বিশ্বজিৎ দাস, কলকাতা: প্রাইভেটে ডাক্তারি পড়ার খরচ এখন সরকারি জায়গার তুলনায় ২০০ গুণেরও বেশি! আজকের এই দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি এবং লাগামছাড়া খরচের বাজারেও সরকারি মেডিকেল কলেজগুলিতে এমবিবিএস পড়তে সেমেস্টার পিছু একজন ছাত্র বা ছাত্রীর খরচ হয় মাত্র সাড়ে চার হাজার টাকা! সেখানে প্রাইভেট মেডিকেল কলেজগুলিতে সেমেস্টার পিছু দিতে হয় (ম্যানেজমেন্ট কোটা) গড়ে ১০ লক্ষ টাকা! সরকারি মেডিকেল কলেজের ২২২ গুণ! স্টেট কোটায় পড়লে খরচ অবশ্য কিছুটা কম। সেক্ষেত্রে প্রতি সেমেস্টারে কলেজ ভেদে ২-৪ লক্ষ টাকা। আবার এনআরআই কোটায় তা সব মিলিয়ে দেড় থেকে ২ কোটি টাকা! তবে এমবিবিএস পড়ানো মানেই শুধু সেমেস্টার পিছু টাকা দিয়েই ক্ষান্ত হওয়া যাবে না। খরচ আরও অনেক। ভর্তির খরচ, হস্টেলের খরচ, বিশ্ববিদ্যালয়ের খরচ (পরীক্ষা), বিশ্ববিদ্যালয় রেজিস্ট্রেশনের খরচ, লগ বুকের খরচ, হস্টেলে থেকে পড়াশোনা করলে খাওয়া-দাওয়ার খরচ।
সেমেস্টার পিছু পড়াশোনা ও অন্যান্য খরচ মিলিয়েও আজকের দিনে এমবিবিএস-এর সাড়ে পাঁচ বছরের পাঠ্যক্রমে সরকারি মেডিকেল কলেজে খরচ পড়ে মাত্র ৫৫ হাজার টাকা (৫৪,৭৭২)। এর মধ্যে ৪০ হাজার ৫০০ টাকা খরচ পড়ে ৯টি সেমেস্টারের পড়াশোনাতে। সরকারি মেডিকেল কলেজে ভর্তির খরচ হাজার টাকা। প্রাইভেটে সেখানে ৫০ হাজার থেকে ১ লক্ষ টাকা। সরকারি-প্রাইভেট দু’জায়গাতেই বিশ্ববিদ্যালয়ের পরীক্ষার খরচ সবসুদ্ধ ৮,৪০০ টাকা (১৪টি বিষয়ে)। দুই ক্ষেত্রে একই খরচ ইউনিভার্সিটি রেজিস্ট্রেশন ফিজ বাবদ।
ইন্টার্নশিপ মিলিয়ে সাড়ে পাঁচ বছরের জন্য যে কোনো সরকারি মেডিকেল কলেজের হস্টেল খরচ শুনলে যে কারও চোখ কপালে উঠবে! ৮৭২ টাকা মাত্র। সরকারি খাতায় তারও খুঁটিনাটি হিসেব আছে। যেমন—হস্টেলের অ্যাডমিশন ফি ৮০ টাকা। সেমেস্টার পিছু ৭২ টাকা করে ৯টি সেমেস্টারের জন্য ৬৪৮ টাকা। ইন্টার্নশিপের ১২ মাসের জন্য মাসে ১২ টাকা করে। তুলনায় প্রাইভেট মেডিকেল কলেজের হস্টেল খাতে খরচ পড়ে মোটামুটি বছরে এক লক্ষ থেকে আড়াই লক্ষ টাকা। এসি রুমে কয়েকজনের সঙ্গে থাকলে একরকম, এসিতে দু’জন মিলে থাকলে একরকম, এসিতে একা থাকলে আরেক রকম খরচ। আবার এসি ছাড়াও থাকা যায়। তার খরচ কিছুটা কম।
সমস্যা হল, দেশজুড়ে সরকারি মেডিকেল কলেজের সর্বমোট আসন সংখ্যা কমবেশি ৬০-৬৫ হাজার। সেখানে একটা জায়গা পাওয়ার জন্য পরীক্ষায় বসেন প্রায় ২৩ লক্ষ! বাকিদের টাকার থলি নিয়ে তৈরি থাকতে হয়। রাজ্যের প্রাক্তন স্বাস্থ্য অধিকর্তা (শিক্ষা) ডাঃ প্রদীপ মিত্র বলেন, ‘এত টাকা খরচ করে ছেলেমেয়েদের বাবা-মায়েরা পড়াচ্ছেন। সত্যিটা হল, আগামী পাঁচ বছরের মধ্যে মাসে ৫০ হাজার টাকার চাকরি জোটাতেই ডাক্তারদের কালঘাম ছুটে যাবে। চাহিদার থেকে জোগান অনেক বেশি হয়ে গিয়েছে। আশা করি, এটা মাথায় রেখে সিদ্ধান্ত নেবেন বাবা-মায়েরা। কেন্দ্রীয় এবং রাজ্য সরকারগুলিরও ভাবার দরকার আছে, মুড়ি-মুড়কির মতো প্রাইভেট মেডিকেল কলেজ চালু করে আখেরে লাভ কিছু হচ্ছে কি?’