ভারতীয় গণতন্ত্রের মুকুটে যে কয়েকটি প্রতিষ্ঠান সবচেয়ে উজ্জ্বল ও আস্থার প্রতীক হিসাবে বিবেচিত হয়, তার মধ্যে অন্যতম নির্বাচন কমিশন। একটি স্বচ্ছ, নিরপেক্ষ নির্বাচন পরিচালনা করাই এই সাংবিধানিক সংস্থার মূল দায়িত্ব। কিন্তু সম্প্রতি এক সর্বভারতীয় সংবাদমাধ্যমের অন্তর্তদন্তমূলক প্রতিবেদন সেই আস্থার ভিতকেই নাড়িয়ে দিয়েছে। এসআইআর প্রক্রিয়াকে কেন্দ্র করে দেশের মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমার ও অন্য দুই নির্বাচন কমিশনার—সুখবীর সিং সান্ধু ও বিবেক যোশির মধ্যে তীব্র অন্তর্দ্বন্দ্ব প্রকাশ্যে এসেছে সেই সুবাদেই। গত ১০ মাসে ১৪ বার জ্ঞানেশ কুমারের একক সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে দুই কমিশনার লিখিত আপত্তি জানিয়েছেন বলে খবরে প্রকাশ। তবে কি সাংবিধানিক নিয়মনীতিকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে কমিশনের অন্দরেই একচ্ছত্র একনায়কতন্ত্র চলছে?
সংবিধানের ৩২৪ অনুচ্ছেদের অধীনে নির্বাচন কমিশন একটি সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান। এতে রয়েছেন মুখ্য নির্বাচন কমিশনার এবং দুই নির্বাচন কমিশনার। পদমর্যাদার দিক থেকে তিনজনই সমান। মুখ্য নির্বাচন কমিশনার অবশ্য ‘সমানদের মধ্যে প্রথম’। কিন্তু তিনি এককভাবে সিদ্ধান্ত নিতে পারেন না। অথচ সাম্প্রতিক প্রকাশিত খবরের তথ্য বলছে, ভোটার তালিকার ডিজিটাইজেশন, তথ্যপ্রযুক্তি পোর্টালের নিয়ন্ত্রণ থেকে শুরু করে ফর্ম-৬-এ পরিবর্তন—বহু গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তেই বাকি দুই কমিশনারকে অন্ধকারে রাখা হয়েছে। এসআইআর প্রক্রিয়ায় তাঁদের না জানিয়েই ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ দেওয়া ও নতুন নাম সংযোজন করা হয়েছে। এমনকি আইটি বিভাগের ডিজি সীমা খান্নার মাধ্যমে যেভাবে সমস্ত ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত করা হয়েছে বলে অভিযোগ, তাতে নির্বাচন আধিকারিকদের হাতও কার্যত বেঁধে ফেলা হয়েছে। গোয়ায় সফটওয়্যার সংক্রান্ত ত্রুটির কারণে সুপ্রিম কোর্টের স্পষ্ট নির্দেশ থাকা সত্ত্বেও ৯৭ জন যোগ্য ভোটারের নাম ফিরিয়ে দেওয়ার কোনো ব্যবস্থা করা হয়নি। ফলস্বরূপ, দেশজুড়ে কোটি কোটি ভোটারের নাম বাদ পড়ার মতো মারাত্মক অভিযোগ উঠেছে। এই তথ্য প্রকাশ্যে আসার পর থেকেই দেশের রাজনীতিতে তুমুল ঝড় উঠেছে। লোকসভা ও রাজ্যসভায় বিরোধীদের পক্ষ থেকে আগেই জ্ঞানেশ কুমারের অপসারণের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল। নতুন এই তথ্য সামনে আসায় তৃণমূল নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় থেকে শুরু করে কংগ্রেস নেতা রাহুল গান্ধী, সমাজবাদী পার্টির অখিলেশ যাদব, শিবসেনা (ইউবিটি)-র উদ্ধব থ্যাকারে, আপ প্রধান অরবিন্দ কেজরিওয়াল, ডিএমকে প্রধান এমকে স্ট্যালিন—প্রত্যেকেই তীব্র আক্রমণ শানিয়েছেন। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় তো এক ধাপ এগিয়ে জ্ঞানেশ কুমারের গ্রেপ্তারি এবং সম্প্রতি হওয়া সমস্ত নির্বাচন বাতিল করে পুরানো ভোটার তালিকায় পুনর্নির্বাচনের দাবি তুলেছেন। বাম দলগুলিও নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষতা ফিরিয়ে আনতে সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতিকে কমিশনে ফের যুক্ত করার পক্ষে সওয়াল করেছে।
বিরোধীদের এই আক্রমণের অবশ্য জবাবে দিয়েছে কমিশনও। বলা হয়েছে, যে কোনো সুস্থ ও গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানেই ভিন্নমত থাকতে পারে। কমিশনারদের মধ্যে আলোচনা ও মতবিনিময় স্বাভাবিক প্রক্রিয়া এবং গত এক বছরে এসআইআর সহ প্রায় ৪০টি উদ্যোগ সম্পূর্ণ সর্বসম্মতভাবে নেওয়া হয়েছে। বিজেপির মুখপাত্র সম্বিত পাত্র দাবি করেছেন, এই ধরনের অভ্যন্তরীণ আলোচনা ও মতপার্থক্য কোনো অনিয়ম নয়। এটাই সুস্থ গণতন্ত্রের প্রমাণ। এত কিছুর পরেও নির্বাচন কমিশনের মতো একটি সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানের অন্দরে এই ধরনের নজিরবিহীন মতানৈক্য এবং স্বৈরাচারী মনোভাবের অভিযোগ সহজে ধামাচাপা দেওয়া যাচ্ছে না। আর ভোটার তালিকার মতো অত্যন্ত সংবেদনশীল বিষয়ে যদি প্রশাসনের শীর্ষস্তর থেকেই অস্বচ্ছতা ও একতরফা সিদ্ধান্তের অভিযোগ ওঠে, তবে তা সাধারণ মানুষের ভোটাধিকারের মৌলিক অধিকারকেই প্রশ্নচিহ্নের মুখে ফেলে দেয়। একটি স্বাধীন ও নিরপেক্ষ সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানের মর্যাদা ক্ষুণ্ণ হলে তা গোটা দেশের গণতান্ত্রিক ভবিষ্যতের জন্য এক বিপজ্জনক সংকেত। কারণ, কমিশন যদি স্বচ্ছতা হারায়, তবে গণতন্ত্রের শেষ ভরসাস্থলটুকুও ভেঙে পড়বে। তাই এই অন্তর্বিরোধ বা ভোটার তালিকা সংশোধনের নামে চলা অনিয়মের একটি উচ্চপর্যায়ের নিরপেক্ষ বিচারবিভাগীয় তদন্ত অত্যন্ত জরুরি। গণতন্ত্রের অন্যতম মূল স্তম্ভকে রক্ষা করতে এবং দেশের প্রতিটি নাগরিকের ভোটাধিকার সুনিশ্চিত করতে নির্বাচন কমিশনকে অবিলম্বে সম্পূর্ণ স্বচ্ছ এবং পক্ষপাতহীন হয়ে উঠতে হবে। অন্যথায় দেশের সংসদীয় গণতন্ত্রের বিশ্বাসযোগ্যতা গভীর সংকটের মুখে পড়বে।