প্রীতম দাশগুপ্ত: অমূল্য। বছরের পর বছর ধরে ‘অন্নপূর্ণা’দের কাজের মূল্যায়ন এভাবেই হত। সেই ধারণা এবার কিছুটা হলেও বদলাল। সৌজন্যে সুপ্রিম কোর্ট। দেশের শীর্ষ আদালত বুঝিয়ে দিল, যাকে আমরা এতদিন ধরে অমূল্য বলতাম, সেটা মোটেও ফ্রি নয়। সেটা মাসে ৩০ হাজার। সুপ্রিম কোর্ট আরও বলেছে, প্রতি তিন বছর অন্তর এই অঙ্ক ১০ শতাংশ হারে বৃদ্ধি পাবে। অর্থাৎ, এই প্রথম বুঝিয়ে দেওয়া হয়েছে, অমূল্যকে ফ্রি ভাবার দিন শেষ। অমূল্য মানে চিরকাল বিনামূল্য হতে পারে না। তবে এটা ঠিক এই অভিমতের অর্থ এটা নয় যে, সরকার এখনই অন্নপূর্ণাদের ওই মাসিক বেতন ঠিক করে ফেলবে বা নতুন কোনো স্কিম আনবে। আসলে এটা স্রেফ একটা স্বীকৃতি। নীতি নির্ধারণ এখনও দূর অস্ত।
২০০১ সালের নভেম্বর মাসে পাঞ্জাবে পথ দুর্ঘটনায় মৃত্যু হয়েছিল রেশমা নামে এক মহিলার। এরপরই মোটর অ্যক্সিডেন্ট ক্লেমস ট্রাইব্যুনালে ক্ষতিপূরণের দাবি জানায় মৃত মহিলার স্বামী ও তিন সন্তান। তাদের ২ লক্ষ ৪২ হাজার টাকা ক্ষতিপূরণ দেওয়া হয়। কিন্তু তা পর্যাপ্ত ছিল না। পরের দিকে ক্ষতিপূরণের অর্থ বাড়াতে পাঞ্জাব ও হরিয়ানা হাইকোর্টের দ্বারস্থ হয় মৃতের পরিবার। দীর্ঘ শুনানির পর সেখানে ক্ষতিপূরণ বাড়িয়ে ৮ লক্ষ ৪৩ হাজার করা হয়। ৭.৫ শতাংশ সুদও যুক্ত হয়েছিল। কিন্তু এটি মেনে নেয়নি মৃতের পরিবার। শেষমেশ তারা সুপ্রিম কোর্টের দরজায় কড়া নাড়ে।
সেই মামলাতেই শীর্ষ আদালতের বিচারপতি সঞ্জয় কারোল ও বিচারপতি এন কোটিশ্বর সিংয়ের বেঞ্চের অভিমত, একজন গৃহবধূ জাতির নির্মাতা। দেশ ও সমাজের ভবিষ্যৎ গড়ে তোলেন তাঁরা। এই অবদানকে টাকা দিয়ে মাপা যায় না। তবুও ক্ষতিপূরণের প্রসঙ্গ উঠলে তাদের গৃহস্থালির কাজের জন্য মাসে অন্তত ৩০ হাজার টাকা ধার্য করা উচিত। পরিবারের উপার্জনশীল লোকজন আসলে এই ‘হোমমেকার’দের উপরই নির্ভরশীল। কিন্তু তাঁরা প্রাপ্য স্বীকৃতি পান না।
বরং হামেশাই তাঁদের শুনতে হয়, ঘরে বসে করছটা কী? রোজগার তো কর না, তাহলে বুঝতে আমাদের কী পরিশ্রম করতে হয়। এই দোষে আমরা সবাই কম-বেশি দুষ্ট। আমাদের ভাবটা এমন, বাড়ির বাইরে কাজ করি মানে কী অমানুষিক পরিশ্রম। আর গিন্নির ঘরের প্রতিটি খুঁটিনাটি দেখার কোনো মূল্যই নেই। মানে বেগার খাটা। অথচ দেখবেন, আপনার ফাইল কোথায় আছে? কী খেয়ে অফিস যাবেন? বয়স্কদের দেখভাল। বাচ্চার স্কুলের পড়াশোনা—সব কিছুই আবর্তিত হয় ওই একজনকে ঘিরেই। আর সবচেয়ে বড়ো কথা, এই কাজে তাঁদের কোনো ছুটি নেই। যেমন সূর্যের চারিদিকে গ্রহরা ঘোরে, তেমনই। কিন্তু সূর্যেরই কাজের মূল্য নেই। যুগ যুগ ধরে ভারতীয় নারীরা শিবের মতো স্বামী চেয়ে আসেন। কারণ শিব এমনই একজন দেবতা, যিনি সর্বশক্তিমান হয়েও কোনোদিন স্ত্রীকে খাটো করে দেখেননি। বরং বুঝিয়েছেন, পার্বতী তাঁর শক্তি। দুর্বলতা নয়। মধ্যযুগীয় ইতিহাসেও শোনা যায়,কালিদাসকে মহাকবি হিসাবে গড়ে তোলার পিছনে তাঁর স্ত্রী বিদ্যোত্তমার অবদান রয়েছে। তুলসীদাসের পিছনেও তাঁর স্ত্রী রত্নাবলীর ভূমিকা অপরিসীম। প্রাচীন কাল ছেড়ে দিন। আজকের দিনে তাকান। গুগলের সিইও সুন্দর পিচাই প্রকাশ্যেই তাঁর স্ত্রী অঞ্জলির কথা স্বীকার করেছেন। প্রাক্তন মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা সবসময়ই স্ত্রী মিশেলের কথা বলেন। এমনিতে তো প্রবাদই আছে, প্রত্যেক সফল পুরুষের পিছনে একজন নারী আছেন।
ভারতীয় সমাজে পরিবার ব্যবস্থার প্রধান কেন্দ্রবিন্দু গৃহিণীই। তিনি জাতি গঠন ও উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। তাই তাঁকে ‘অন্নপূর্ণা’-র সঙ্গে তুলনা করা হয়। একজন গৃহিণী পুরো পরিবারকে দক্ষতার সঙ্গে পরিচালনা করেন। সভ্যতা, সংস্কৃতি, মূল্যবোধ ও ঐতিহ্য এক প্রজন্ম থেকে অন্য প্রজন্মে নারীদের মাধ্যমেই সঞ্চারিত হয়। একথা অস্বীকার করার কোনো উপায় নেই যে, মা হলেন সন্তানের প্রথম শিক্ষক। সন্তানের সার্বিক শিক্ষার ভিত্তি সাধারণভাবে তিনিই গড়ে তোলেন। তাই স্ত্রী কেবল পরিবারের নয়, সমগ্র সমাজ ও জাতির উন্নয়নের অন্যতম প্রধান শক্তি।
অর্থনীতিতে দু’টি পদ্ধতি আছে। একটির নাম গ্রস অপরচুনিটি কস্ট মেথড। অন্যটি রিপ্লেসমেন্ট কস্ট মেথড। প্রথম পদ্ধতিতে দেখা হয়, যদি গৃহস্থালির কাজ না করে কেউ সেই সময়ে বেতন নিয়ে কাজ করতেন, তাহলে তিনি কত আয় করতে পারতেন। অর্থাৎ ঘরের কাজ করে তিনি সেই আয় থেকে কতটা বঞ্চিত হচ্ছেন। আর দ্বিতীয় পদ্ধতিতে দেখা হয়, যদি আপনি ওই কাজের জন্য কাউকে পরিচারক হিসাবে রাখতেন, তবে কত ব্যয় হত। ইকনমিক অ্যান্ড পলিটিক্যাল উইকলির একটি সমীক্ষা রিপোর্টে বলা হয়েছে, প্রথম পদ্ধতিতে ভারতে অবৈতনিক গার্হস্থ্য কাজের মূল্য প্রায় ৭১.৭ লক্ষ কোটি টাকা। দ্বিতীয় পদ্ধতিতে প্রায় ৯৯.৫ লক্ষ কোটি টাকা। আর ভারতের জিডিপির অন্তত ১৫ শতাংশ হবে মহিলাদের এই অবৈতনিক কাজ। তাই এসব অর্থনীতির কচকচানি ছেড়ে দিলেও বলা যায়, সুপ্রিম কোর্টের রায় ঐতিহাসিক। কারণ এই প্রথম বোঝা গেল গৃহস্থালির কাজকেও শ্রম বলা যায়। তাই এর একটি অর্থনৈতিক মূল্যও আছে। সোজা কথায় এটি একটি স্বীকৃতি। যে ন্যায্য অধিকারের জন্য যুগ যুগ ধরে অন্নপূর্ণারা লড়াই করেছেন, সুপ্রিম কোর্ট তাকেই মান্যতা দিয়েছে। সর্বোচ্চ আদালত স্পষ্টই বলেছে, আমাদের সংবিধানের ১৪, ১৫ ও ৩৯ নম্বর অনুচ্ছেদে নারী-পুরুষের সমানাধিকারের যে কথা বলা হয়েছে, তা এই অবৈতনিক শ্রমের তত্ত্বে মানা হচ্ছে না।
অন্নপূর্ণাদের কাজের বেতন মাসে ৩০ হাজার টাকা কি যুক্তিযুক্ত? নাকি এর পরিমাণ আরও বাড়া উচিত? এই বিতর্কে আমি যেতে চাই না। আসলে সুপ্রিম কোর্টের রায়, একটা সমাজ ব্যবস্থাকেই সতর্ক করে দিয়েছে। যেখানে আপনি আপনার হোমমেকার স্ত্রীকে আর হেলাফেলা করতে পারবেন না। বলতে পারবেন না, সারাদিন করটা কী? এখন স্ত্রীও জোরের সঙ্গে বলতে পারবেন, আমার অবদান টাকার অঙ্কে পরিমাপ করা যায়। তাই আমাকে আর সহজে উপেক্ষা করতে পারবে না। বাড়ির বউরা অমানুষিক পরিশ্রম করবেন। অথচ স্বীকৃতি জুটবে না। ভাবখানা ছিল, এটাই তো তাঁদের কাজ। তাই কী আর এমন বড়ো কাজ তাঁরা করছেন। কিন্তু পুরুষ নিজের কাজকে কখনোই সেই পক্তক্তিতে ফেলেনি। আমি তো অনেক স্ত্রীকেই জানি। যাঁরা শিক্ষিত এবং অনায়াসেই কর্মক্ষেত্রে সফল হতে পারতেন। কিন্তু সন্তানের জন্য, পরিবারের জন্য তাঁরা নিজেদের স্যাক্রিফাইস করেছেন। সেই কাজের যথার্থ মূল্য কি তাঁরা সবসময় পান? ইংলিশ-ভিংলিশ বলে একটি ছবি দেখেছিলাম। প্রয়াত শ্রীদেবী অভিনীত। বেশ জনপ্রিয় ছবি। সেখানে দেখানো হয়েছিল, শ্রীদেবী অভিনীত চরিত্র শশী সংসারের যাবতীয় কাজ করতেন। কিন্তু তাঁকে কীভাবে হ্যাটা করত তাঁর পরিবারই। আজকের সমাজ জীবনেও এটাই বাস্তবতা।
একবার ভাবুন তো যে কাজ আপনার স্ত্রী সারাদিন করেন, সেই ভার একদিনের জন্য আপনাকে সামলাতে হবে? আমি নিশ্চিত, আমরা একদিন পরে হাঁফ ছেড়ে বাঁচব। কিন্তু সেই কাজটাই যখন স্ত্রী করেন, তখন অনায়াসে কী যে সারাদিন কর, বলে খোঁটা দিতে দেরি করব না। পুরুষের এই কুণ্ঠা বা দ্বিধার কারণে কত নারী যে অকালে ঝরে যায়, তার হিসাব নেই। ‘ন্যাশনাল ক্রাইম রেকর্ডস ব্যুরো’-র সাম্প্রতিক তথ্য বলছে, ২০১৫-২০২৩ সময়ে বছরে ২১ হাজার থেকে ২৪ হাজার গৃহবধূ আত্মহননের পথ বেছে নিয়েছেন। দৈনিক হিসাবে ধরলে সংখ্যাটি ৬০। সবচেয়ে উদ্বেগজনক তথ্য হল, মেয়েদের মধ্যে গৃহবধূদেরই আত্মঘাতীর সংখ্যা সবচেয়ে বেশি। একজন স্যালারাইড মহিলার থেকে চিরাচরিত গৃহস্থালির কাজ সামলানো মহিলার মৃত্যু হার ১৪ গুণ বেশি। ২০২৪ সালে জাতীয় পরিসংখ্যান দপ্তরের সমীক্ষায় দেখা গিয়েছে, গড়ে মহিলারা পুরুষদের তুলনায় তিন গুণেরও বেশি সময় অবৈতনিক গৃহস্থালির কাজ করেন। এটি গৃহস্থালির শ্রমে একটি উল্লেখযোগ্য লিঙ্গবৈষম্যর চিত্র। এটার কারণ অবশ্যই সমাজ। সমাজই মেয়েদের সেই ভূমিকা পালনে অভ্যস্থ করে তুলেছে। সেই বাঁধন কাটানো তাঁদের পক্ষে কঠিন।
নারী ‘অর্ধেক আকাশ’। ঘটা করে প্রায় আমরা এই কথাটা বলে থাকি। অথচ আমরা তথাকথিত প্রগতিশীলরা তাঁদের মর্যাদা দিতে কুণ্ঠাবোধ করি। সুপ্রিম কোর্ট সেই স্বীকৃতিটা দিয়েছে। বলেছে, তাঁরা হোমমেকার্স নন, নেশন বিল্ডার্স। আদালত তো মহিলাদের সাংবিধানিক মর্যাদা দিয়েছে। এবার সময় আমাদের মানসিকতা পালটানোর।