‘তোলাবাজি’ শব্দটি একসময় ছিল বঙ্গ বিজেপির রাজনৈতিক অভিধানের সবচেয়ে ধারালো অস্ত্র। তৃণমূলের বিরুদ্ধে একের পর এক সভায় এই শব্দ উচ্চারণসহ পরিবর্তনের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল। বলা হয়েছিল—সিন্ডিকেটরাজ নির্মূল হবে, কাটমানি হবে অতীত আর রাজনৈতিক দাদাগিরি করার সাহস কারও থাকবে না। মানুষ বিশ্বাস করেছিল—তৃণমূল বিদায় নিয়ে বিজেপি এলে অন্তত পুরানো রোগটির চিকিৎসা হবে। এখন দেখা যাচ্ছে—রোগ সারেনি, স্রেফ রোগীরই হাতবদল হয়েছে! অভিযোগ সত্যি হলে ক্ষমতায় আসার মাত্র তিনমাসের মধ্যে বঙ্গ বিজেপির নীচুতলা থেকে উপরতলা পর্যন্ত—তোলাবাজি, দুর্নীতি এবং দলীয় শৃঙ্খলাভঙ্গের অভিযোগ ছড়িয়ে পড়া নিছক সাংগঠনিক সমস্যা নয়, এটি রাজনৈতিক বিশ্বাসযোগ্যতার গোড়ায় আঘাত। যে-দল অন্যের বিরুদ্ধে দুর্নীতির নালিশ নিয়ে জনতার দরজায় দরজায় গিয়েছিল, অল্পদিনে তার নিজেরই দরজায় যদি একই অভিযোগ কড়া নাড়ে, তবে সেটিকে ‘বিরোধীদের অপপ্রচার’ বলে দায় এড়ানো যায় না। বরং তখন প্রশ্ন উঠবে—ক্ষমতার চরিত্র বদলেছে, না শুধু ক্ষমতাসীনদের নাম? দিল্লি নড়েচড়ে বসেছে—এটিই সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ। পরিষ্কার যে রাজ্য নেতৃত্ব পরিস্থিতি সামলাতে ব্যর্থ। তাই সর্বভারতীয় সভাপতিকে তিনদিনের সফরে এসে পাহাড় থেকে ডুয়ার্স, উত্তরবঙ্গ থেকে দক্ষিণবঙ্গ চষে বেড়িয়ে সংগঠনের হিসাব নিতে হবে। অতএব বোঝাই যায়, সমস্যা কেবল কয়েকজন স্থানীয় নেতৃত্বের নয়, গভীর ফাটল ধরে গিয়েছে সাংগঠনিক ভিতেই। দিল্লির নেতারা যদি রিপোর্ট নেন, অঞ্চল ধরে ধরে বৈঠক করেন, কর্মীদের মুখোমুখি হন, তবে সেই রিপোর্টে কেবল ভোটের অঙ্ক নয়—ক্ষমতার অঙ্কও থাকবে। তার উপর জমা হয়েছে বিদ্রোহী তৃণমূল সাংসদদের ঘিরে দলীয় কোন্দল। কার ঘনিষ্ঠ কে প্রার্থী হবে, কে টিকিট পাইয়ে দেবে, কে লবি করবে—রাজনীতি যদি ক্রমশ এই দর-কষাকষির বাজারে পরিণত হয়, তবে ‘আদর্শ’ শব্দটি পার্টি অফিসের দেওয়ালে সাঁটা একটি পুরানো পোস্টার মাত্র!
আর এখানেই দিল্লির নতুন বার্তার তাৎপর্য। কলকাতা এবং হাওড়া পুরভোটে বিদ্রোহী তৃণমূল সাংসদদের সুপারিশে কাউকে প্রার্থী না করার সতর্কতা নিছক প্রার্থী বাছাইয়ের নির্দেশ নয়, এটি আসলে দলের ভিতরে ক্ষমতার সমান্তরাল কেন্দ্র তৈরির বিরুদ্ধে কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের লাল কার্ড। অর্থাৎ দিল্লি বুঝতে পারছে, ক্ষমতার লোভ শুধু বিরোধী শিবিরের সঙ্গে সংঘাত তৈরি করছে না, দলের শরীরেও মারণ সংক্রমণ ঘটাচ্ছে। সবচেয়ে ভয়ংকর জায়গাটি অবশ্য অন্যত্র। আদি কর্মীদের প্রশ্ন—শৃঙ্খলা কোথায়? যে কর্মীরা বছরের পর বছর বিরোধিতার রাজনীতি করেছেন, তাঁরা যদি দেখেন ক্ষমতার দরজা খুলতেই নতুন মুখ, নতুন স্বার্থ, নতুন দালালি এবং পুরানো তোলাবাজির অভিযোগ ঢুকে পড়ছে, তাঁদের ক্ষোভকে কি শুধু ‘অসন্তোষ’ বলে থামানো যাবে? কারণ ক্ষমতা যত দ্রুত আসে, তার সঙ্গে প্রলোভনেরও অনুপ্রবেশ ঘটে ততটাই তৎপরতার সঙ্গে। বিরোধী দলের কর্মী হিসাবে যে নেতা ‘দুর্নীতির বিরুদ্ধে লড়াই’ করেন, ক্ষমতাসীন দলের নেতা হয়ে তাঁর সামনে তখন আসে টেন্ডার, নিয়োগ, পুরসভা, ঠিকাদারি, জমি, লাইসেন্স, দলীয় সুপারিশ—অর্থাৎ ক্ষমতার অসংখ্য জানালা। সেই জানালাগুলিতে যদি পাহারা না-থাকে, তবে ‘পরিবর্তন’ খুব দ্রুত ‘পুরানো ব্যবস্থার নতুন সংস্করণে’ পরিণত হয়।
বিজেপির জন্য বিপদটি তাই শুধু তোলাবাজির অভিযোগ নয়। বিপদ এটাই—মানুষ মনে করতে শুরু করবে যে, শাসক দলই বদলেছে মাত্র, বদলায়নি রাজনীতির নষ্টসংস্কৃতি। সেই ধারণা একবার জনমনে পোক্ত হয়ে গেলে দিল্লির কোনো পর্যবেক্ষক, কোনো সাংগঠনিক বৈঠক, কোনো কেন্দ্রীয় নেতা তা সহজে মুছে দিতে পারবেন না। রাজনীতি ক্ষমতা দখলের হাতিয়ার নয়, ক্ষমতাসীন হয়ে নিজের ঘোষিত নীতির পরীক্ষা দেওয়ার একটি বিশ্বাসযোগ্য ব্যবস্থা। তিনমাসেই যদি ‘তোলাবাজি’ শব্দটি দলের ঘাড়ে চেপে বসে, তবে দিল্লি যতই ‘সামাল’ দিতে আসুক, আসল সামাল দিতে হবে বিশ্বাসযোগ্যতাকে। কারণ মানুষ তোলাবাজির বিরুদ্ধে ভোট দিয়েছিল, তোলাবাজির নতুন ঠিকানা নির্মাণের জন্য নয়। পুরানো স্লোগানের জায়গায় নতুন মুখ বসিয়ে পুরানো সংস্কৃতি ফিরিয়ে দিলে জনতা একদিন প্রশ্ন করবেই—পরিবর্তনটা হয়েছিল তবে কার? আর সেই প্রশ্নের উত্তর মঞ্চে দাঁড়িয়ে দেওয়া যাবে না। দিতে হবে কাজের খাতায়। দিতে হবে নিজের দলের ‘কীর্তিমানদের’ বিরুদ্ধে কঠোরতম ব্যবস্থা নিয়ে। জবাব দিতে হবে সমস্ত অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত করে। দিতে হবে টিকিটের লবি, তদবির আর ক্ষমতার দালালি সবরকমে বন্ধ করে। না-হলে ‘তোলাবাজি-বিরোধী’ বিজেপির সবচেয়ে বড়ো রাজনৈতিক ব্যঙ্গচিত্রটি আর বিরোধীরা আঁকবে না—আঁকবে সময় নিজেই।