Bartaman Logo
১০ জুন, ২০২৬
বর্তমান / সম্পাদকীয়

বিশ্বগুরুর ভাবমূর্তি কূটনীতিতে প্রভাব ফেলে না!

প্রধানমন্ত্রীর বিদেশ সফরে সাংবাদিকদের সহযাত্রা নিষিদ্ধ নরেন্দ্র মোদির জমানার শুরুর সময় থেকেই।

বিশ্বগুরুর ভাবমূর্তি কূটনীতিতে প্রভাব ফেলে না!
  • ১৮ ডিসেম্বর, ২০২৫ ০৪:০০
Prefer us on Google

মৃণালকান্তি দাস: প্রধানমন্ত্রীর বিদেশ সফরে সাংবাদিকদের সহযাত্রা নিষিদ্ধ নরেন্দ্র মোদির জমানার শুরুর সময় থেকেই। কিন্তু মোদির বিদেশ সফর নিয়ে এত ঢক্কানিনাদ দেশবাসী এর আগে কখনও দেখেনি। প্রচারে, বিজ্ঞাপনে, কূটনৈতিক উপঢৌকনের জৌলুসে, কেতাদুরস্ত পোশাকে, অনাবাসী ভারতীয়-মহাসংযোগে। প্রচার করা হয়, প্রধানমন্ত্রীর কাছে দেশবাসী শিখেছে বিপণনের মহার্ঘ কৌশল। এতে ঘরোয়া রাজনীতিতে ‘বিশ্বগুরু’-র ভাবমূর্তি তৈরি করে ভোটব্যাংকে ঢেউ তুললেও কোনও শক্তিশালী রাষ্ট্রের সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক কূটনীতিতে তার কোনও প্রভাব পড়ে না। এতদিনে তা স্পষ্ট করে দিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প।
ওয়াশিংটন ভারতকে চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে, ট্রাম্প বিদেশনীতি গড়েন সতত দেনা-পাওনায়। আন্তর্জাতিক স্থিতাবস্থার দীর্ঘমেয়াদি সুবিধার তোয়াক্কা না করে, এককালীন কেনা-বেচা, দ্রুত লাভের দিকে লক্ষ্য রেখে। নিজের লাভের জন্য অন্যের নিরাপত্তাকে খাদের ধারে ঠেলে দিতে তাঁর হাত কাঁপে না, তাতে আন্তর্জাতিক ব্যবস্থা ভিতর থেকে ধসে গেলেও (যাতে আমেরিকার দীর্ঘমেয়াদে ক্ষতি ছাড়া লাভ নেই) ট্রাম্পের নীতিতে কিছু যায় আসে না। যে কারণে ডোনাল্ড ট্রাম্পের শুল্কসংক্রান্ত সব রকম ব্ল্যাকমেল সহ্য করতে হচ্ছে ভারতকে। চুপ করে দেখতে হচ্ছে হোয়াইট হাউস সাদরে লাল কার্পেট বিছিয়ে দিয়েছে পাকিস্তানের সামরিক প্রধানের জন্য। ট্রাম্পের কাছে ভারত যে এখনও তৃতীয় বিশ্বের বেশি কিছু নয়, সে কথা আজ পরিষ্কার।
অস্বীকার করার উপায় নেই, নরেন্দ্র মোদি এবং জয়শঙ্কর গত ১১ বছরে ভারতের বিদেশনীতি যেদিকে ঝুঁকিয়েছিলেন, তাতে ওয়াশিংটনের হুকুমে সকাল-বিকেল ওঠবোস করতেন। কিন্তু ডোনাল্ড ট্রাম্প পাক সেনাপ্রধান আসিফ মুনিরকে হোয়াইট হাউসে ডেকে দাওয়াত দেওয়ার পর মোদি যে অন্ধকার গলিতে ঢুকে পড়েছিলেন, সেটা থেকে বেরিয়ে আসার জন্য রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনকে আমন্ত্রণ না জানিয়ে হয়তো উপায় ছিল না। শেষ পর্যন্ত মোদিজিকে দৃশ্যত আমেরিকার হাত ছেড়ে রাশিয়ার হাত ধরতে হয়েছে! যাঁর কাছ থেকে কম দামে তেল কেনার জন্য রোজ ট্রাম্প ধমক দিচ্ছেন, মার্কিন বাণিজ্য দপ্তরের কর্তা হুমকি দিচ্ছেন, এই শীতে সেই পুতিনকে লাল কার্পেট পেতে অভ্যর্থনা জানাতে হয়েছে। প্রোটোকল ভেঙে বিমানবন্দরে উষ্ণ আলিঙ্গন। একই গাড়িতে সওয়ার হওয়া। গার্ড অব অনার। রাষ্ট্রপতি ভবনে নৈশভোজ থেকে কাশ্মীরি জাফরান উপহার। দু’দিনের সফরে আসা রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের ‘খাতির-যত্ন’ নেহাত কম করেননি মোদি।
যা দেখে আপনার মনে হতেই পারে, ট্রাম্প ও মোদির রোমান্স আপাতত শেষ। এখন প্রবল কমিউনিস্ট বিরোধী মোদির এক পাশে চীন, অন্য পাশে রাশিয়া। যাকে বলা হচ্ছে আরআইসি– রাশিয়া, ভারত এবং চীন। তিন দেশের সাম্প্রতিকতম জোটকে আদ্যক্ষর মিলিয়ে এই নামই দিয়েছে পশ্চিমি মিডিয়া। আয়তন ধরলে অর্ধেক পৃথিবী। তিনটে দেশ জোট বাঁধলে সবচেয়ে বড়ো চ্যালেঞ্জ আমেরিকা এবং পশ্চিমি দেশগুলির। রাজনৈতিক, বাণিজ্যিক, অর্থনৈতিক– তিন দিক থেকেই। আরআইসি-র এই বন্ধুত্ব টিকে থাকলে ভারতের অন্তত তিনটি লাভ। এক, রাশিয়া-চীনের সঙ্গে বন্ধুত্ব থাকলে বাণিজ্য বাড়বে। দুই, পশ্চিমি দেশগুলিকে দেখানো যাবে, চীনও আমাদের পাশে। তিন, আমেরিকাকে দেখানো যাবে, তোমাকে ছাড়াও আমি চলতে পারি। এবং এই মুহূর্তে তিন নম্বরটাই হয়তো আসল। নেহরু-ইন্দিরার সময়ও ভারত রাশিয়াকে বন্ধু ভাবত। আমেরিকা ছিল শত্রুপক্ষ পাকিস্তানের পাশেই। আজ স্পষ্ট হয়ে গিয়েছে, ‘সন্ত্রাসবাদ নিয়ে সমালোচিত’ পাকিস্তানের হাত ছাড়তে নারাজ আমেরিকা, একইসঙ্গে মোদির সঙ্গে ‘বন্ধুত্ব’-র জন্য ট্রাম্প একটি নয়াপয়সাও ছাড়বেন না। ট্রাম্প বুঝিয়ে দিয়েছেন, আমেরিকার বিভিন্ন পণ্যকে ভারতের বাজারজাত করার সুবিধা না দেওয়া হলে, সাউথ ব্লকের কপালে দুঃখ আছে!
ওয়াশিংটনের সঙ্গে নয়াদিল্লির সম্পর্ক কতটা তিক্ত হবে, তা হয়তো ভবিষ্যৎ বলবে। কিন্তু ওয়াশিংটন যে আমাদের পশ্চিমের প্রতিবেশী দেশ পাকিস্তান এবং পুবের প্রতিবেশী দেশ বাংলাদেশের ইউনুস সরকারকে জোর কদমে মদত দিয়ে চলেছে, সেই বিষয়েও কোনও সংশয় নেই। এই পরিস্থিতিতে দাঁড়িয়ে হয়তো মোদির পক্ষে সত্যিই আমেরিকার প্রতি বিশ্বাস রাখা কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে। যখন পুবের প্রতিবেশী দেশে মৌলবাদের উত্থান হচ্ছে, তখন আমাদের মনে রাখতে হবে, ১৯৭১-এ বাংলাদেশকে স্বাধীন করার ক্ষেত্রে বা পাকিস্তানের বিরুদ্ধে জয় করার ঘটনাতেও ভারতের পাশে দাঁড়িয়েছিল তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়ন। ইন্দিরা গান্ধী মস্কোকে পাশে নিয়ে সেদিন যেভাবে নিক্সন, কিসিঞ্জারদের রুখে দিয়েছিলেন, তাঁদের চোখে চোখ রেখে কথা বলেছিলেন, অবশ্যই সেই সাহস নরেন্দ্র মোদি বা জয়শঙ্কররা এখনও দেখাতে পারেননি। তবে মোদি-জয়শঙ্কররা নিশ্চয়ই বুঝতে পেরেছেন, ওয়াশিংটনের দিকে অন্ধভাবে ঝুঁকে থাকলে কী হতে পারে! সেই কারণেই গত ছয় মাসে ভারতের বিদেশনীতি বদলেছে। বিদেশমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর বারে বারেই বলেন, বিশ্ব-রাজনীতির অসঙ্গতিগুলি ধরে সেই মুহূর্তে যোগ্য সঙ্গী খুঁজতে হবে। কিন্তু সঙ্গী খোঁজার মূলমন্ত্র যদি হয় স্বল্পমেয়াদি মুনাফা, তা হলে তো বিপদ ঘটবেই। তাছাড়া দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক নির্ণীত হয় পারস্পরিক স্বার্থ এবং শক্তির সমীকরণের উপরে ভিত্তি করে। পারস্পরিক সম্পর্কের উপরে নয়। নেতাদের ব্যক্তিগত সম্পর্কের একটা গুরুত্ব থাকে। তবে সেটা স্বার্থের ভিত্তিতে। কিন্তু ভারতের ক্ষেত্রে ব্যক্তিগত সম্পর্কের রসায়নকেই বড়ো করে সামনে নিয়ে আসা হয়। এই একই ভুল করা হয়েছিল মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গেও। এখন তার খেসারত দিতে হচ্ছে।
এই মুহূর্তে অনুগত সংবাদমাধ্যম মোদির দূরদর্শিতা ও বিচক্ষণতায় গদগদ। তারা উৎফুল্ল, ট্রাম্পের পাগলপনা ও চাপের কাছে মাথা না নুইয়ে চীন ও রাশিয়ার সঙ্গে হাত মিলিয়ে মোদি পালটা চাপ সৃষ্টি করতে পেরেছেন বলে। তবে এটাও ঠিক, পুতিনের সঙ্গে মোদির নির্ভেজাল দীর্ঘস্থায়ী বন্ধুত্ব আপাতত হয়তো সম্ভব। কিন্তু চীনের সঙ্গে? অর্থনৈতিক প্রশ্নে ভারত ক্রমশ কোণঠাসা। অর্থনীতির অতিরিক্ত চীননির্ভরতা সেই অবস্থার কারণ। দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যের ক্ষেত্রে চীন যদি গালিভার হয়, ভারত তা হলে লিলিপুট। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে দুই দেশের বাণিজ্যের পরিমাণ ১২৭.৭৫ বিলিয়ন ডলার। এই বাণিজ্য প্রায় পুরোটাই একপক্ষীয়। কারণ, চীনে ভারতের রপ্তানি মাত্র ১৪.২৫ বিলিয়ন ডলার, আমদানি যেখানে ১১৩.৫০ বিলিয়ন। বাণিজ্যঘাটতির পরিমাণ প্রায় ১০০ বিলিয়ন! ট্রাম্পের খামখেয়ালিপনা থেকে মোদিকে বাঁচাতে জি জিনপিংয়ের হাত বাড়ানোর অর্থ ভারতকে আরও বেশি চীননির্ভর করে তোলা। চীনও তা–ই চায়। সেটিই প্রধান লক্ষ্য। 
একসময় যেসব পণ্য ভারতে তৈরি হতো, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের যে রমরমা অবস্থা ছিল, আজ তা অন্তর্হিত। ইলেকট্রিক্যাল ও ইলেকট্রনিক পণ্যের বাজারের ৯৭ ভাগ আজ চীনের দখলে। ‘মেক ইন ইন্ডিয়া’ কিংবা ‘ভোকাল ফর লোকাল’ নিতান্তই স্লোগান হয়ে থেকেছে। চীনা অক্টোপাসের বন্ধনে জড়িয়ে পড়েছে ভারত। ট্রাম্পের শুল্কযুদ্ধ ও সম্প্রতি মোদির তিয়ানজিং সফর তাই একজনেরই হাসি আকর্ণ বিস্তৃত করেছে— জি জিনপিং। মার্কিন মুলুকেই বলাবলি শুরু হয়েছে, ভারতের দুর্বল হওয়া আমেরিকার পক্ষে ক্ষতিকর। কারণ, তাতে চীনের ক্ষমতা, প্রতিপত্তি ও শক্তি আরও বাড়বে। শুল্কযুদ্ধের কারণে আমেরিকায় রপ্তানি অর্ধেক কমে গেলে ভারতের বার্ষিক প্রবৃদ্ধি ৬ শতাংশের নীচে চলে যাবে। এমনই মত, আন্তর্জাতিক রেটিং সংস্থা মুডিসের। কিন্তু তার চেয়েও বড়ো কথা, কর্মহীন হবে অন্তত ৫০ লাখ মানুষ। সেই সুযোগে চীনের থাবা আরও গেড়ে বসবে।

Advertisement


মোদি, জিনপিং ও পুতিনকে মার্কিন প্রেসিডেন্টই কাছাকাছি এনেছেন। এতে আখেরে লাভ চীনের এবং চীনের লাভ মানে আমেরিকার ক্ষতি। ট্রাম্প এই সহজ সত্যটুকু কেন বুঝছেন না, সেই প্রশ্ন তাঁর দেশেই উঠছে। যা নিয়ে তাঁর জেদ, বাণিজ্যচুক্তি আলোচনা প্রধানত যে কারণে থমকে গিয়েছে, সেই কৃষি ও ডেয়ারি শিল্প উন্মুক্ত করা নরেন্দ্র মোদি কেন, ভারতের কোনও নেতার পক্ষেই সম্ভবপর নয়। ভারতের জিডিপিতে কৃষির অবদান প্রায় ২০ শতাংশ, ডেয়ারির ৫ শতাংশ। সরকারি হিসাবে, ২০২৩-২৪ সালে কৃষিতে নিযুক্ত মানুষের সংখ্যা ছিল ৫২ শতাংশ। ডেয়ারি শিল্পে সরাসরি নিযুক্ত আট কোটি। ক্ষেত্র দু’টি উন্মুক্ত হলে ৭০ কোটি গ্রামীণ মানুষের জীবিকা ক্ষতিগ্রস্ত হবে। স্টেট ব্যাংক অব ইন্ডিয়ার রিপোর্ট, ডেয়ারি শিল্প উন্মুক্ত হলে ২৫ মিলিয়ন টন দুধ আমদানি হবে। ভারতীয় দুধের দাম কমে যাবে ১৫ শতাংশ। বিরাট ধাক্কা লাগবে ভারতীয় অর্থনীতিতে।


অনেক ভারতীয় বিশ্লেষক, যাঁরা মোদি সরকারের রাজনীতির সমালোচক, তাঁরা রাতারাতি চীনের সঙ্গে আলোচনা পুনর্বিন্যাসের বিষয়টি হজম করতে পারছেন না। তাঁদের অভিযোগ, ‘অপারেশন সিন্দুর’-এ পাকিস্তানকে সাহায্য করতে চীন বিশেষ ভূমিকা রেখেছিল। তাঁরা জোর দিয়ে বলছেন, দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের বর্তমান জটিল অবস্থার জন্য মূলত ‘মোদির কূটনীতিই বেশি দায়ী’। গালওয়ানের দখল জমি চীনা ফৌজ এখনও ছাড়েনি, প্রকৃত নিয়ন্ত্রণরেখায় স্থিতাবস্থা ফেরেনি, ‘বাফার জোন’ এখনও মেষপালকদের কাছে ‘নো এন্ট্রি’, অপারেশন সিন্দুরের সময় চীন-পাকিস্তান যুগলবন্দির রেশও টাটকা। সব বেমালুম ভুলে জি জিনপিং বরণে আখেরে ভারতের লাভ না লোকসান— সেটাই এখন ধোঁয়াশা!
তবে মোদি সরকারের প্রাথমিক লক্ষ্য, ট্রাম্পের শুল্ক-সন্ত্রাস ঠেকাতে ভারতীয় রপ্তানিকারীদের দ্রুত বিকল্প বাজার খুঁজে দেওয়া। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ভারতীয় দূতাবাসগুলিও নতুন বাজার খোঁজা শুরু করে দিয়েছে। আসলে আবেগ বা উষ্ণতায় নয়, দুই শক্তিশালী রাষ্ট্রের সম্পর্ক তৈরি হয় দেনা-পাওনায়, পারস্পরিক জাতীয় স্বার্থের তুল্যমূল্যে— কূটনীতির এই সহজ ভাষা হয়তো উপলব্ধি হয়েছে এতদিনে। রাশিয়া ও চীনের সঙ্গে কূটনীতির পথ পরিবর্তন থেকেই বোঝা যায়, সাউথ ব্লক বাস্তবতাকে আর অস্বীকার করতে পারছে না। এতদিনে তারা হয়তো বুঝেছে, মোদিজির বিশ্বগুরুর ভাবমূর্তি দ্বিপাক্ষিক কূটনীতিতে কোনও প্রভাব ফেলে না!

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ