Bartaman Logo
২৩ জুলাই, ২০২৬
বর্তমান / হেলথ

জ্বরে ভাত খাবেন?

জ্বর হলে ভাত খাওয়ার নতুন নির্দেশনা প্রকাশ করেছে ডাক্তারবাবুরা। জানুন কেন ভাত এখন খাদ্যতালিকায় অপরিহার্য। বিস্তারিত পড়ুন।

জ্বরে  ভাত খাবেন?
  • ২৩ জুলাই, ২০২৬ ০৪:০০
Prefer us on Google

জ্বরজারি হলে এক সময় ভাত থাকতো নিষিদ্ধ খাদ্য তালিকায়। ফলমূল, শাকসবজি আর দুবেলা বার্লি, সাগু বা চিঁড়ের মন্ড– এই ছিল পথ্য। ভাত খেতে  মনটা সারাদিন আঁকুপাঁকু করত। জ্বর কমার পর ডাক্তারবাবু অনুমতি দিলেই মায়ের হাতে রান্না করা গলা ভাত, ডিম সেদ্ধ বা মাছ সেদ্ধ দিয়ে এক থাল  খেয়ে পরিতৃপ্তির ঢেঁকুর তুলতাম! 

Advertisement

সেসব দিন এখন অতীত। জ্বর-সহ যে কোনও রোগেই ভাত এখন আর খাদ্যতালিকায় ব্রাত্য নয়। রাতারাতি কি এমন গুণ ভাতের মধ্যে খুঁজে পেলেন ডাক্তারবাবুরা, যে অসুখ-বিসুখ হলে সহজপাচ্য খাদ্যতালিকায় ভাতকে আনলেন এক নম্বরে!
ভাতের পুষ্টি উপাদান নিয়ে দু-চার কথা বলি। চাল থেকে ভাত হয়, জানি সবাই। চালে থাকে শতকরা ৭৮ ভাগ কার্বহাইড্রেট, প্রোটিন শতকরা ৭ ভাগ, ফ্যাট ০.৫ ভাগ। শক্তি পাওয়া যায় ১০০ গ্রাম ভাত থেকে প্রায় ৩৪৫ কিলো ক্যালরি। এছাড়া প্রচুর ভিটামিন বি কমপ্লেক্স থাকে, প্রধানত ভিটামিন বি। কিন্তু ধান থেকে চাল তৈরি করতে গিয়ে এর পুষ্টি মূল্য অনেকটাই কমে যায়। বিশেষত চাল যত ফাইন হবে, ততই তা পুষ্টিহীন হয়ে উঠবে। কারণ চালকে ফাইন করতে গিয়ে এর বহিরাবরণ পেরিকার্প এবং জার্ম স্তর- দুটোই উঠে যায়। ফলে ভিটামিন বি টু এবং ভিটামিন বি-এর হার অনেক নেমে আসে। ক্যালসিয়ামের মাত্রাও অর্ধেক হয়ে যায়, প্রোটিনও কমে যায়।
এই ফাইন চালকে আবার বেশি ধোওয়াধুয়ি করার ফলে এবং জলে সেদ্ধ করার ফলে প্রায় ৬০ শতাংশ ভিটামিন ধুয়ে বার হয়ে যায়। ভাতের ফ্যান গৃহিণীরা সাধারণত ফেলে দেন। অথচ এই ফ্যানেই তো যত পুষ্টি। ফ্যান শুদ্ধ ভাত, যাকে মাড় ভাত বলা হয়, তা অবশ্যই খাদ্যতালিকায় রাখা উচিত, সম্ভব হলে নিয়মিত। ফুরফুরে সুগন্ধি সুপার ফাইন চাল খেতে ভাল লাগলেও, শরীরের পক্ষে তা মোটেও উপকারি নয়।
অনেকে মনে করেন ফ্যান ভাত খেলে আমাশা হয়, হাত পা ফোলে, বাত হয়।  সবকটিই কিন্তু ভুল ধারণা। আমাশা হয় এনটামিয়োবা হিস্টোলাইটিকা নামক একটি জীবাণু পেটে ঢুকলে। জল ও খাদ্যের মাধ্যমেই এরা পেটে ঢোকে। ফ্যানভাতকে এজন্য দোষ দিয়ে লাভ নেই।
     ভাত খেলে বাত হয়, এটাও বাত কে বাত, অর্থাৎ কথার কথা। দেহে ইউরিক অ্যাসিডের মাত্রা বাড়লে গেঁটে বাত বা গাউট দেখা দিতে পারে। গাঁট বা জয়েন্ট ফুলতে পারে। ইউরিক অ্যাসিড ভাতে থাকে না। ভাত খেলে শরীরে রস জমে, হাত পা ফোলে, এ ধারণারও কোনও বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নেই। যে কোনও খাদ্য উপাদানের সিংহভাগ জুড়েই থাকে জল। এই জল দেহের প্রয়োজনে কাজে লাগে। চাল থেকে ভাত তৈরি করতে গিয়ে ভালো করে সিদ্ধ করতে হয়। এর ফলে নানা ভিটামিন ও খনিজ লবনের সঙ্গে কিছুটা জলও ভাতে প্রবেশ করে।
    গৃহিণীদের কাছে অনুরোধ, সুপারফাইন চালের ভাত খেলে যে অনেক 'ফাইন' দিতে হতে পারে, সেটা সবসময় মাথায় রাখবেন। বেশি ধোওয়াধুয়ি করে এবং সব ফ্যান গেলে ভাতটাকে ঝরঝরে করতে গিয়ে জলে দ্রবণীয় ভিটামিনগুলোকে বিসর্জন দেবেন না। কারণ এদের অভাবে স্নায়ু দুর্বলতা, স্নায়ু ঘটিত নানা রোগ, মানসিক অবসাদ ও অস্থিরতা, ডায়েরিয়া, চর্মরোগ, ঠোঁটে ও জিভে ঘা, দেহের কম বৃদ্ধি, রক্তাল্পতা- সহ নানা বিপত্তি দেখা দিতে পারে। নানা কারণে অনেকেই আতপ চাল খেয়ে থাকেন। কিন্তু সিদ্ধ চালের পুষ্টিমূল্য আতপ চালের থেকে অনেক অনেক বেশি। বি গ্রুপের ভিটামিন সিদ্ধ চালে তিনগুণ বেশি থাকে। ধোওয়াধুয়ির সময় আতপ চালের অনেক পুষ্টি উপাদান বেরিয়ে যায়। সিদ্ধ চালে কম বার হয়। কারণ ধান সিদ্ধ করার সময় এর অন্যতম উপাদান শ্বেতসার চালের মধ্যে ঢুকে অন্য উপাদানগুলোর সঙ্গে মিশে যায়।
    অসুখ হলে অনেকে ভাতের থেকে রুটি বেশি পছন্দ করেন। আটার রুটি যা গম থেকে প্রস্তুত হয়, অবশ্যই পুষ্টিকর এবং পুষ্টিমূল্য ভাতের কাছাকাছিই। তবে প্রচুর রাফেজ বা ফাইবার জাতীয় খাদ্য উপাদান থাকার ফলে হজম করতে অসুবিধা হয়। যে কোনও সময় পেট খারাপ হতে পারে। জ্বরজারি হলে এমনিতেই আমাদের হজমকারক উৎসেচকগুলির ক্ষরণ কমে যায়। যে জন্য রুটি হজম করাটা খুব মুশকিল হয়ে পড়ে। ডাক্তারবাবুরা তাই আজকাল জ্বরজারি হলে কিংবা পেটের অসুখ হলে গলা গলা ভাত খেতে নিদান দেন। সঙ্গে আলু সেদ্ধ, ডিম সেদ্ধ, মাছ সেদ্ধ ইত্যাদি।
      এই হল ভাতের সাতকাহন। ভাত অবশ্যই পুষ্টিকর খাদ্য এবং সহজপাচ্য। ডাক্তারের বারণ না থাকলে জ্বরজারি হলে খাদ্যতালিকায় সুসিদ্ধ গলা ভাতকেই রাখবেন।
লিখেছেন ডা: অমিতাভ ভট্টাচার্য

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ