Bartaman Logo
২৭ জুন, ২০২৬
বর্তমান / এই মুহূর্তে

নিত্যনতুন বিভ্রান্তি!

ভারতের নাগরিকত্ব নিয়ে বিভ্রান্তি বাড়ছে। পাসপোর্ট কি নাগরিকত্বের চূড়ান্ত প্রমাণ? জানতে বিস্তারিত পড়ুন।

নিত্যনতুন বিভ্রান্তি!
  • ২৭ জুন, ২০২৬ ০৪:০০
Prefer us on Google

দেশ স্বাধীন হয়েছে প্রায় আট দশক। এখনও ভারতীয়দের নাগরিকত্ব নিয়ে বিতর্ক ও বিভ্রান্তির সেই ট্র্যাডিশন চলছেই। বরং উত্তরোত্তর তা বাড়ছে। এর মূল কারণ, অন্যান্য অনেক দেশের মতো ভারতের সব নাগরিকের জন্য সরকার কোনো সার্বজনীন নাগরিকত্বের শংসাপত্র দেয়নি। ফলে ভারতে নাগরিকদেরও নাগরিকত্বের কোনো একক পরিচয়পত্র নেই। এদেশে ১৯৫৫ সালের নাগরিকত্ব আইনে বলা হয়েছে, জন্মসূত্রে, উত্তরাধিকার সূত্রে, বংশ পরিচয়ে, টানা ১২ বছর দেশে থাকলে স্বাভাবিক নিয়মে এবং বাইরের কোনো এলাকা ভারতের সঙ্গে যুক্ত হলে তার বাসিন্দারা নাগরিকত্ব পেতে পারেন। কিন্তু কোনো একটি নির্দিষ্ট দলিল বা শংসাপত্র নাগরিকত্বের প্রমাণ নয়। এই কারণেই ভোটার কার্ড, আধার কার্ড, প্যান কার্ড কিংবা পাসপোর্ট নাগরিকত্বের চূড়ান্ত প্রমাণপত্র নয়। নির্বাচনে অংশগ্রহণের প্রামাণ্য নথি ভোটার কার্ড, আধার কার্ড ব্যক্তি পরিচয় ও বাসস্থানের প্রমাণপত্র, প্যান কার্ড আয়ব্যয়ের হিসাব প্রমাণের নথি। আর পাসপোর্ট বিদেশ ভ্রমণের নথি। সম্প্রতি ভোটার তালিকার নিবিড় সংশোধন বা এসআইআর শুরুর আগে-পরে ভোটার কার্ড ও আধার কার্ড নাগরিকত্বের প্রমাণ নয় বলে স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছিল জাতীয় নির্বাচন কমিশন। আদালতও তাতে দ্বিমত হয়নি। এবার বিদেশমন্ত্রক নতুন করে মনে করিয়ে দিয়েছে, পাসপোর্টও চূড়ান্ত নাগরিকত্বের প্রমাণ নয়। কারণ, ১৯৬৭ সালের পাসপোর্ট আইনে সাফ বলা আছে, একজন অভারতীয় নাগরিককেও ‘জনস্বার্থে’ পাসপোর্ট দেওয়া যেতে পারে। 

Advertisement

প্রশ্ন উঠেছে, তাহলে নাগরিকত্বের প্রমাণ কী? ধরা যাক, এসআইআর-এর কথা। আইন অনুযায়ী, একমাত্র ভারতীয় নাগরিক হলেই তিনি ভোটার হতে পারেন। নিজেকে ভারতীয় নাগরিক হিসাবে প্রমাণ দিতে জাতীয় নির্বাচন কমিশন শেষপর্যন্ত যে ১৩টি নথির তালিকা প্রকাশ করেছিল, তার চার নম্বরে ছিল পাসপোর্ট। একেবারে শেষে আধার কার্ড। তাহলে আগেই আধার কার্ডকে এবং এখন পাসপোর্টকে কেন নাগরিকত্বের প্রমাণ হিসাবে মানা হচ্ছে না? বিভ্রান্তি চরমে উঠেছে পাসপোর্ট নিয়ে মোদি সরকারের ব্যাখ্যায়। একদিকে পাসপোর্ট ভারতীয় নাগরিকত্বের চূড়ান্ত প্রমাণ হিসাবে দেশের কর্তাদের কাছে গ্রহণযোগ্য নয়, অথচ বিদেশের মাটিতে এই নথিই একজনকে ভারতীয় জাতীয়তা হিসাবে মান্যতা দেয়! শুধু তাই নয়, পাসপোর্ট করাতে গেলে সরকারি স্তরে বহু পরীক্ষা-নিরীক্ষা চলে, যার মধ্যে পুলিশি যাচাই (ভেরিফিকেশন) অন্যতম! তাহলে এই নথি কেন দেশের মাটিতে নাগরিকত্ব প্রমাণে ব্যর্থ হবে— সেই সঙ্গত প্রশ্নের কোনো উত্তর নেই! প্রশ্ন উঠেছে, পাসপোর্ট নাগরিকত্বের প্রমাণ নয় জেনে কোনো দেশ যদি ভিসা না দেয়, তাহলে কী হবে? কপিল সিব্বালের মতো প্রবীণ আইনজীবীর বক্তব্য, কোনো একক দলিল নাগরিকত্বের প্রমাণ নয়। অথচ এসআইআর-এর সময় কিছু ক্ষেত্রে দেখা গেল বিএলও-র মতো একজন সরকারি আধিকারিক নাগরিকত্ব নিয়ে প্রশ্ন তুলে ভোটাধিকার কেটে দিতে উদ্যত হল! 
ভোটাধিকার থেকে পাসপোর্ট নিয়ে বিভিন্ন সময় নাগরিকত্বের অধিকারের প্রশ্ন তুলে আসলে কিছু মানুষের নাগরিকত্ব কেড়ে নেওয়ার কোনো পরিকল্পনা রয়েছে কি না সেই প্রসঙ্গ উঠেছে। বিরোধীদের অভিযোগ, এসআইআর-এর মাধ্যমে একটি বিশেষ সম্প্রদায়ের বহু মানুষের নাম ভোটার তালিকা থেকে বাদ দেওয়ার চেষ্টা হয়েছিল বিভিন্ন রাজ্যে। এদের বহিরাগত আখ্যা দিয়ে দেশছাড়া করার পরিকল্পনা রয়েছে। যদিও ভোটার তালিকায় নাম না থাকার অর্থ এই নয় যে, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ভারতের নাগরিক নন। তবু এই অছিলায় বিভিন্ন সরকারি প্রকল্পের সুবিধা থেকে এমন বিপুল অংশকে বাদ দিতে তৎপর হয়েছে বিভিন্ন রাজ্য। পাসপোর্টের ক্ষেত্রেও এমন একটি পরিবেশ তৈরি করা হচ্ছে যেখানে সরকারের সঙ্গে মতের অমিল হলেই নাগরিকত্ব নিয়ে প্রশ্ন তোলা যাবে। যদিও কেন্দ্রের দাবি, নাগরিকত্বের প্রমাণ নিয়ে যা যা বলা হচ্ছে, তার কোনোটাই নতুন নয়। কিন্তু এই বিষয়গুলিকে নতুন করে সামনে এনে মোদি সরকার একটি বিভ্রান্তি ও আতঙ্কের পরিবেশ তৈরি করতে চাইছে কি না—সেই বিতর্ক উঠেছে। এই নিয়ে কোনো সন্দেহ নেই যে বিভিন্ন সময় নাগরিকত্ব প্রমাণের নথি নিয়ে চরম হেনস্তার মুখে পড়তে হয়েছে সাধারণ মানুষকে। দেশের এমন কোটি কোটি প্রকৃত নাগরিক আছেন, যাঁদের কাছে কোনো নথিই নেই। এঁদের জন্য সরকারের অনেক নমনীয় মনোভাব দেখানো উচিত ছিল। কিন্তু উলটে নিত্যনতুন বিভ্রান্তি ছড়াচ্ছে! এই অপ্রীতিকর পরিস্থিতি থেকে দেশবাসীকে মুক্তি দিতে সঠিক দিশা নিয়ে এগনো উচিত কেন্দ্রীয় সরকারের। হতে পারে, একটি অভিন্ন কার্ড, যা এককভাবে কোনো নাগরিকের পরিচয় বহন করবে, ঘরে-বাইরে সর্বত্র। 

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ