এমনটা হওয়ারই কথা ছিল। বারো বছর আগে দেশে মোদি জমানা শুরু হওয়ার পর আরএসএস এবং বিজেপি যে বড়ো বড়ো এজেন্ডাগুলিকে সামনে রেখে এগোতে শুরু করেছে, তার মধ্যে অন্যতম হল সংবিধানের ৩৭০ ধারা অনুযায়ী কাশ্মীরের যে বিশেষ ক্ষমতা ছিল রাতারাতি আইন এনে তা বিলোপ করা। এরপর অযোধ্যায় বাবরি মসজিদ ধ্বংস করে রামমন্দির তৈরির কাজও সেরে ফেলা হয়েছে। গেরুয়াবাহিনীর লক্ষ্য ছিল, গোটা দেশে অভিন্ন দেওয়ানি বিধি চালু করতে সংসদে বিল পাস করে আইন তৈরি করার। সেই কাজে এখনও সম্পূর্ণ সফল না হলেও হিন্দুত্ববাদীদের দর্শন মেনে ইতিমধ্যে তিন বিজেপি শাসিত রাজ্য উত্তরাখণ্ড, গুজরাত ও অসমে অভিন্ন দেওয়ানি বিধি আইন চালু হয়েছে। এবার পশ্চিমবঙ্গের পালা। কাল সোমবার রাজ্য বিধানসভায় এই সংক্রান্ত বিল পেশ করা হবে বলে জানিয়েছেন নতুন বিজেপি সরকারের মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। এর মূল লক্ষ্য হল, বিবাহ, বিবাহ-বিচ্ছেদ, দত্তক গ্রহণ, ভরণপোষণ, উত্তরাধিকার, সম্পত্তির ‘উত্তরাধিকার’, সহবাস সম্পর্ক বিষয়ক ক্ষেত্রে ধর্মভেদে পৃথক ব্যক্তিগত আইনের বিলোপ ঘটিয়ে সমস্ত নাগরিকের জন্য একই আইন প্রয়োগ করা। ভারতের মতো বহুত্ববাদী দেশে এই ব্যক্তিগত আইনের সংখ্যা চোখে পড়ার মতোই। যেমন, হিন্দুদের ক্ষেত্রে হিন্দু বিবাহ আইন ১৯৫৫, হিন্দু উত্তরাধিকার আইন ১৯৫৬, হিন্দু সংখ্যালঘু ও অভিভাবকত্ব আইন ১৯৫৬, হিন্দু দত্তক ও খোরপোশ আইন ১৯৫৬ রয়েছে, তেমনই মুসলিমদের জন্য ১৯৩৭ সালের শরিয়ত আইন, খ্রিস্টান বিবাহ আইন ১৮৭২, পার্সিদের বিবাহ ও বিবাহ বিচ্ছেদ আইন ১৯৩৬, শিখদের ১৯০৯-এর বিবাহ আইন চালু রয়েছে দেশে। অভিন্ন দেওয়ানি বিধি চালু হলে বিভিন্ন ধর্মের আলাদা আলাদা আইনগুলির আর কোনো অস্তিত্ব থাকবে না। তবে জনজাতি সম্প্রদায়ের জন্য চালু ব্যক্তিগত আইনগুলিকে সম্ভবত এর বাইরে রাখা হবে।
ঘটনা হল, নির্দেশাত্মক নীতি সংক্রান্ত সংবিধানের ৪৪ নম্বর অনুচ্ছেদে ভারতে অভিন্ন দেওয়ানি বিধি চালু করার জন্য রাষ্ট্রকে উদ্যোগ নিতে বলা হলেও তাকে মৌলিক অধিকার হিসাবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়নি। আইন বিশেষজ্ঞদের একাংশের মতে, সংবিধানের নির্মাতারা দেশে এক আইন লাগু করার কথা ভাবলে ব্যক্তিগত আইন নিয়ে সিদ্ধান্ত নিতে সংসদকে একচ্ছত্র ক্ষমতা দিতেন। তা হয়নি। এই কারণে ২০১৮ সালে আইন কমিশন জানায়, সকলের জন্য এক আইন কাঙ্ক্ষিত নয়, সম্ভবও নয়। পাশাপাশি আবার, সংবিধানের ২৫ নম্বর অনুচ্ছেদে ব্যক্তির ধর্মীয় অধিকারকে মৌলিক অধিকার হিসাবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। ২৯ নম্বর অনুচ্ছেদে বিভিন্ন সংস্কৃতিকে বাঁচিয়ে রাখার অধিকার দিয়েছে সংবিধান। এই কারণেই সম্ভবত অভিন্ন দেওয়ানি বিধিকে মৌলিক অধিকারের অনুচ্ছেদে রাখতে চাননি সংবিধান প্রণেতারা। সেই সময় সংবিধানের রূপকার বি আর আম্বেদকর বলেছিলেন, কোনো সরকারই এর সংস্থানকে এমনভাবে ব্যবহার করতে পারবেন না যাতে মুসলিমরা বিদ্রোহ করে।
ইতিহাসের এই প্রেক্ষাপটেই অভিন্ন দেওয়ানি বিধি চালু করা নিয়ে নানা প্রশ্ন ও আশঙ্কা প্রকাশ করেছে বিরোধীরা এবং বিভিন্ন সামাজিক সংগঠন। তাদের আশঙ্কা, সংবিধানে নাগরিকদের নিজ নিজ ধর্মপালনের যে অধিকার দেওয়া হয়েছে, অভিন্ন দেওয়ানি বিধি তার পরিপন্থী। এর ফলে প্রতিটি সম্প্রদায়ের নিজস্ব ধর্মীয় রীতি-নীতি ও ব্যক্তিগত আইন প্রভাবিত হতে পারে। ভারতের মতো বিশাল বৈচিত্রের দেশে সব ধর্মের জন্য এক আইন চাপিয়ে দিলে বহুত্ববাদী সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যবাহী রীতিনীতিগুলি ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। মুসলিম পার্সোনাল ল বোর্ড সহ বিভিন্ন সংখ্যালঘু সংগঠনের আশঙ্কা, এই আইন মূলত সংখ্যাগুরু সম্প্রদায়ের রীতিনীতিকে সকলের উপর জোর করে চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা। এতে সংখ্যালঘুদের স্বকীয়তা নষ্ট হওয়ার সম্ভাবনাকে উড়িয়ে দেওয়া যায় না। আইন বিশেষজ্ঞদের একাংশের মতে, অভিন্ন দেওয়ানি বিধি অনেকক্ষেত্রেই ধর্মীয় ও ব্যক্তিগত আবেগের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত। সুনির্দিষ্ট আইন সংস্কারের মাধ্যমে বৈষম্য দূর করার উপর সরকারের জোর দেওয়া উচিত। কিন্তু সব ধর্মের মানুষকে জোর করে এক ছাতার নীচে আনা সমীচীন কাজ নয়। পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী জানিয়েছেন, অন্যান্য রাজ্যে যেভাবে এই বিধি কার্যকর হয়েছে, এরাজ্যেও সেভাবে হবে। পদ্ধতি মেনে কাজ হবে। এ জন্য কোনো বিচারপতির নেতৃত্বে কমিটি তৈরি হবে। রাজ্যের প্রধান বিরোধী দল অবশ্য এ বিষয়ে উদ্বিগ্ন। সকলের সম্মতি নিয়ে, সাংবিধানিক নৈতিকতা ও নাগরিকদের কল্যাণের লক্ষ্য নিয়ে এই বিল আনা হচ্ছে, নাকি এটিকে রাজনৈতিক মেরুকরণের হাতিয়ার করা হচ্ছে— তৃণমূল তা বুঝতে চায়। বলা বাহুল্য, অভিন্ন দেওয়ানি বিধি নিয়ে আগের তৃণমূল সরকারের তীব্র আপত্তি ছিল। এই নিয়ে কোনো সংশয় নেই যে, বিধানসভায় বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোরে এই বিল হয়তো পাস হয়ে যাবে। তারপর তা আইনে পরিণত হতেও সমস্যা হবে না। কিন্তু সকলের জন্য এই অভিন্ন বিধি নিয়ে যে আশঙ্কার মেঘ জমেছে, সরকারকে সেদিকটাও বিবেচনা করতে হবে। কেবল সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোরে বিল পাস করে হাত গুটিয়ে বসে থাকলে গণতন্ত্রের প্রতি অবিচার করা হবে।