঠীর সদস্য ‘লাখপতি দিদি’ হয়েছেন। ২০২৬ সালের মার্চ মাসে সংসদে উত্থাপিত এক প্রশ্নের জবাবে দাবি করা হয় যে, ৩ কোটি ৭ লক্ষ ৩৩ হাজার ৮২০ জন স্বনির্ভর গোষ্ঠীর সদস্য নিজেরাই ঘোষণা করেছেন যে তাঁরা ‘লাখপতি দিদি’। মোদি জমানার অনেক আগে থেকেই স্বনির্ভর গোষ্ঠীর আন্দোলন চলে আসছে। এটি অবশ্যই মহিলাদের ক্ষমতাশালী করেছে এবং জুগিয়েছে তাঁদের বেশি রোজগারের দক্ষতা। কিন্তু মোদি সরকার ৩ কোটি ‘লাখপতি দিদি’ তৈরি করেছে—এমন দাবি করাটা বেশ অতিরঞ্জিত। এই দাবিটি কি কোনো নিরপেক্ষ অডিটে নিশ্চিত করা হয়েছে? এই ব্যাপারে আমার সংশয় রয়েছে।
আসুন দাবিটি একটু বিশদভাবে খতিয়ে দেখা যাক। ভারতে কর্মক্ষম বয়সি মহিলার (১৫ বছর এবং তার ঊর্ধ্বে) সংখ্যা ৫৩ কোটি এবং শ্রমশক্তিতে নারীর অংশগ্রহণ (৪১.৭ শতাংশ হারে) প্রায় ২২ কোটি—অর্থাৎ, এই সংখ্যক নারী হয় কর্মরত অথবা সক্রিয়ভাবে কাজের সন্ধান করছেন। যদি ৩ কোটি ‘লাখপতি দিদি’র দাবিটিকেই সত্য বলে মেনে নিই, তবে শ্রমশক্তির অংশ প্রতি সাতজন নারীর মধ্যে একজনই ‘লাখপতি’! স্বনির্ভর গোষ্ঠীর সদস্যদের (যাদের প্রায় সকলেই মহিলা) সংখ্যা আনুমানিক ৯-১০ কোটি। এর অর্থ হল, স্বনির্ভর গোষ্ঠীর প্রতি তিনজন সদস্যের মধ্যে একজনই ‘লাখপতি’!
আসল সত্যটি অন্যত্র—এই দাবিটি সংশ্লিষ্ট মহিলার নিজস্ব নিট সম্পদের উপর ভিত্তি করে করা হয়নি, বরং এটি তাঁর পরিবারের বার্ষিক আয়ের ভিত্তিতে দেখানো হয়েছে। এই দাবিতে একটি বিষয় গোপন রাখা হয়েছে যে, পরিবারের অন্য সদস্যরাও আয় করতে পারেন এবং ওই পরিবারের মোট বার্ষিক আয় হয়তো আগে থেকেই ১ লক্ষ টাকা ছিল, যেখানে সংশ্লিষ্ট মহিলার আংশিক আর্থিক অবদানও হয়তো রয়েছে। পরিবারের বার্ষিক আয় ১ লক্ষ টাকা হওয়াটা কোনো বিরল বা অস্বাভাবিক ঘটনা নয়। বস্তুত, যে-দেশে মাথাপিছু বার্ষিক আয় ২ লক্ষ ৫ হাজার ৩২৪ টাকা, সেখানে এমন আয় খুবই সাধারণ একটি বিষয়। স্বনির্ভর গোষ্ঠীর সদস্যদের মধ্য থেকে সরকার ৩ কোটি ‘লাখপতি দিদি’ তৈরি করেছে—এই দাবিটি তাই ভিত্তিহীন।
চালু বিমানবন্দরের সংখ্যা ৭৪ থেকে বেড়ে ১৬৪
প্রতি বছরই পরিকাঠামো গড়ে তোলা হচ্ছে। এর মধ্যে রয়েছে ভারতীয় বিমানপত্তন প্রাধিকরণের (এএআই) মালিকানাধীন বিমানবন্দর, সরকার ও বেসরকারি সংস্থার যৌথ উদ্যোগ বা পিপিপি মডেলের বিমানবন্দর এবং বেসরকারি বিমানবন্দর। সংখ্যা হিসাবে ১৬৪ সঠিক। কিন্তু মূল বিচার্য বিষয়টি হল—সেগুলি ‘অপারেশনাল’ বা ‘চালু’ কি না। সাধারণ মানুষের ধারণা অনুযায়ী, একটি চালু বিমানবন্দরে নিয়মিত বাণিজ্যিকভাবে যাত্রীবাহী বিমান চলাচল করে। সেই বিচারে সরকারের দাবিটি সত্য নয়। কারণ এই তালিকার অন্তর্ভুক্ত অনেক বিমানবন্দরই মূলত প্রতিরক্ষা, পণ্য পরিবহণ (কার্গো) কিংবা প্রশিক্ষণের কাজে ব্যবহৃত হয়। ওই এয়ারপোর্টগুলিতে নিয়মিত বাণিজ্যিকভাবে যাত্রীবাহী বিমান চলাচল করে না।
‘উড়ান’ প্রকল্পের আওতায় বেশকিছু ছোটো বিমানবন্দর চালু করা হয়েছিল এবং যাত্রী পরিষেবা শুরু হয়েছিল সেগুলিতে। বিমান সংস্থাগুলির জন্য ৭৭৪টি রুটের প্রস্তাব দেওয়া হলেও সিএজির তথ্য অনুযায়ী, ৪০৩টি রুটে কোনো বাণিজ্যিক পরিষেবা শুরুই হয়নি। সিএজি আরো জানিয়েছে যে, তিনবছরের সাবসিডি পিরিয়ডে বা ভরতুকি মেয়াদে মাত্র ১১২টি রুটে পরিষেবা চালু ছিল এবং ভরতুকি বন্ধ হওয়ার পর রুট টিকে ছিল ৫৪টি মাত্র। ২০২৫ সালে সরকার স্বীকার করে নিয়েছিল যে, ‘উড়ান’ প্রকল্পের আওতাভুক্ত ১৫টি বিমানবন্দর নন-অপারেশনাল (অকেজো বা বন্ধ) হয়ে গিয়েছে।
শিল্পমহলের হিসাব অনুযায়ী, বর্তমানে অপারেশনাল বা চালু বিমানবন্দরের সর্বমোট সংখ্যা ১২০।
১৯ হাজারের বেশি ‘জন ঔষধি’ কেন্দ্র
‘জন ঔষধি’ কেন্দ্র কর্মসূচিটি ২০০৮ সালে শুরু হলেও ২০১৩ সালে তা ব্যর্থ হয়। ‘ব্যবসা করা সরকারের কাজ নয়’—এই নীতি ঘোষণার পর, ন্যায্যমূল্যে যথাযথ মানের ওষুধ সরবরাহের লক্ষ্যে মোদি সরকার ২০১৫ সালে ফ্র্যাঞ্চাইজি মডেলের মাধ্যমে কর্মসূচিটি নতুন করে সাজায় এবং চালু করে। ওষুধের গুণমান নিয়ন্ত্রণ করে থাকে ড্রাগস কন্ট্রোলার জেনারেল অফ ইন্ডিয়া (ডিজিসিআই) এবং রাজ্যগুলির ওষুধ নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ। অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের দাম ন্যাশনাল ফার্মাসিউটিক্যাল প্রাইসিং অথরিটি (এনপিপিএ) নিয়ন্ত্রণ করে। লিগ্যাল মেট্রোলজি রুলস বা আইনি পরিমাপ বিধি অনুযায়ী, প্রতিটি প্যাকেটের গায়ে সর্বোচ্চ খুচরো মূল্য (এমআরপি) পরিষ্কারভাবে লিখে দেওয়া বাধ্যতামূলক।
ছোটো ব্যবসায়ীদের মালিকানাধীন ও পরিচালিত লক্ষ লক্ষ বেসরকারি খুচরো ওষুধের দোকান রয়েছে। বহু বড়ো ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানও খুচরো বিক্রয় এবং হোম ডেলিভারি মডেল নিয়ে প্রবেশ করেছে এই বাজারে। শিল্পমহলের হিসাব অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ সালে খুচরো ওষুধের ব্যবসার মোট লেনদেনের পরিমাণ ছিল ২ লক্ষ ২৫ হাজার কোটি টাকা। ২০২৪-২৫ অর্থবর্ষে জন-ঔষধি ফার্মাসিগুলির সম্মিলিত বিক্রয়মূল্য (এমআরপি বা সর্বোচ্চ খুচরো মূল্য অনুযায়ী) ছিল ২,০২২ কোটি টাকা। অঙ্কটি বাজারে সর্বমোট বিকিকিনির মাত্র ১ শতাংশেরও নীচে। সরকার প্রতিবছর এতে কোনো লোকসান বহন করছে কি না, তা আমাদের জানা নেই। যদি ওষুধগুলির গুণমান ও দাম সন্তোষজনক না-হয়, তবে তা সংশ্লিষ্ট দুই নিয়ন্ত্রক সংস্থার ব্যর্থতা হিসাবেই গণ্য হবে।
সরকারের কর্মসূচিগুলি মোটামুটি সফল। সরকার এই ব্যাপারে প্রকৃত তথ্যাদি প্রকাশ করলে বিশ্বাসযোগ্যতা বাড়বে। কিন্তু অতিরঞ্জিত প্রচারে কোনো লাভ নেই।
• লেখক সাংসদ ও ভারতের প্রাক্তন অর্থমন্ত্রী। মতামত ব্যক্তিগত