


তিনি ছিলেন প্রকৃত ছাত্র দরদি। পাশাপাশি স্বদেশিয়ানার মূর্ত প্রতীক। এই বিশিষ্ট বিজ্ঞানীর কর্মকাণ্ড তুলে ধরলেন মৃণাল শীল।
সালটা ১৮৮৮। একটা জাহাজ এসে থামল কলকাতা বন্দরে। সেই জাহাজ থেকে নামলেন এক বাঙালি যুবক। তিনি ছ’বছর এডিনবরা বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়ন করে সেখানকার ডিএসসি উপাধি লাভ করেছিলেন। শুধু তাই নয়, সেখানে তাঁর প্রবন্ধ সর্বোৎকৃষ্ট বিবেচিত হওয়ায় ৫০ পাউন্ডের একটা পুরস্কারও পেয়েছিলেন। কিন্তু সেই পুরস্কারের টাকাটা তাঁর পুরোটাই লেগে গিয়েছিল জাহাজ ভাড়ার দেশে ফেরার খরচায়। তিনি কলকাতায় পৌঁছলেন একেবারে কপর্দকহীন অবস্থায়। পরিস্থিতি এমন যে, জাহাজের কোষাধ্যক্ষের কাছে নিজের জিনিসপত্র জমা রেখে ধার নিতে হল আটটি টাকা।
এদিকে, তাঁর পরনে তখন ছিল সাহেবি পোশাক। দেশে ফিরে তো সেই পোশাকে আত্মীয়স্বজনের কাছে যাওয়া চলে না! তাই জাহাজ থেকে নেমেই তিনি ছুটে গেলেন এক বন্ধুর বাড়িতে। তাঁর সেই বন্ধু ছিলেন বিশিষ্ট বিজ্ঞানী জগদীশচন্দ্র বসু। তাঁর কাছ থেকে ধুতি, পাঞ্জাবি চেয়ে নিয়ে পরেছিলেন। তারপরে গিয়েছিলেন নিজের বাড়িতে। এই হলেন আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র রায়। তখনকার দিনে বিলেতে পরীক্ষায় যাঁরা কৃতিত্ব দেখাতেন, তাঁরা সেখান থেকেই একটা চাকরি জোগাড় করে দেশে ফিরতেন। প্রফুল্লচন্দ্র সে রকম কিছু করে আসেননি। তাই তাঁকে গোটা একটা বছর দেশে ফিরে বেকার থাকতে হয়েছিল। তারপরে তিনি পেয়েছিলেন প্রেসিডেন্সি কলেজে সহকারী অধ্যাপকের পদ।
প্রফুল্লচন্দ্রের জন্ম ১৮৬১ সালের ২ আগস্ট, অবিভক্ত বাংলার খুলনা জেলায়। পিতা হরিশচন্দ্র রায়চৌধুরি এবং মা ভুবনমোহিনী দেবী। পদবি রায়চৌধুরি হলেও প্রফুল্লচন্দ্র কেবল ‘রায়’ পদবি ব্যবহার করতেন। শীর্ণদেহী প্রফুল্লচন্দ্র প্রবেশিকা পরীক্ষায় খুব যে ভালো ফল করেছিলেন, তা কিন্তু নয়। পরবর্তীকালে ইন্টার মিডিয়েট পড়ার সময় বিখ্যাত গিলক্রিস্ট বৃত্তি পান। তাঁর সহপাঠীরা প্রায়ই তাঁকে নিয়ে ব্যঙ্গ-বিদ্রূপ করতেন। সহপাঠীদের সেই ব্যঙ্গের উত্তর প্রফুল্লচন্দ্র দিয়েছিলেন বৃত্তি অর্জন করে।
এই মহান বিজ্ঞানী মনে প্রাণে ছিলেন স্বদেশি। গায়ে সব সময়ই থাকত খাদির পোশাক। তিনি যখন প্রেসিডেন্সি কলেজে অধ্যাপনার কাজে যোগদান করেন, সেসময় ব্রিটিশ ও দেশীয় অধ্যাপকদের বেতন বৈষম্যের বিরুদ্ধে তাঁর বন্ধু আচার্য জগদীশচন্দ্র বসুর সঙ্গে আন্দোলনে শামিল হয়েছিলেন। যাইহোক, নাইট্রোজেন গ্যাসের রাসায়নিক সক্রিয়তার প্রমাণ হিসাবে তিনি যখন মারকিউরাস নাইট্রাইট যৌগ এবং আরও বেশ কিছু জৈব যৌগ আবিষ্কার করেন, ব্রিটিশ সরকার তখন তাঁকে নাইটহুড উপাধিতে ভূষিত করে। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরই তাঁর এই ‘নাইট’ উপাধিকে বাংলায় ‘আচার্য’ হিসেবে তরজমা করে দেন। নিন্দুকে প্রশ্ন তোলে, এতই যদি তাঁর দেশভক্তি তবে রবি ঠাকুরের মতো তিনিও কেন নাইট উপাধি ত্যাগ করলেন না? এর উত্তর তিনি নিজেই দিয়ে গিয়েছেন। মজা করে বলতেন, ‘আমি রোগাসোগা মানুষ, সরাসরি ব্রিটিশ বিরোধিতা করলে ওদের মোটা লাঠির বাড়ি সহ্য করতে পারব না। আমার প্রাণটাই চলে যাবে।’ আসলে শিল্প স্থাপনের মাধ্যমে দেশের মানুষের উন্নতিতে তাঁর ব্রিটিশ সহায়তার প্রয়োজন ছিল। তিনি ছিলেন একজন গঠনমূলক জাতীয়তাবাদী।
প্রফুল্লচন্দ্র ছাত্রদের খুব ভালোবাসতেন। সর্বদা তিনি ছাত্র পরিবৃত হয়ে থাকতেন। প্রত্যেক গ্রীষ্মের আর পুজোর ছুটিতেই তিনি তাঁর ছাত্রদের নিয়ে দেশের বাড়ি খুলনা জেলার রাড়ুলিতে যেতেন। সেখানে বিভিন্ন জৈব যৌগের সাহায্যে লিচু, লেবু ইত্যাদির নানান স্বাদের শরবত তৈরি করে খাওয়াতেন। বিশিষ্ট অধ্যাপক চারুচন্দ্র ভট্টাচার্য তাঁর ছাত্রাবস্থায় আচার্য প্রফুল্লচন্দ্রের সান্নিধ্য পেয়েছিলেন। চারুচন্দ্রের স্মৃতি কথন থেকে জানা যায়, তিনি যখন প্রেসিডেন্সি কলেজের ছাত্র অর্থাৎ ১৯০১ সাল নাগাদ, প্রথমবার আচার্য প্রফুল্লচন্দ্রের ক্লাস করার জন্য শ্রেণিকক্ষে অপেক্ষা করছিলেন। এর আগে চারুবাবুর সঙ্গে প্রফুল্লচন্দ্রের কখনো সাক্ষাৎ হয়নি। চারুবাবু এবং তাঁর সহপাঠীরা ভেবেছিলেন, প্রফুল্লচন্দ্রের মতো বিখ্যাত বিলেত ফেরত বিজ্ঞানী যখন অধ্যাপক, তখন তিনি নিশ্চয়ই বেশ হ্যাটকোট পরা কেতাদুরস্ত কেউ হবেন। কিছুক্ষণের মধ্যেই চারুবাবু দেখলেন, একজন বেয়ারা প্রবেশ করলেন রেজিস্টার খাতা নিয়ে। সঙ্গে অধ্যাপক মশাই। অদ্ভুত ব্যাপার হল সেই অধ্যাপকের মধ্যে সাহেবিয়ানার কোনো চিহ্নই নেই, উলটে খাদির পোশাক পরা প্রফুল্লচন্দ্রের গায়ে যেরকম কোট ছিল, বেয়ারার গায়েও ছিল ঠিক একই রকম কোট। কৌতূহলবশত অন্য এক অধ্যাপককে চারুবাবু জিজ্ঞাসা করেছিলেন, স্যার আর বেয়ারা একই রকম পোশাক পরেন কেন? তিনি জানিয়েছিলেন, প্রফুল্লচন্দ্র নাকি একটা থান কিনে চারটে কোট বানিয়েছিলেন। তার মধ্যে দুটো তিনি পরেন এবং বাকি দুটো দিয়েছিলেন তাঁর বেয়ারাকে। জীবনে যথেষ্ট উপার্জন করলেও অর্থের প্রতি মোহ তাঁর ছিল না। সারা জীবনই অকাতরে অর্থ বিলিয়ে গিয়েছেন নিজের ছাত্র ও বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের মধ্যে।
কবি সত্যেন্দ্রনাথ দত্ত তাঁর ‘আমরা’ কবিতায় প্রফুল্লচন্দ্রের সম্পর্কে লিখেছিলেন, ‘বিষম ধাতুর মিলন ঘটায়ে বাঙালি দিয়াছে বিয়া, / মোদের নব্য রসায়ন শুধু গরমিলে মিলাইয়া।’ আবার একই বছর জন্ম হওয়ায় রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর প্রশস্তি পাঠে তাঁর সম্পর্কে বলেছিলেন, ‘কালের যাত্রা পথে আমরা একই তরণীর যাত্রী।’ ১৯৪৪ সালের ১৬ জুন বিশিষ্ট এই বাঙালি বিজ্ঞানীর জীবনাবসান ঘটে।