বয়স মাত্র ৪৫ দিন। এরই মধ্যে রাজ্যের প্রথম বিজেপি সরকারের একের পর এক সিদ্ধান্তকে ঘিরে বিতর্ক দানা বাঁধতে শুরু করেছে। তৃণমূল সরকারকে পর্যুদস্ত করে তৈরি হওয়া ডবল ইঞ্জিন সরকারের কাছ থেকে এমন পরিবর্তন কাম্য কি না, সেই প্রশ্নও উঠতে শুরু করেছে। বিধানসভা নির্বাচনের আগে বিজেপির প্রতিশ্রুতি ছিল, তারা সরকারে এলে আগের আমলের জনকল্যাণমূলক প্রকল্পগুলি চালু রাখবে। অভিযোগ উঠেছে, সেই প্রতিশ্রুতি রক্ষা আগের মতো হচ্ছে না। যেমন, মহিলাদের জন্য অন্নপূর্ণা যোজনা প্রকল্প চালু হলেও আগের আমলের লক্ষ্মীর ভাণ্ডারের বহু প্রাপক বাদ পড়ছেন নানাবিধ শর্তের কারণে। একইভাবে চার বছর বন্ধ থাকার পর রাজ্যে ১০০ দিনের কাজের প্রকল্প চালু হলেও তার সুফল এখনও গোটা রাজ্যে কার্যকর করা যায়নি। আবার বছরে পরিবার পিছু ৫ লক্ষ টাকা বিমার কেন্দ্রীয় প্রকল্প আয়ুষ্মান ভারত এরাজ্যে চালু হলেও আগের স্বাস্থ্যসাথী বিমা প্রকল্পের আওতাভুক্ত বহু প্রাপক শর্তের কারণেই সেই সুবিধা থেকে বঞ্চিত হতে চলেছেন! নতুন সরকার শহর থেকে রেলস্টেশনে বুলডোজার চালিয়ে বেআইনি দখলমুক্তি অভিযান শুরু করেছে। এতে হাজার হাজার হকার রাতারাতি প্রায় সর্বস্ব খুইয়ে পথে বসেছেন। উপযুক্ত পুনর্বাসনের ব্যবস্থা না করে কেন গরিব মানুষের রুটি-রুজি কেড়ে নেওয়া হচ্ছে—তা নিয়েও বিতর্ক চলছে। অভিযোগ উঠেছে, রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে বেছে বেছে মুসলিম এলাকায় বেআইনি নির্মাণ ভাঙতে এই সরকার যতটা তৎপর, সর্বত্রই সেই সদিচ্ছা দেখা যাচ্ছে না।
এই বিতর্কের আগুনে ঘি পড়েছে ২০ জুন রাজ্যের জন্মদিন পালন ও পশ্চিমবঙ্গ গঠনে শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের ভূমিকা নিয়ে। আগে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সরকার বাঙালির সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য ও পরম্পরার যুক্তি দেখিয়ে ১ বৈশাখ (১৫ এপ্রিল) ‘বাংলা দিবস’ পালনের সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। কিন্তু ১ বৈশাখের ঐতিহ্যের সঙ্গে পশ্চিমবঙ্গের জন্মদিনের কী সম্পর্ক— তা নিয়ে সেইসময় বিস্তর প্রশ্ন উঠেছিল। বিজেপির পালটা যুক্তি ছিল, ১৯৪৭ সালের ২০ জুন তারিখেই অবিভক্ত বাংলার তৎকালীন প্রদেশিক আইনসভায় পশ্চিমবঙ্গকে পৃথক রাজ্য হিসাবে ভারতের অন্তর্ভুক্ত করার সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। সুতরাং পশ্চিমবঙ্গের জন্ম হয়েছে সেদিনই। আর ‘হিন্দুদের’ হোমল্যান্ড তৈরির এই যজ্ঞে প্রধান পুরোহিত ছিলেন শ্যামাপ্রসাদ। সেই অর্থে তিনি পশ্চিমবঙ্গ নামক রাজ্যটি তৈরির মূল কারিগর। রাজ্যের নতুন বিজেপি সরকার তাই এবার ঘটা করে শ্যামাপ্রসাদের অবদানকে বিশেষ মর্যাদা দিয়ে ‘পশ্চিমবঙ্গ দিবস’ পালন করেছে রাজ্যজুড়ে। এই সরকারি উদ্যোগে অংশ নিয়েছেন স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। কিন্তু বিজেপির এই দাবি মানতে নারাজ একাধিক বিরোধী দল। তাদের পালটা যুক্তি, প্রথমত বহু রক্তপাত, যন্ত্রণার বিনিময়ে বাংলা ভাগ হয়েছে। তাই এটা উৎসবের দিন হতে পারে না। দ্বিতীয়ত, ২০ জুনের আগেই বাংলা ভাগের সিদ্ধান্ত হয়ে গিয়েছিল। আইনসভায় তাতে শুধু সিলমোহর পড়ে। তাই ২০ জুন পশ্চিমবঙ্গের জন্মদিন বলাটা ঠিক ততটা সঙ্গত নয়। তৃতীয়ত, সেদিন আইনসভায় ৫৮-২১ ভোটের ব্যবধানে পশ্চিমবঙ্গ পৃথক রাজ্য গঠন এবং তা ভারতভুক্তির প্রস্তাব পাস হয়েছিল। এই ৫৮ জনের মধ্যে কংগ্রেসের ৫৫ জন, সিপিআই-এর ২ জন এবং হিন্দু মহাসভার একমাত্র প্রতিনিধি হিসাবে শ্যামাপ্রসাদ ভোটদান করেন। সুতরাং নতুন রাজ্য গঠনে শুধুমাত্র শ্যামাপ্রসাদের একক কৃতিত্ব ছিল কি না তা নিয়ে সঙ্গত প্রশ্নও উঠেছে।
এই বিতর্কের মধ্যেই এবার কলকাতার একটি রাস্তার নাম পরিবর্তন নিয়ে বিজেপি সরকারের বিরুদ্ধে ‘তথ্য বিকৃতির’ অভিযোগ উঠেছে। ‘পশ্চিমবঙ্গ দিবসের’ দিনই পার্ক সার্কাসের সোহরাবর্দি অ্যাভিনিউয়ের নাম বদলের কথা ঘোষণা করেছে কলকাতা পুরসভা। নতুন নাম ‘গোপাল মুখার্জি’ (যিনি গোপাল পাঁঠা নামে খ্যাত) রোড। বিজেপির দাবি, ১৯৪৬ সালে ‘দ্য গ্রেট ক্যালকাটা কিলিং’-এর খলনায়ক, অবিভক্ত বাংলার ‘প্রধানমন্ত্রী’ হোসেন শাহিদ সোহরাবর্দির নামে এই রাস্তার নামকরণ হয়েছিল। এই রাস্তার নাম বদল ‘ইতিহাসের এক গুরুত্বপূর্ণ সংশোধন’ বলে মনে করেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। কিন্তু তথ্য বলছে, গত প্রায় ৯৪ বছর যাঁর নামে এই রাস্তার নামকরণ ছিল, তিনি হলেন স্যর হাসান সোহরাবর্দি। ১৯৩০-৩৪ সাল পর্যন্ত তিনি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ছিলেন। বিশিষ্ট চিকিৎসকও ছিলেন তিনি। ব্রিটিশ সরকার তাঁকে ‘নাইট’ উপাধি দিয়েছিল। তিনি ‘দাঙ্গার কারিগর’ ছিলেন বলে কোনো অভিযোগ ওঠেনি। এই রাস্তাতে তাঁর বসতবাড়িও রয়েছে। সম্পর্কে প্রধানমন্ত্রী হোসেন সোহরাবর্দির কাকা (ভিন্ন মতে মামা) ছিলেন ডাঃ হাসান সোহরাবর্দি। সুতরাং প্রশাসনের এই নামবদলের যুক্তিটি আসলে ‘ইতিহাসের বিকৃতি’ বলে অনেকে মনে করছেন। বিরোধীদের দাবি, অবিলম্বে এই ‘ভুল’ সংশোধন করে শিক্ষাবিদ-চিকিৎসকের প্রাপ্য সম্মান দেওয়া উচিত। গোপাল মুখার্জি থাকতেন বৌবাজার এলাকায়। তাঁকে যথাযথ সম্মান জানিয়ে সেখানকার কোনো রাস্তা তাঁর নামে হতেই পারে। অনেকের মতে, এই প্রেক্ষিতে কলকাতা পুরসভার তথ্য বিশ্লেষণ করে রাজ্য প্রশাসনের চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে আসা প্রয়োজন। কিন্তু নতুন সরকার এই বিতর্কের অবসান ঘটিয়ে প্রকৃত সত্য সামনে আনবে কি না, সেটাই দেখার।