Bartaman Logo
১০ জুন, ২০২৬
বর্তমান / রবিবার

কালবেলিয়াদের রূপকথা

দূর দিগন্তে আরাবল্লি পর্বতের ঝাপসা আকাশরেখায় কিছুক্ষণ আগেই মুছে গিয়েছে অস্তরাগের শেষ ছোঁয়াটি। সন্ধ্যার আকাশে ক্রমশ উজ্জ্বল হচ্ছে তারার চিকিমিকি।

কালবেলিয়াদের রূপকথা
  • ৮ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ ১২:০২
Prefer us on Google

স্বয়ংদীপ্ত বাগ

Advertisement

• দূর দিগন্তে আরাবল্লি পর্বতের ঝাপসা আকাশরেখায় কিছুক্ষণ আগেই মুছে গিয়েছে অস্তরাগের শেষ ছোঁয়াটি। সন্ধ্যার আকাশে ক্রমশ উজ্জ্বল হচ্ছে তারার চিকিমিকি। ধু ধু মরুর বুকে ঝলমলে সার সার তাঁবু। পাশে শান্ত বিশ্রামে উটের দল। ওদিকে খোলা আকাশের নীচে জমে উঠেছে রাজস্থানি লোকনৃত্যের আসর। মাটির গন্ধমাখা গানের সঙ্গে পুঙ্গি, খঞ্জরির মাতাল করা সঙ্গতে দুলছে বাতাস... ‘আরা রা রা রা রা রা রা রে, ও কাল্য কুড পাড়ো মেলে মে’... শুরু হল সাপের ঢঙে বিখ্যাত কালবেলিয়া নাচ। বিস্ময়ে স্তব্ধ দর্শককুল। কালবেলিয়া নাচের এমন টুকরো কোলাজ ছড়িয়ে রাজস্থানের পথে-প্রান্তরে, যা বিশ্বজুড়ে বিশেষ পরিচিতি এনে দিয়েছে ভারতীয় মরুপ্রদেশের এই যাযাবর উপজাতিকে। 
সাপ ধরা, সাপের বিষ বিক্রি আর পরিবার-গৃহপালিত পশুদের নিয়ে রুক্ষ পাহাড়-মরুভূমির বুকে ঘুরে ঘুরে জীবন কাটানো— এমনই ছিল কালবেলিয়াদের জীবন। সমাজও এদের খুব একটা উঁচু নজরে দেখত না। ফলে গ্রামের অন্য সকলের সঙ্গে বসবাস করা ছিল দুঃস্বপ্ন মাত্র। গ্রামের উপকণ্ঠে কখনো কখনো অস্থায়ীভাবে ডেরা বাঁধত এই উপজাতিভুক্ত মানুষজন। দারিদ্র্য ও অনিশ্চয়তাই নিত্যসঙ্গী। তবু অবসর সময়ে সকলে মেতে থাকত প্রাণাধিক প্রিয় নাচ-গানে। ১৯৭২ সালে বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ আইন চালু হওয়ায় আজন্মের জীবিকা হারিয়ে অথৈ জলে পড়ে যায় কালবেলিয়ারা। যাযাবর জীবন ও সমাজের মূলস্রোত থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়ার কারণে এই উপজাতির মধ্যে শিক্ষার আলো বিশেষ পৌঁছায়নি। ফলে রাতারাতি অন্য পেশায় যাওয়াও সম্ভব ছিল না। আর সেই কারণেই একরকম অস্তিত্ব রক্ষার তাগিদে তারা জোর দেয় পরম্পরাগতভাবে একমাত্র ভরসা ‘কালবেলিয়া নাচ’ বা ‘সাপুড়ে নাচ’ এবং গানে। খুব অল্প সময়ের মধ্যেই এই নাচ-গান পরিবেশনার একটা অত্যন্ত আকর্ষণীয়, শিল্পগুণসম্পন্ন আধুনিক রূপও আবিষ্কার করে ফেলে কালবেলিয়ারা। দেশি-বিদেশি পর্যটকদের মধ্যে তা দ্রুত জনপ্রিয় হয়ে ওঠে।
২০১০ সাল। ইউনেস্কোর ‘ইনট্যানজিবল কালচারাল হেরিটেজ অব হিউম্যানিটি’র তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হয় কালবেলিয়াদের নাচ-গান। নতুনভাবে বাঁচার রসদ খুঁজে পায় আকস্মিকভাবে জীবিকাচ্যুত, প্রায় সহায় সম্বলহীন, পিছিয়ে পড়া এক দিশাহারা সম্প্রদায়। ইউনেস্কোর ভাষায়, ‘একসময়ের পেশাদার সাপ ধরার কারিগর কালবেলিয়ারা আজ সংগীত ও নৃত্যে তাদের পূর্বের পেশাকে নতুন এবং সৃজনশীল উপায়ে বিকশিত করছে। নিজেদের সম্প্রদায়ের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যকে পুনরুজ্জীবিত করার এবং পরিবর্তিত আর্থ-সামাজিক অবস্থার সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেওয়ার প্রচেষ্টা দেখাচ্ছে।’ মানতেই হবে, এ এক অন্যধারার জীবন সংগ্রাম!
কিন্তু কোথা থেকে এল এই ‘কালবেলিয়া’ শব্দটি? ‘কাল’ কথার অর্থ সাপ এবং ‘বেলিয়া’র অর্থ বন্ধু। জনশ্রুতি অনুযায়ী, জনৈক ঋষি কানিফনাথের হাতে নাকি বিষের বাটি তুলে দিয়েছিলেন গুরু গোরখনাথ। গুরুর ইচ্ছা অনুযায়ী নির্দ্বিধায় শেষ বিন্দু পর্যন্ত বিষ পান করেন কানিফনাথ। তার পরেই গোরখনাথ সন্তুষ্ট হয়ে তাঁকে বিষ হজম করার শক্তির পাশাপাশি বিষাক্ত প্রাণীদের পরিচালনা করার ক্ষমতাও প্রদান করেন। পরবর্তীকালে, আনুমানিক দ্বাদশ শতাব্দীতে রাজস্থানের থর মরু সন্নিহিত অঞ্চলে এই কানিফনাথের অনুগামীরাই কালবেলিয়া নামে পরিচিত হয়। মূলত রাজস্থানের যোধপুর, জয়সলমির, জালোর, বারমের, পালি, চিতোরগড়, উদয়পুর জেলায় এবং জয়পুর ও পুষ্কর শহরে এখন তাঁদের দেখতে পাওয়া যায়।  
কালবেলিয়ারা সাপকে বরাবরই অত্যন্ত গুরুত্ব দিত। স্থানীয় উদ্ভিদ, ভেষজ ও জড়িবুটি ও প্রাণীজগৎ সম্পর্কেও এই সম্প্রদায়ের মানুষজনের অগাধ জ্ঞান। নানান সামাজিক উৎসব-অনুষ্ঠানে রাজ দরবারেও ডাক পড়ত কালবেলিয়াদের। মুঘল আমলে সাপ নিয়ে নানা কৌশল ও ঐতিহ্যবাহী নাচ পরিবেশনের জন্য তাদের আমন্ত্রণ জানাতেন সুলতান-নবাবরাও। ‘শুধকোষ: জার্নাল অব ভিস্যুয়াল অ্যান্ড পারফর্মিং আর্টস’-এ প্রকাশিত একটি গবেষণাপত্র জানাচ্ছে যে, দ্বাদশ ও ত্রয়োদশ শতাব্দী ছিল কালবেলিয়া সম্প্রদায়ের জন্য স্বর্ণযুগ। যদিও ব্রিটিশ শাসনে তাদের ‘অপরাধী উপজাতি’ হিসাবে দাগিয়ে দেওয়া হয়। স্বাধীনতার পরেও দীর্ঘদিন সেই কালো দাগ মেটেনি। অনেকেই খুব একটা ভালো নজরে দেখত না এই সম্প্রদায়ভুক্ত মানুষদের। ফলে জীবন-জীবিকার জন্য লড়াই চালিয়ে যেতে হয়। একদিকে প্রতিকূল পরিবেশ, অন্যদিকে পেট চালানোর তাগিদ—তাই সাপ নির্ভর পেশাতেই আটকে থাকেনি কালবেলিয়ারা। নানা সময়ে নানা কাজের মাধ্যমে তারা কিছু না কিছু উপার্জনের চেষ্টা করত। এমনকি সাম্প্রতিক অতীতে কাঠকয়লা বানিয়ে বিক্রি করতেও দেখা গিয়েছিল অনেককে।
জীবিকার প্রয়োজনে কালবেলিয়ারা যখন যে কাজই করে থাকুক না কেন, গোটা বিশ্ব কিন্তু এই সম্প্রদায়কে চিনেছে তাদের নিজস্ব ঘরানার নাচগানের জন্যই। লোকসংগীত, লোকনৃত্যে দেশ-বিদেশের মানুষের মন জয়ের পাশাপাশি রাজ্য, জাতীয় ও আন্তর্জাতিক স্তরে উল্লেখযোগ্য স্বীকৃতিও পেয়েছেন এই শিল্পীরা। কিন্তু ভাবতে অবাক লাগে, তথাকথিত প্রথাগত কোনো শিক্ষার মধ্যে দিয়ে এই জ্ঞান আহরণ করেনি তারা। এমনকি এই নাচ-গান শেখার জন্য কোনো সংগঠিত প্রশিক্ষণ ব্যবস্থা, প্রতিষ্ঠান, পাণ্ডুলিপি বা বই পর্যন্ত ছিল না। যাবতীয় কৌশল শুধুমাত্র পরস্পরকে দেখে বা শুনে দিব্যি রপ্ত করে নেওয়া হয়। বংশ পরম্পরায় কালবেলিয়ারা এভাবেই তাদের সংস্কৃতিকে বাঁচিয়ে রেখেছে, যা সত্যিই অবাক করার মতো। যদিও সাম্প্রতিককালে ছবিটা ধীরে ধীরে বদলাচ্ছে। কালবেলিয়া নাচ-গান শিক্ষার জন্য কিছু কিছু প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে। এর মধ্যে পদ্ম সম্মানে ভূষিত ও আন্তর্জাতিক খ্যাতি সম্পন্ন কালবেলিয়া নৃত্যশিল্পী গুলাবো সাপেরার উদ্যোগ বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। তাদের গান ও নৃত্য পরিবেশনায় আরও আধুনিকতার ছোঁয়া আনতে বিভিন্ন জায়গায় নানা পরীক্ষানিরীক্ষাও চলছে। আইআইটি যোধপুরের স্কুল অব লিবারেল আর্টসের অধ্যাপিকা আয়লা জনছিরের যেমন দাবি, কালবেলিয়া নাচ আসলে ‘ইন্ডিয়ান জিপসি ড্যান্সিং’। আরও চমকপ্রদ তথ্য হল, ইউরোপ এবং আরব দুনিয়ায় ছড়িয়ে থাকা জিপসিদের সঙ্গে নাকি কালবেলিয়াদের সম্পর্ক রয়েছে। জওহরলাল নেহরু ইউনিভার্সিটির ‘জার্নাল অব দ্য স্কুল অফ ল্যাঙ্গুয়েজ, লিটারেচার অ্যান্ড কালচার স্টাডিজে’র তরফে প্রকাশিত একটি গবেষণাপত্র জানাচ্ছে, ভারতের রাজস্থানি লোকনৃত্য কালবেলিয়া এবং ইউরোপীয় জিপসি নৃত্যের মধ্যে ভঙ্গিমা, পায়ের কাজ ও অভিব্যক্তির সাদৃশ্য রয়েছে, যা সম্ভবত ঐতিহ্যবাহী ‘সাপেরা’ বা ‘যোগী’ লোকনৃত্য থেকে উদ্ভূত। কালবেলিয়া এবং জিপসি নাচের সময় পরিবেশিত ছন্দবদ্ধ গানের মধ্যেও বেশ মিল খুঁজে পাওয়া যায়। এই গবেষণাটিতে এও দাবি করা হয়, কালবেলিয়া নাচ হল একটি যাযাবর নৃত্যশিল্প, যা ভারতের প্রাচীনতম শিল্পকলাগুলির মধ্যে অন্যতম। গোটা সম্প্রদায়ের প্রাচীন জীবনধারা এই নাচের মধ্যে দিয়ে প্রতিফলিত হয়। যদিও কালবেলিয়া নাচের বর্তমান যে মনোমুগ্ধকর ধারাটির সঙ্গে আমরা পরিচিত, তা নাকি আটের দশকের সৃষ্ট বলে অভিমত অধ্যাপিকা আয়লা জনছিরের। তবে ঘটনা যেমনই হোক না কেন, এই নৃত্যশৈলী সত্যিই অসাধারণ।
প্রাণবন্ত লোকসংগীতের সঙ্গে নাচের বিভঙ্গ, সাপের মতো তরঙ্গ ও চোখধাঁধানো ঘূর্ণায়মান উপস্থাপনা নিমেষে মন্ত্রমুগ্ধ করে দেয় উপস্থিত দর্শকদের। লাবণ্যময় নাচে শরীরজুড়ে মুহুর্মুহু খেলা করতে থাকে এক অনবদ্য জ্যামিতি... শিল্পীর শরীর যেন কথা বলে! প্রথাগতভাবে কেবলমাত্র কালবেলিয়া মহিলারাই এই নাচে অংশগ্রহণ করে। নৃত্যরতা মহিলাদের সঙ্গে অন্যরা মুখে মুখে তাৎক্ষণিকভাবে গান রচনা করে এবং নৃত্যের সঙ্গে তা পরিবেশিত হয়। তবে এই গানগুলি মূলত পৌরাণিক ও লোককাহিনির উপর ভিত্তি করে রচিত। এসব থেকে একটা বিষয় বেশ পরিষ্কার যে আজ সমাজজীবনে, কালবেলিয়াদের উত্তরণ ও বিশ্ব দরবারে তাদের নাচগানের প্রতিষ্ঠার নেপথ্যে মহিলাদের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। অথচ একটা সময় কালবেলিয়া সমাজে কন্যাসন্তান ছিল অবাঞ্ছিত। এমনকি জন্মের পর সেই কন্যাসন্তানকে জ্যান্ত পুঁতে ফেলার মতো কুপ্রথাও প্রচলিত ছিল। কিন্তু আজ সেই ছবিটা আমূল বদলে গিয়েছে। নারীর ক্ষমতায়নের এ এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। যদিও আজকাল  পরিবর্তন আসছে কালবেলিয়া নাচগানের রীতিনীতিতেও। আজ পুরুষ এবং মহিলা উভয়ই কালবেলিয়া নাচগান প্রদর্শনে অংশগ্রহণ করছে। সেই নাচের উপস্থাপনার ক্ষেত্রে চলছে নানারকম পরীক্ষা নিরীক্ষা। প্রয়োগ করা হচ্ছে আধুনিক প্রযুক্তি, বাদ্যযন্ত্র।   
 পরম্পরাগতভাবে মহিলাদের গান ও নাচের সময় পুরুষেরা অনেকটা বাঁশির মতো দেখতে পুঙ্গি সহ ডাফলি, মোরচাঙ, ঢোলক, খঞ্জরী, খুরালিও ইত্যাদি দেশীয় বাদ্যযন্ত্র বাজিয়ে যথাযোগ্য সঙ্গত করে। জমকে ঠমকে জমে ওঠে কালবেলিয়া লোকনৃত্যের আসর। নাচের সময় মহিলারা তাদের চিরাচরিত জমকালো পোশাক পরে। এগুলির মধ্যে রয়েছে আংরাখি, ওধানি ও ঘাঘরা। দর্শকদের দৃষ্টি আকর্ষণের জন্য এদের পোশাকগুলিতে গাঢ় কালোর উপর লাল, হলুদ, সবুজের মতো বিভিন্ন রঙের ব্যবহার করা হয়। সঙ্গে দৃষ্টিনন্দন সূচিকর্ম। ছোটো ছোটো আয়না ও ঘুঙুর দিয়ে সাজিয়ে এক অনবদ্য নকশা ফুটিয়ে তোলা হয়। এর ফলে নাচের সময় যেমন সাপের চলনের মতো ঢেউ ওঠে, তেমনই পোশাক মুখরিত হয় ঝনঝন শব্দে। আম জনতার মধ্যেও জনপ্রিয়তা পেয়েছে কালবেলিয়াদের একেবারে নিজস্ব ঘরানার এই নাচের পোশাক। তবে শুধু পোশাক নয়, নৃত্যশিল্পী মহিলারা সুরমা, বিন্দি, রুপোলি গয়না ইত্যাদিতে নিজেদেরকে অপরূপা করে তোলে। মাথায় রঙিন পাগড়ি সহ প্রথাগত পোশাকে সারিবদ্ধভাবে বসে পুরুষদের সঙ্গতও দর্শক শ্রোতাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে।
সাধারণত ফাল্গুন ও চৈত্র মাসে ঢোল সহযোগে পরিবেশিত হয় কালবেলিয়া নাচ। এই নৃত্যের বেশ কয়েকটি ধারার কথা ‘কালবেলিয়া: গীত আউর নৃত্য’ বইতে উল্লেখ করেছেন মোহনলাল জোড। যেমন, ‘ইন্দোনি’-র পরিবেশন গোলাকারে এবং ধীর গতিতে। নেপথ্যে বাজে পুঙ্গি ও খঞ্জরির মতো বাদ্যযন্ত্র। প্রেমের সম্পর্ক ও বিরহবেদনা চিত্রিত হয় ‘শঙ্করিয়া’ যুগল নৃত্যে। সঙ্গে থাকে বিষণ্ণ গান। ‘পানিহারি’ নাচে ফুটে ওঠে জল নিয়ে আসার অর্থাৎ ‘পানঘাট’-এর বিশেষ ছন্দ ও রূপকল্প। আবার ‘অগ্নি’ নৃত্যে শিল্পীরা যেন একটি ফুলের উপর দিয়ে হাঁটছেন বলে মনে হয়। এটি আদতে একটি অতিপ্রাকৃত অলৌকিক নৃত্যের প্রতীক। আবার, গান এবং পুঙ্গির সুরের সঙ্গে সঙ্গে কোমর, বুক ও মাথা পিছনের দিকে ঝুঁকিয়ে শিল্পীরা মেতে ওঠে জনপ্রিয় ‘কোবরা’ নাচে। ফনা তোলা সাপের আদলে নাচের মাঝে পিঠ পিছন দিকে বেঁকিয়ে মুখ দিয়ে মাটি থেকে টাকা বা কোনো মূল্যবান দ্রব্য তোলেন অনায়াস দক্ষতায়! কালবেলিয়া নৃত্যকে  সমস্ত রাজস্থানি নৃত্যের মধ্যে অন্যতম সংবেদনশীল বলে উল্লেখ করা হয়েছে রাজস্থান সরকারের অফিসিয়াল ওয়েবসাইটেও।
শোনা যায়, নৃত্যশিল্পী মহিলারা যে সুরমা পরেন তা নাকি সাপের বিষ থেকে তৈরি করা হয়! এই সুরমার ওষধি গুণের জন্যেই নাকি এদের মধ্যে চোখের রোগ সেভাবে দেখা যায় না। তীক্ষ্ণ দৃষ্টির জন্যও এরা এই সুরমার ব্যবহার করে। সবচেয়ে বড় কথা, সুরমা তৈরির ক্ষেত্রে কালবেলিয়াদের দীর্ঘদিনের পছন্দ এই সাপের বিষ নাকি এখন বাণিজ্যিক প্রসাধন শিল্পেও ব্যবহৃত হচ্ছে। মূলত ‘অ্যান্টি রিঙ্কল এজেন্ট’ বা বার্ধক্যজনিত বলিরেখা প্রতিরোধী একটি উপাদান হিসাবে। শুধু বিষধর সাপ ধরা বা দুর্দান্ত নাচগান নয়, কালবেলিয়াদের সামাজিক জীবনেও রয়েছে নানা  চমক। যেমন, হিন্দু ধর্ম পালন করলেও কালবেলিয়া সম্প্রদায় মৃতদেহ পুড়িয়ে ফেলার পরিবর্তে কবর দেয় এবং সমাধির উপরে শিবের বাহন নন্দী বা ষাঁড়ের একটি মূর্তি স্থাপন করে।
এককালে সাপুড়ে জীবনে অভ্যস্ত এই সম্প্রদায়কে নিয়ে আজ বিশ্বজুড়ে নানা চর্চা কালবেলিয়াদের নতুন জীবিকার সন্ধান দিয়েছে। বর্তমান প্রজন্মের কাছে জীবনটাকে আরও অর্থবহ করে তুলেছে। সত্যিই তো এই নাচ যাঁরা দেখেছেন, তাঁরাই মজেছেন। আজও চোখ বন্ধ করলে সামনে যেন ভেসে ওঠে আরাবল্লির কোলের সেই রুক্ষ মরু। সেই ক্লান্ত নীরবতার মাঝে দীপ্ত যৌবনমত্ত নৃত্যের অপূর্ব উদ্ভাস আর জমকালো পোশাকে, জোড়ায় জোড়ায় দুরন্ত ঘূর্ণির অবিরত চমকের সঙ্গে উচ্চকিত গান, ‘আরা রা রা রা রা রা রা রে, ও কাল্য কুড পাড়ো মেলে মে...’!
• গ্রাফিক্স : সোমনাথ পাল
• সহযোগিতায় : বিশ্বজিৎ চক্রবর্তী

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ