Bartaman Logo
২৯ জুন, ২০২৬
বর্তমান / সম্পাদকীয়

ভারতের ভবিষ্যৎ ঠিক করে দেবে পাঁচটি প্রবণতা

ভারতের ভবিষ্যৎ নির্ধারণে পাঁচটি প্রবণতা গুরুত্বপূর্ণ। সামাজিক ও রাজনৈতিক পরিবর্তনের প্রভাব কেমন হবে? বিস্তারিত পড়ুন।

ভারতের ভবিষ্যৎ ঠিক করে দেবে পাঁচটি প্রবণতা
  • ২৯ জুন, ২০২৬ ০৪:০০
Prefer us on Google

পি চিদম্বরম: আমি বহু বছর ধরে ভারতের সামাজিক ও রাজনৈতিক প্রবণতাগুলি পর্যবেক্ষণ করছি। কোনো বিষয়কে দেখে হয়তো গভীর কোনো স্রোত বলে মনে হতে পারে, কিন্তু বাস্তবে তা হয়তো কেবল ক্ষণস্থায়ী এক মেঘখণ্ড মাত্র। ক্ষণস্থায়ী মেঘখণ্ড হয়তো স্বাগত জানাবার বৃষ্টি ঝরাতে পারে, কিন্তু তা জলবায়ুর কোনো স্থায়ী বৈশিষ্ট্য নয়।

Advertisement

১৯৪৭ সাল ছিল এক যুগান্তকারী বছর। স্বাধীনতার পর থেকে অনেক দৃশ্যমান প্রভাব ও প্রবণতা লক্ষ্য করা গিয়েছে যা ছিল স্বল্পস্থায়ী; আবার এমন অনেক প্রবণতা অঙ্কুরিত হয়েছিল যেগুলি বেশিরভাগ মানুষের নজর এড়িয়ে গিয়েছিল কিন্তু স্থায়ী রূপই নিয়েছিল শেষমেশ। উদাহরণস্বরূপ উল্লেখ করা যায়—গান্ধীজির প্রায়-দেবতুল্য মর্যাদা এবং শত শত নিবেদিতপ্রাণ গান্ধীবাদী অনুসারী থাকা সত্ত্বেও—গান্ধীজির জীবনদর্শন, অহিংসা, সত্যাগ্রহ, চরকা এবং আইন অমান্য আন্দোলনের মতো বিষয়গুলি তাঁর প্রয়াণপরবর্তী কয়েকদশকের বেশি টেকেনি। অন্যদিকে, ভারতের দ্রুত নগরায়ণের বিষয়টি খুব কম মানুষই আঁচ করতে পেরেছিলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের বিষয়টি নজরে এসেছিল আরো কম মানুষের এবং মানুষ ও বিজ্ঞান-প্রযুক্তির মধ্যকার জটিল সম্পর্কটি উপলব্ধি করেছিলেন আরো মুষ্টিমেয় মানুষ।
একটি প্রবাদ আছে, ‘ভবিষ্যদ্বাণী করা অত্যন্ত কঠিন, বিশেষ করে যখন তা ভবিষ্যৎ নিয়েই হয়’ (নোবেলজয়ী নিলস বোর এবং কিংবদন্তি বেসবল খেলোয়াড় যোগী বেরা)। তা সত্ত্বেও, আমি সেই নিষিদ্ধ বা অজানা পথে পদক্ষেপের সাহস করছি। আমি এমন পাঁচটি প্রবণতা লক্ষ্য করেছি যা ভবিষ্যতে আরো জোরদার ও বেগবান হতে পারে। এর মধ্যে কিছু বিষয় আমি অপছন্দ করি এবং সেগুলিকে নিয়ে আমার আশঙ্কাও রয়েছে, তবুও মনে হচ্ছে—এই প্রবণতাগুলিকে আর রোখা যাবে না:
‘জনগণের সরকার’ হিসাবে গণতন্ত্রের অবক্ষয়...
গণতন্ত্র হল জনগণের সরকার। মানুষ স্বাধীনভাবে জন্মগ্রহণ করে এবং নানাবিধ স্বাধীনতার অধিকার ভোগ করে। গণতান্ত্রিক সরকার বলতে এমন এক সরকারকে বোঝায় যা জনগণের অধিকারকে সম্মান ও সমুন্নত রাখে। এছাড়া এমন কিছু স্বাধীন প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলে যার মাধ্যমে সেই অধিকারগুলির সুরক্ষা ও বাস্তবায়ন নিশ্চিতরূপে সম্ভব হয়। ‘ফ্রিডম হাউস’, ‘ভি-ডেম ইনস্টিটিউট’, ‘রিপোর্টার্স উইদাউট বর্ডারস’ প্রভৃতি গবেষণা প্রতিষ্ঠান বিভিন্ন সূচকের ভিত্তিতে দেশগুলিকে ‘স্বাধীন’ অথবা ‘স্বাধীন নয়’ হিসাবে শ্রেণিবদ্ধ করে থাকে। ক্রমশ আরো বেশি সংখ্যক দেশের স্কোর বা মান নিম্নমুখী হচ্ছে। ২০০৫ সালে ভারতের স্কোর ছিল ৭৭, যা কমে এখন ৬৩-৬৭-র ঘরে নেমে এসেছে। আশঙ্কা করা হচ্ছে যে, ভারত হয়তো কেবল নামমাত্র ‘নির্বাচনি গণতন্ত্রে’ (ইলেক্টোরাল ডেমোক্রেসি) পরিণত হবে এবং সেখানকার নির্বাচনগুলি আর আগের মতো অবাধ ও সুষ্ঠু থাকবে না। জনকল্যাণমূলক পদক্ষেপ ও উন্নত পরিকাঠামো ক্ষেত্রে এবং নিপীড়নমূলক সামাজিক কাঠামোর বিরুদ্ধে কোনো চ্যালেঞ্জ নেই। তাই সংশ্লিষ্ট সূচকে ভারতের ক্রমাবনতি ঘটছে। এ নিয়ে ভারতবাসী সম্ভবত বিচলিত নয়। চীনের স্কোর বহু বছর ধরে ১০০-এর মধ্যে মাত্র ৯-এ আটকে আছে! অথচ সব তথ্য-উপাত্ত অনুযায়ী সে-দেশের মানুষ ‘সুখী’। ভারতও হয়তো হাঁটবে সেই পথে।
একচেটিয়া আধিপত্য বনাম উদ্যোক্তা
অর্থনীতির বেশ কয়েকটি ক্ষেত্র এখন ‘ডুয়োপোলি’ (দুটি প্রতিষ্ঠানের আধিপত্য) কিংবা ‘অলিগোপোলি’র (কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের আধিপত্য) কবজায়। যেমন—বিমান পরিবহণ, টেলিযোগাযোগ, সিমেন্ট, ইস্পাত, বিদ্যুৎ, ওষুধ শিল্প, পেট্রলিয়াম, প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম উৎপাদন, খনি ও খুচরো ব্যবসা। আরো অনেক ক্ষেত্র হয়তো একই পথে এগোবে। ক্ষুদ্র ব্যবসা এবং অতিক্ষুদ্র, ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোগগুলি (এমএসএমই) প্রায় বিলুপ্ত হয়ে যাবে। কণ্ঠরোধ করা হবে এনজিওগুলির। অর্থনৈতিক ক্ষমতার বণ্টন ক্রমশ একচেটিয়া আধিপত্যবাদীদের অনুকূলে চলে যাবে। পুঁজি ও শ্রমের মধ্যকার ভারসাম্য ঝুঁকতে থাকবে পুঁজির দিকেই। আয়বণ্টনের ক্ষেত্রে ধনী ও অতিধনীদেরই প্রাধান্য বাড়বে। আয়-বৈষম্য বৃদ্ধি পাবে এবং সমাজে দুর্বল হয়ে পড়বে সাম্যের ধারণাটি।
অভ্যন্তরীণ অভিবাসন ও পরিচয়ের বিলুপ্তি
অধিকাংশ বড়ো শহর এখন ‘কসমোপলিটন’ হয়ে উঠেছে। সেখানে ভাষা, ধর্ম, সংস্কৃতি ও খাদ্যাভ্যাসের এক বিচিত্র সংমিশ্রণ দেখা যাচ্ছে। অনেক ছোটো শহরও একই পথে চলছে। নগরায়ণ ও গণপরিবহণ ব্যবস্থা এই প্রবণতাকে ভারতের আরো গভীরে নিয়ে যাবে। কোনো নির্দিষ্ট স্থানের প্রতি মানুষের আর কোনো ‘মমত্ববোধ’ বা ‘নিজ এলাকা’র ধারণা থাকবে না। যৌথ পরিবারের মতোই ‘নিজ গ্রাম বা আদি নিবাস’-এর ধারণাটি বিলুপ্ত হয়ে যাবে। পথে-ঘাটে যাদের দেখা মিলবে, তাদের অধিকাংশই হবে অপরিচিত। ছোটো হয়ে আসবে বন্ধু-বান্ধবের গণ্ডি। এছাড়া সম্পর্কগুলি গড়ে উঠবে ডিজিটাল-ডিভাইস-নির্ভর। কথোপকথন হবে যন্ত্রের মধ্যস্থতায়। ‘মানুষ কোনো বিচ্ছিন্ন দ্বীপ নয়’—এই প্রবাদটি হয়তো ভুল প্রমাণিত হবে। আবেগের পরিবর্তে লেনদেন বা বিনিময়ই মানুষের মধ্যকার সম্পর্ক নির্ধারণ করবে। যৌনসম্পর্ক হয়তো টিকে থাকবে, কারণ প্রজননের বাইরেও যৌনতার নানাবিধ উপযোগিতা রয়েছে। 
সাংস্কৃতিক জাতীয়তাবাদ বনাম ভীত 
সংখ্যালঘু সম্প্রদায় 
বিজ্ঞান ও ছদ্ম-বিজ্ঞানের মধ্যকার পার্থক্য মুছে যাবে। যেমনটা বাসুদেবন মুকুন্থ লিখেছিলেন (দ্য হিন্দু, ২৩ জুন, ২০২৬), শিক্ষা কর্তৃপক্ষ ‘পৌরাণিক বিজ্ঞান’-কে প্রকৃত বিজ্ঞান, পুরাণকে ইতিহাস, আচার-অনুষ্ঠানকে প্রযুক্তি এবং সত্যতা যাচাইয়ের বিষয়টিকে প্রকাশ্য অবজ্ঞার বস্তুতে পরিণত করবে। পৌরাণিক কাহিনি, পুনর্জন্ম এবং বৈদিক জীববিজ্ঞানের উপর ‘গবেষণা’ চালানোর জন্য আরো অনেক আইআইটি-কে উৎসাহিত করা হতে পারে। সাংস্কৃতিক পুনর্জাগরণের বিষয়টি মন্দির পুনর্নির্মাণ এবং হিন্দু উৎসব উদযাপনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে। অনেক শহরে হয়তো মাংসের দোকান নিষিদ্ধ করা হতে পারে। পশ্চিমবঙ্গের পথ ধরে অন্যান্য রাজ্যও হয়তো মিড-ডে মিল বা মধ্যাহ্নভোজের তালিকা থেকে ডিম বাদ দেবে। আরো অনেক রাজ্যে অভিন্ন দেওয়ানি বিধি (ইউসিসি) পাস করা হবে। হিন্দুত্ববাদী এজেন্ডার বিরুদ্ধে গড়ে ওঠা প্রতিরোধ ভেঙে ফেলা হবে। ক্রমশ আরো বেশি সংখ্যক শিশু ও প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ কেবল একটি ভাষাতেই—অর্থাৎ হিন্দিতে—কথা বলতে ও লিখতে অভ্যস্ত হবে। এর ফলে স্টেম (এসটিইএম) শিক্ষা এবং প্রযুক্তিচালিত বিশ্বের সঙ্গে যুক্ত হওয়ার সুযোগ সংকুচিত হয়ে পড়বে (যতদিন না হিন্দি ভাষা ইংরেজি ও অন্যান্য ভাষার সমকক্ষ হয়ে উঠছে)। ধর্মীয়, ভাষাগত ও জাতিগত সংখ্যালঘুরা সর্বদা এই আশঙ্কায় দিন কাটাবে যে, ঐতিহাসিকভাবে বহুত্ববাদী এই দেশে তাদের সন্তানদের কোনো স্থান আদৌ থাকবে কি না। 
অতিধনী বনাম হতদরিদ্র জনগোষ্ঠী 
উপর্যুক্ত প্রবণতাগুলির সুদূরপ্রসারী প্রভাব পড়বে ভারতের ১৪৪ কোটি মানুষের উপর—যে সংখ্যাটি সর্বোচ্চ ১৬৭ কোটিতে পৌঁছানোর পর কমতে শুরু করবে। সরকারের যেই ক্ষমতাসীন থাকুক না কেন, ভারতের বৃদ্ধি অব্যাহত থাকবে—তা ৫ শতাংশ বা তার বেশি, যে হারেই হোক না কেন—কারণ ভারতীয়রা খাদ্য ও পণ্য উৎপাদন করবে এবং তা ভোগ অথবা রপ্তানি করবে। ধনী ও অতিধনীদের সংখ্যা বাড়বে ঠিকই, কিন্তু কোটি কোটি মানুষের এক বিশাল জনগোষ্ঠী—সামাজিক কাঠামোর একেবারে নীচের স্তরে অবস্থান করবে। এই বিপুল সংখ্যক মানুষের ক্ষেত্রে কম চাহিদা, কম ভোগ, নিম্ন জীবনযাত্রার মান এবং ধীর বৃদ্ধির মতো পরিস্থিতি দেখা যাবে। তাছাড়া, কোনো-না-কোনো অজুহাতে যদি কোটি কোটি মানুষকে ভারতের এই অগ্রগতির অংশীদার হওয়া থেকে বাদ দেওয়া হয়, তবে তাদের জীবন আরো শোচনীয় হয়ে পড়বে। ফলে ভারত আরো বেশি বৈষম্যপূর্ণ, বিভক্ত এবং ক্ষুব্ধ এক দেশে পরিণত হবে। 
আপনি হয়তো এই পাঁচটি প্রবণতা নিয়ে দ্বিমত পোষণ করতে পারেন কিংবা এগুলির সঙ্গে নতুন কিছু যোগ বা বিয়োগ করতে পারেন; কিন্তু একথা অস্বীকার করার উপায় নেই যে, দেশের গতিপথ এবং দৃশ্যমান এই প্রবণতাগুলিই বিশ্বমঞ্চে ভারতের অবস্থান নির্ধারণ করে দেবে। 
• লেখক সাংসদ ও ভারতের প্রাক্তন অর্থমন্ত্রী। মতামত ব্যক্তিগত

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ