বাপ্পাদিত্য রায়চৌধুরী, কলকাতা: জিএসটি আইন অনুযায়ী পণ্য ও পরিষেবা কর সংক্রান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা রয়েছে শুধুমাত্র জিএসটি কাউন্সিলের। কাউন্সিলের চেয়ারম্যান হিসেবে সেখানে যেমন কেন্দ্রীয় অর্থমন্ত্রী রয়েছেন, তেমনই সদস্য হিসেবে রয়েছেন প্রতিটি রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী বা অর্থমন্ত্রী। তাঁদের ঐকমত্যের ভিত্তিতেই যে কোনও সিদ্ধান্ত নেওয়ার কথা কাউন্সিলের। কিন্তু গণতান্ত্রিক এই নিয়মকে প্রশ্নের মুখে ফেলে দিয়েছিলেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি স্বয়ং। ১৫ আগস্ট দিল্লির লালকেল্লা থেকে তিনি ঘোষণা করে দেন, জিএসটির হার কমানো হবে। কীভাবে তিনি ওই ঘোষণা করলেন, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছিল আগেই। সূত্রের খবর, শুধুমাত্র ঘোষণাতেই আটকে থাকেনি কেন্দ্র। কোন পণ্যে জিএসটির নয়া হার কত হবে, তা নিয়েও আগেই সিদ্ধান্ত নিয়েছিল তারা। ৩ সেপ্টেম্বর ৫৬তম জিএসটি কাউন্সিলের বৈঠক শেষে জিএসটির নতুন কর কাঠামো ঘোষণা করা হয়। কিন্তু তার অন্তত দিন দশেক আগেই কোন পণ্যে কত জিএসটি হবে, সেই তালিকা চূড়ান্ত করে ফেলে অর্থমন্ত্রক। কেন্দ্রীয় অর্থমন্ত্রী নির্মলা সীতারামন সেই তালিকা জিএসটির কর নির্ধারক মন্ত্রিগোষ্ঠীর হাতে তুলে দিয়েছিলেন আগেই। জিএসটি কাউন্সিলের বৈঠকে তাতে কেবল সিলমোহর পড়ে। কেন্দ্রীয় সরকারের এই একতরফা সিদ্ধান্ত নিয়ে স্বভাবতই ক্ষোভ জমেছে বিরোধী পক্ষে থাকা দলগুলির মধ্যে। পশ্চিমবঙ্গের অর্থমন্ত্রী চন্দ্রিমা
ভট্টাচার্য গোটা বিষয়টির গোপনীয়তা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন। তাঁর কথায়, ‘জিএসটি বৈঠকে যে সিদ্ধান্ত গৃহীত হওয়ার কথা, ১৫ আগস্টের পর থেকেই কোটি কোটি মানুষ তা জেনে গিয়েছিল। ১২ ও ২৮ শতাংশ জিএসটির হার যে উঠে যাচ্ছে,
কারও জানতে বাকি ছিল না। এমনকী নতুন করে ৪০ শতাংশ স্ল্যাবের
কথাও ফিরেছে লোকমুখে। কীভাবে তা সম্ভব হল?’
জীবনবিমা ও স্বাস্থ্যবিমা সহ বিভিন্ন পণ্য ও পরিষেবায় নতুন করের হার কত হবে, তা নিয়ে সিদ্ধান্ত নিতে গড়া হয় মন্ত্রিগোষ্ঠী। তাদের প্রাথমিক সিদ্ধান্ত নিয়েই আলোচনা হওয়ার কথা কাউন্সিলের বৈঠকে। ৫৬তম কাউন্সিল বৈঠকের দিন দশেক আগে মন্ত্রিগোষ্ঠির বৈঠক ছিল। সূত্রের খবর, সেই বৈঠকে যোগ দেওয়ার কথা ছিল না নির্মলা সীতারামনের। কিন্তু তিনি উপস্থিত হয়ে একটি তালিকা তুলে দেন সংশ্লিষ্ট মন্ত্রীদের হাতে। জিএসটির নতুন হার কত হবে, জানানো হয় তাঁদের। আরও বলা হয়, এটাই কেন্দ্রীয় সরকারের সিদ্ধান্ত। মন্ত্রিগোষ্ঠীর সদস্যদের বক্তব্য, কাউন্সিল বৈঠকে অর্থমন্ত্রীর দেওয়া তালিকাই কার্যত মান্যতা পেয়েছে।
জিএসটির নয়া ধাপ বা স্ল্যাব নিয়ে পূর্বাভাস দিতে গিয়েই বিভিন্ন মহল জানিয়েছিল, ১২ ও ২৮ শতাংশর স্ল্যাব উঠে যাবে। তামাকজাত দ্রব্যের মতো কয়েকটি ক্ষেত্রে ৪০ শতাংশ জিএসটি চাপানোর আভাসও দেওয়া হয়। একটি রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাঙ্ক জিএসটির এই স্ল্যাবের ভিত্তিতে হিসেব কষে জানিয়ে দেয় সরকারের সম্ভাব্য লাভ-ক্ষতি। চন্দ্রিমাদেবী বলেন, ‘এভাবে আগেভাগে সবাই সব জেনে গেলে কাউন্সিলের বৈঠক করার অর্থ কী? আমাদের অনুমান, নতুন করের হারে বাংলার ১০ হাজার কোটি টাকা ক্ষতি হতে পারে। সেই ক্ষতি সামাল দেওয়া হবে কীভাবে, বৈঠকে তা নিয়ে আলোচনা চেয়েছিলাম আমরা। গোড়া থেকেই বলা হয়েছিল, বৈঠক চলবে দু’দিন। কিন্তু একদিনেই শেষ করা হল। আমাদের দাবিকে পাত্তাই দেওয়া হয়নি। বরং রাজস্ব ক্ষতি নিয়ে আলোচনার দাবি জানিয়ে আমরাই যেন অপরাধ করেছি! আমাদের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ই লাগাতার জিএসটি কমানোর দাবি করে গিয়েছেন। আর কেন্দ্রীয় অর্থমন্ত্রী বোঝাতে চাইছেন, কেবল বিজেপিই সাধারণ মানুষের কথা ভাবছে। আর রাজস্ব নিয়ে ভাবছে বিরোধীরা।’