ড. সমিত রায়: এখন কলেজ স্তরে পড়াশোনার ক্ষেত্রে একটা ক্রাইসিস চলছে। দেখা যাচ্ছে, জেলা বা বড়ো শহরগুলিতে অবস্থিত সরকারি ও বেসরকারি কলেজ, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলিতে বেসিক সায়েন্স ও বেসিক লিটারেচার পড়ার ক্ষেত্রে ছাত্রছাত্রী পাওয়া যাচ্ছে না। পড়ুয়াদের অনেকেই বেসিক সায়েন্স ও বেসিক লিটারেচার সাবজেক্টগুলিতে ডিগ্রি অর্জনের জন্য ততটা আগ্রহী হচ্ছে না। যেমন, ফিজিক্স, কেমিস্ট্রি, ম্যাথমেটিক্স, স্ট্যাটিসটিক্স, ইংরেজি, বাংলা, ইকনমিক্স, জিওগ্রাফি-সহ কয়েকটি সাবজেক্টে এখনকার ছেলেমেয়েদের অনেকেই অনার্স পড়তে চাইছেন না। এর একটা বড়ো নেপথ্য কারণ হল, জেলা ও শহরতলির
বিশাল সংখ্যক ছাত্রছাত্রীর বদ্ধমূল ধারণা, বেসিক সায়েন্স বা বেসিক লিটারেচারে অনার্স পড়ার পর চাকরির সুযোগ তেমন নেই। সেই তো প্রাইমারি স্কুল বা হায়ার সেকেন্ডারি স্কুলে শিক্ষকতার চাকরির জন্য অনন্তকাল ধরে অপেক্ষা করতে হবে। কবে স্কুল সার্ভিস কমিশনের বিজ্ঞপ্তি বেরবে তার জন্য ধৈর্যের পরীক্ষা দিতে হবে। কিন্তু আমরা কেউই খবর রাখি না যে, বেসিক সায়েন্সের বা বেসিক লিটারেচার নিয়ে পড়াশোনা করলে আরও কত রকমের জীবিকার অপশন আছে। কত রকমভাবে নিজের ভবিষ্যৎ গড়ে তোলা সম্ভব। সাবজেক্টের উপর যদি ভীষণ ভালো দখল ও দক্ষতা থাকে তা হলে অ্যাকাডেমিক হোক বা প্রফেশনাল, যেকোনো ক্ষেত্রে জীবিকার দরজা খোলা রয়েছে যোগ্য চাকরিপ্রার্থীর জন্য। এর উদাহরণ রয়েছে অনেক।
যাঁরা ভাবছেন, বেসিক সায়েন্স বা বেসিক লিটারেচার নিয়ে পড়াশোনা করে শুধুমাত্র স্কুল সার্ভিস কমিশন বা কলেজ সার্ভিস কমিশন বা নেট পরীক্ষার মাধ্যমে শিক্ষকতা বা অধ্যাপনা পেশায় যাওয়া ছাড়া উপায় নেই তাঁরা ভুল ভাবছেন। গত ৩০ থেকে ৪০ বছর ধরে আমার মতো অনেকেই লক্ষ্য করেছেন, যখনই যুগোপযোগী পেশাদার কোনো কোর্স এসেছে, যখনই কোনো জীবিকামুখী সম্ভাবনাময় নতুন কোর্স ইউজিসি নিয়ে এসেছে, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়গুলিতে চটজলদি সেই কোর্সের সিলেবাস ও পড়াশোনা রপ্ত করতে পেরেছেন সেইসব পড়ুয়াই, যাঁদের বিজ্ঞান ও সাহিত্যে ভিত্তিটা খুব মজবুত ছিল বা আছে। অর্থাৎ বেসিক সায়েন্স ও বেসিক লিটারেচারের উপর গভীর জ্ঞান থাকলে প্রযুক্তি নির্ভর আধুনিক কোর্সগুলি সহজেই কোনো পড়ুয়া আয়ত্ত করতে পারবেন। অ্যাস্ট্রোফিজিক্স, বায়োটেকনোলজি, ফরেন্সিক সায়েন্স, ফার্মেসি, জিওইনফরমেটিক্স, ব্লু ইকোনমি’র মতো আধুনিক কোর্সগুলি পড়ার সময় তাঁদেরই কেউ কেউ বিষয়টা দ্রুত আয়ত্ত করতে পারবেন যাঁরা ফিজিক্স, কেমিস্ট্রি, বায়োলজি খুব ভালো করে পড়েছেন এবং সাবজেক্টগুলিতে বেশ ভালো মার্কস পেয়েছেন। ইন্ডাস্ট্রিতে নিজের দক্ষতা ও উপস্থিতির ছাপ রাখতে গেলে বেসিক সায়েন্স ও বেসিক লিটারেচারের সাবজেক্টগুলিতে স্কুল ও কলেজ স্তরে ভালো মার্কস পেতে হবে এবং গভীর জ্ঞান থাকতে হবে।
উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, আগামী দিনে স্পেস সায়েন্স বা স্পেস ট্যুরিজ়ম, সোলার এনার্জি নিয়ে যাঁরা পড়াশোনা করবেন তাঁদের এখন থেকেই লক্ষ্য হওয়া উচিত তাঁদের যেন ফিজিক্সে গভীর জ্ঞান থাকে। কারণ যে শিল্প সংস্থা ও বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানগুলিতে তাঁরা চাকরি করবেন সেখানে কিন্তু সাবজেক্টের উপর ভীষণ রকমের দক্ষতা ও গভীর জ্ঞানের দরকার হবে। আর বেসিক সায়েন্সের উপর ভালো পড়াশোনা না থাকলে এই দক্ষতা, গভীর জ্ঞান রাতারাতি তৈরি হবে না।
গত তিন চার বছরের প্রবণতা হল, কেমিস্ট্রি অনার্স কেউ পড়তে চান না। সবাই আধুনিক জীবিকামুখী সাবজেক্ট পড়তে চান, দ্রুত একটা চাকরি হাসিল করতে চান। কিন্তু পড়ুয়া ও অভিভাবকদের সবিনয়ে স্মরণ করিয়ে করিয়ে দিই, ভারত হল বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম ভ্যাকসিন উৎপাদনকারী দেশ। কেমিস্ট্রি অনার্সে ভালো জ্ঞান থাকলে তবেই তো তিনি বায়োকেমিস্ট্রি, ফার্মেসি, বায়োটেকনোলজি, বায়োমেডিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং নিয়ে পড়াশোনাটা ভালো করে করতে পারবেন। ভারতে ভ্যাকসিন ইন্ডাস্ট্রি খুবই সম্ভাবনাময়। কেমিস্ট্রি বিষয়ের পড়ুয়াদের কাজের সুযোগ অনেক বাড়ছে। ওষুধ ও ভ্যাকসিন উৎপাদনকারী সংস্থাগুলিতে কেমিস্ট্রি অনার্স ডিগ্রির পড়ুয়াদের নিয়োগ করা হচ্ছে। শিল্প সংস্থাগুলি যখন বিভিন্ন বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় বা কলেজে নিয়োগের জন্য ভিজ়িট করেন তখন তাঁরা কেমিস্ট্রি, ফিজিক্স ও বায়ো সায়েন্সের পড়ুয়াদের নিয়োগ করার ব্যাপারে বেশি আগ্রহী হন। কিন্তু এখন তাঁদের চাহিদা মতো আমরা ভালো মেধাবী পড়ুয়া সরবরাহ করতে পারছি না। আসলে এখন বেসিক সায়েন্সের ভালো ছাত্রছাত্রী কলেজগুলিতে তেমন নেই। এর কারণ বেসিক সায়েন্সে ভর্তিই হচ্ছেন খুব কম সংখ্যক পড়ুয়া।
ভ্যাকসিনের মতোই আরেকটি বিরাট সম্ভানাময় ক্ষেত্র হল ব্লু ইকনমি বা নীল অর্থনীতি। সমুদ্রের নীল জলকে কেন্দ্র করে রয়েছে সমুদ্র সম্পদ নির্ভর নানা ধরনের জীবিকা। বায়ো সায়েন্সের ছাত্রছাত্রীদের কাজের সুযোগ আরও বাড়তে চলেছে। সমুদ্রের বাস্তুতন্ত্র, সমুদ্র নির্ভর অর্থনীতি, সমুদ্রের দূষণ প্রতিরোধ এবং অবশ্যই বায়োলজি নিয়ে গভীর জ্ঞান থাকলে দেশে বিদেশে উচ্চ বেতনের চাকরি পেতে পারেন বায়ো সায়েন্সের পড়ুয়ারা।
দেশে বিদেশে ব্যাংকিং সেক্টরে, আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলিতে, শেয়ার বাজারে, নানা সংস্থায় আর্থিক পরামর্শদাতা হিসেবে ভারতের অর্থনীতির ছাত্রছাত্রীদের বিরাট চাহিদা রয়েছে। কিন্তু বেসিক ইকনমিক্স নিয়ে এখন অনেকেই পড়াশোনা করতে চান না। এই প্রবণতা নিশ্চিত চাকরির সুযোগ হাতছাড়া করছে। সাবজেক্টের বেসিক লেভেল নিয়ে পড়াশোনা না করায় আখেরে ক্ষতি হচ্ছে দেশের ভবিষ্যতের। সেই সঙ্গে পড়ুয়ার নিজের কেরিয়ারেরও। লেখক চ্যান্সেলর অ্যাডামাস ইউনিভার্সিটি (মতামত ব্যক্তিগত)