Bartaman Logo
২৬ জুন, ২০২৬
বর্তমান / সম্পাদকীয়

চোখ খুলে দিল তারাতলা

কলকাতার তারাতলায় নির্মীয়মাণ গোডাউন ভেঙে ১১ শ্রমিকের মৃত্যু হয়েছে। উদ্ধার কাজ চলছে। মুখ্যমন্ত্রী ক্ষতিপূরণের ঘোষণা করেছেন। বিস্তারিত পড়ুন।

চোখ খুলে দিল তারাতলা
  • ২৬ জুন, ২০২৬ ০৪:০০
Prefer us on Google

এবার বিপর্যয় কলকাতায়। বুধবার দুপুরে তারাতলায় ভেঙে পড়ল একটি নির্মীয়মাণ গোডাউন। তিনতলা ওই গুদামের পুরোটাই হুড়মুড়িয়ে ভেঙে পড়েছে। তখন সেখানে একদল নির্মাণ শ্রমিক কাজ করছিলেন। ঘটনাটি এতটাই আকস্মিক যে কারো পক্ষেই কোনোকিছুই বুঝে ওঠা সম্ভব হয়নি। সেখানে উপস্থিত প্রত্যেকেই আটকা পড়েন ওই ভগ্নস্তূপের নীচে। উদ্ধার কাজ দ্রুতই শুরু হয়। স্থানীয় মানুষের সহযোগিতা নিয়ে পুলিশ, দমকল ও অসামরিক প্রতিরক্ষা বাহিনী কাজটি শুরু করে। উদ্ধার কাজের সঙ্গে যুক্ত হয় কলকাতা পুরসভা, পূর্তদপ্তর, এসপিএম বন্দর কর্তৃপক্ষ এবং কলকাতা পুলিশের ডিজাস্টার ম্যানেজমেন্ট টিম। মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী আহ্বানে অতিদ্রুত নেমে পড়ে জাতীয় বিপর্যয় মোকাবিলা বাহিনী (এনডিআরএম) এবং সেনাবাহিনীও। ওইসঙ্গে প্রস্তুত রাখা হয় অ্যাম্বুলেন্স, মেডিকেল টিম এবং হাসপাতালের বেড। উদ্ধারকার্য চলাকালে কয়েকজন শ্রমিকের নাম ধরে বাইরে থেকে চিৎকার করে হাঁক পাড়া হয়। বোঝার চেষ্টা হয় কারা কারা সেখানে আটকা পড়েছেন, তাঁরা কী অবস্থায় আছেন এবং কী তাঁদের প্রয়োজন। আধুনিক পদ্ধতিতে ধ্বংসস্তূপ সরিয়ে হতভাগ্য মানুষগুলিকে একে একে বের করার চেষ্টা চলে। উপায় সন্ধান করা হয়—ধ্বংসস্তূপের নীচে জল, খাবার প্রভৃতি পৌঁছে দেওয়ার। তাঁরা সকলেই যে বেঁচে ফিরবেন, মুহুর্মুহু এই ভরসাও দেওয়া হয় বাইরে থেকে। বুধবার ঘটনাটি জানার আধঘণ্টার মধ্যেই সরকার উদ্ধার কাজ শুরু করে। ওই তৎপরতা চলে দিনভর, এমনকি সারারাতও। বৃহস্পতিবারও উদ্ধার কাজ অব্যাহত ছিল। 

Advertisement

কিন্তু দুর্ভাগ্য যে সকলকে জীবিত অবস্থায় ফেরানো যায়নি। ধ্বংসস্তূপের নীচ থেকে কয়েকজন ফিরে এসেছেন লাশ হয়েই। এছাড়া কয়েকজন হাসপাতালে মৃত্যুর সঙ্গে পাঞ্জা লড়েও হেরে গিয়েছেন শেষমেশ। এই নিবন্ধ লেখা পর্যন্ত এগারোজনের নিশ্চিত মৃত্যুর খবর সামনে এসেছে। গুরুতর জখম অবস্থায় এসএসকেএম হাসপাতালে চিকিৎসাধীন আছেন আরো অনেকে। হতাহতের মোট সংখ্যা সম্পর্কে প্রশাসন নিশ্চিত নয়। কারণ উদ্ধার কাজ এখনো চলছে। আরো একাধিক দেহ মিলতে পারে বলে আশঙ্কা করছে সংশ্লিষ্ট মহল। এই সহনাগরিকদের জীবিত ফেরানো গেলে তার চেয়ে ভালো খবর কিছু হবে না। বুধবার বিকালেই ঘটনাস্থলে পৌঁছে যান উদ্বিগ্ন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী এবং পুরমন্ত্রী অগ্নিমিত্রা পাল। কলকাতা পুরসভার ইঞ্জিনিয়াররা প্রাথমিকভাবে মুখ্যমন্ত্রীকে জানিয়েছেন যে, ভেঙে পড়া বিল্ডিংটির প্ল্যানে ত্রুটি ছিল। গত ১৭ জানুয়ারি, অর্থাৎ পূর্বতন তৃণমূল জমানায় প্ল্যানটির অনুমোদন দেওয়া হয়। বুধবার সন্ধ্যায় মৃতদের পরিবারের তরফে গোডাউনের মালিক পক্ষের বিরুদ্ধে তারাতলা থানায় অভিযোগ দায়ের করা হয়। উল্লেখ্য, জমিটি বন্দর কর্তৃপক্ষ থেকে লিজে নিয়েছিল একটি বেসরকারি সংস্থা। তারাই সেখানে গুদামটি নির্মাণ করছিল। বুধবারই পুলিশের গোয়েন্দা দল ওই গুদাম কর্তৃপক্ষের অফিসে যায়। সেদিনই গ্রেপ্তার করা হয় সুপারভাইজার, লেবার সাপ্লায়ারসহ তিনজনকে। গোডাউনের মালিক সেদিন পরে পালিয়ে গিয়েও রেহাই পাননি। পরে তাঁকে এবং আরো একজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। অর্থাৎ এই মর্মান্তিক কাণ্ডে বৃহস্পতিবার পর্যন্ত গ্রেপ্তারের সংখ্যা পাঁচ।
প্রতিটি মৃত শ্রমিক পরিবারের জন্য, বৃহস্পতিবার বিধানসভায় মুখ্যমন্ত্রী ১০ লক্ষ টাকা ক্ষতিপূরণ ঘোষণা করেছেন। তিনি জানান, আহতদের দেওয়া হবে মাথাপিছু ১ লক্ষ টাকা এবং তাঁদের সকলের সুচিকিৎসারও দায়িত্ব নিয়েছে রাজ্য সরকার। তাঁরা এসএসকেএম হাসপাতালে ভরতি। মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরে আসা লোকগুলির সঙ্গে সেখানে গিয়ে দেখাও করেন মুখ্যমন্ত্রী। স্বাস্থ্যমন্ত্রী শারদ্বত মুখোপাধ্যায়ের নেতৃত্বে বিশেষজ্ঞ ডাক্তারদের একটি টিম চিকিৎসা করছে। নির্মাণ কাজটি কোনোক্রমে শেষ হয়ে গেলে এবং তারপর সেখানে বাণিজ্যিক কাজ শুরু হলে বিপর্যয় আরো মারাত্মক হওয়ার আশঙ্কাই প্রবল হয়। সেই অনাগত দিনের কথা ভাবলেই শিউরে ওঠে শরীর। এমন দুঃস্বপ্নের দিনরাত্রির পুনরাবৃত্তি আমরা চাই না। তেমন সম্ভাবনার বীজ আর কোথাও লুকিয়ে রয়েছে কি না সে-সম্পর্কে এখনই নিশ্চিত হওয়া জরুরি। সেগুলি খুঁজে বের করেই ‘বাঁধ’ দিতে হবে, সর্বনাশ ঘটে যাওয়ার আগেই। সরকার সেই সংগত দিকেই প্রশংসনীয় পদক্ষেপ করছে বলে খবর। স্বয়ং মুখ্যমন্ত্রী ঘোষণা করেছেন, অবৈধ নির্মাণের ব্যাপারে রাজ্য ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি নিয়ে চলবে। তৃণমূল জমানায় অনুমোদিত প্ল্যানের ভিত্তিতে বৃহত্তর কলকাতায় কোনো নির্মাণ আপাতত চলবে না। সমস্ত নির্মীয়মাণ কমার্শিয়াল বিল্ডিং এবং সেগুলির প্ল্যান অডিট করা হবে। তারপর মিলবে নির্মাণের নতুন অনুমতি কিংবা করা হবে কঠোর পদক্ষেপ। তারাতলায় সংঘটিত ‘পাপের’ সঙ্গে জড়িত প্রত্যেকের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি চায় মানুষ। আশা করি, সরকার সেই কাজটি সম্পূর্ণ মোহমুক্ত হয়েই করবে। মুখ্যমন্ত্রীর অভিযোগ, ‘সিটি অফ জয়কে’ তৃণমূল কংগ্রেসের পূর্বতন সরকার ও পুরসভা ‘মৃত্যুপুরীতে’ বদলে দিয়েছে! মহানগরকে এই আতঙ্ক থেকে দ্রুত মুক্তি দিলে মানুষের আশীর্বাদ পাবে সরকার। 

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ