সমৃদ্ধ দত্ত, নয়াদিল্লি: আর জেদ কিংবা ইগো নয়। এবার বিপদ সংকেত পেয়েছে মোদি সরকার। মন্ত্রিসভার সদস্যদের কয়েকজন বিগত ৭২ ঘণ্টা ধরে দৌত্য করেছেন বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে। ব্যর্থ হয়েছেন। বিজেপি নেতৃত্ব চেষ্টা করেছে প্রচারের অভিমুখ অন্যদিকে ঘুরিয়ে দিতে। ব্যর্থ হয়েছে। দিল্লি পুলিশ চেষ্টা করেছে দমনপীড়নের মাধ্যমে ভয়ের বাতাবরণ তৈরি করতে। ব্যর্থ হয়েছে। অবশেষে মীমাংসা সূত্রের সন্ধান ও ড্যামেজ কন্ট্রোলে নামতে হয়েছে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিকে। কারণ সরকার বার্তা পাচ্ছে, উত্তাল হয়েছে দেশ। গণবিক্ষোভের তীব্রতা বাড়ছে। ইতিমধ্যেই যে ঘুম ভাঙতে সরকারের অনেক দেরি হয়েছে, তাতে সন্দেহ নেই। মোদি তাই নিজেই প্রতিশ্রুতি নিয়ে ছাত্র-যুবর পাশে দাঁড়ানোর বার্তা দিয়েছেন। বৃহস্পতিবার সাতসকালে সোশ্যাল মিডিয়ায় লিখেছেন, যুবসমাজের কল্যাণ এবং তাদের ভবিষ্যৎ সুরক্ষিত করা ছাড়া আর কিছুই গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে না। নিট তদন্ত নিয়ে এবং গোটা ব্যবস্থার সংস্কারে সরকার যে অত্যন্ত সক্রিয়, তার প্রমাণ দিতে মোদি বলেন, ‘আমরা সিদ্ধান্ত নিয়েছি, নিট মামলার জন্য ফাস্ট ট্র্যাক গঠন করা হবে। কঠোরতম শাস্তি দেওয়া হবে দোষীদের। যুবসমাজের ভবিষ্যৎ নিয়ে যারা ছিনিমিনি খেলেছে, তাদের দৃষ্টান্তমূলক সাজা দেওয়ার অঙ্গীকার করছি।’ মোদির এই বার্তার পরেই রাহুল গান্ধী তাঁকে চরম আক্রমণ করে পালটা জানিয়ে দেন, ‘আসল দোষী তো আপনিই। আপিনিই যুবসমাজের ভবিষ্যৎ ধ্বংস করেছেন। দায়ী ব্যক্তিদের আড়াল করেছেন। আপনার প্রশ্রয়েই ভারতের শিক্ষাব্যবস্থা সম্পূর্ণ নষ্ট হয়ে গিয়েছে। ছাত্রদের দাবি খুব স্পষ্ট, ধর্মেন্দ্র প্রধানের ইস্তফা চাই।’ আর মোদির আশ্বাস উড়িয়ে ককরোচ জনতা পার্টির জবাব, ফাস্ট ট্র্যাক কোর্ট সমাধান নয়। এদেশে অনেক ফাস্ট ট্র্যাক কোর্ট হয়েছে। সেসবের কী হাল, সবাই জানে।
ছেলের হাত ধরে এসেছে মা। জনপথ রোড মেট্রো স্টেশনের সামনের ফুটপাত ধরে এগিয়ে চলেছে টলস্টয় রোডে। আর এগনো যাবে না। পুলিশের বাধা। কেন এসেছেন? ওদের পাশে থাকতে... বিক্ষোভকারীদের। কেন? আমার মেয়ে ডাক্তার হতে চায়। আমাদের কাছে বেশি টাকা নেই। প্রাইভেটে ডাক্তারি পড়ানোর মতো সাধ্য নেই। খুব চেষ্টা করছে। কিন্তু যদি আগামী বছরও পরীক্ষা নিয়ে এরকম ছিনিমিনি হয়! এর সুরাহা হওয়া দরকার। তাই এসেছি।
কাঁধে ব্যাগ। হাতে পাউরুটি আর কলা। বিহারের কাটিহার থেকে এসেছে। ঘর্মাক্ত, শ্রান্ত এবং বিধ্বস্ত। তরুণ সুনীল কুমার নিউ দিল্লি স্টেশন থেকে হেঁটে হেঁটে এসেছে। কিন্তু তাকে বলা হয়েছে, যন্তরমন্তরে ঢুকতে দেওয়া হবে না। কেন এসেছ? একটা পিওনের চাকরিও কি পেতে পারি না! একবার পরীক্ষা দিয়েছি। আবার ২৬ তারিখ পরীক্ষা হওয়ার কথা। আবার বাতিল করেছে। বাতিল বাতিল আর বাতিল। কতবার ফর্ম পূরণ করব? কতবার প্রিপারেশন নেব? খুব রাগ হয় জানেন! তাই চলে এসেছি। একটা বিহিত হবে না?
দিল্লির যন্তরমন্তর যদি হয় এপিসেন্টার, তাহলে নিট বিক্ষোভ নামক ভূমিকম্পের প্রভাবে কম্পমান দেশের একের পর এক শহরের হৃদয়ও। আন্দোলন চলছে নাগপুর, মুম্বই, চেন্নাই, চণ্ডীগড়, দেরাদুন, জয়পুর, রাঁচি, আমেদাবাদ, হায়দরাবাদ, পাটনা, কলকাতায়। আবার সুনীল কুমারদের মতো ভিনরাজ্য থেকেও চলে আসছে আম জনতা... বিক্ষোভে অংশ নিতে। আজ দেশজুড়ে প্রতিবাদ কর্মসূচির ডাক দিয়েছে ককরোচ জনতা পার্টি। যেভাবেই হোক একটা সমাধানসূত্র খুঁজে পেতে মরিয়া মোদি সরকার। অমিত শাহ, জগৎপ্রকাশ নাড্ডা, জিতেন্দ্র সিংকে নিয়ে তৈরি হয়েছে অঘোষিত ক্রাইসিস ম্যানেজমেন্ট টিম। প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরে বিকালে বৈঠক করেন জিতেন্দ্র সিং-অমিত শাহ। জিতেন্দ্র সিং এরপরই ঘোষণা করেন, ‘আলোচনার দরজা খোলা। বিক্ষোভকারীরা আলোচনায় বসুন। সব বিষয়ে আমরা আলোচনা করতে রাজি।’ কিন্তু বিক্ষোভকারীরা রাত পর্যন্ত নরম হতে নারাজ। তাদের দাবি, শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগ। অন্যদিকে, এই বিক্ষোভের পিছনে চীনের হাত, বিদেশি অর্থ, দেশদ্রোহের বীজ এবং ডিপ স্টেটের ছায়া রয়েছে বলেও অভিহিত করার চেষ্টা চলছে। কিন্তু তকমা যাতে না পড়ে, সেই বার্তা স্পষ্ট করছে ককরোচ। তাই তাদের পোস্টার-ব্যানার ও প্যামফ্লেটের স্লোগানে পাশাপাশি উজ্জ্বল—ইনকিলাব জিন্দাবাদ এবং ভারত মাতা কী জয়!